January 26, 2016 6:14 pm A- A A+

মামা খোকনের টর্চারসেল অপরাধীদের আতুরঘর

নিজস্ব প্রতিদেক ॥
Mama Khohon২০০১ সালের রাজনৈতিক বিবেচনায় বরিশালের টপটেরর সন্ত্রাসীদের উপর থেকে ৩৮টি মামলা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ের সুপারিশে প্রত্যাহার করা হলে নগরীতে ফিরতে থাকে সেই সব দূধর্ষ সন্ত্রাসীরা। ২০১২ সালে প্রায় সব সন্ত্রাসী ফিরে আসে আপন বলয়ে। তার মধ্যে অন্যতম বর্তমানে ৪টি থানা এলাকার বরিশাল আদালতের এপিপি এ্যাড. রফিকুল ইসলাম খোকন। এটি তার ভদ্রবেশি নাম। এই এ্যাড. রফিকুল ইসলাম খোকন নাম শুনলে যতটা না স্বাভাবিক মনে হয় তার চেয়ে পরিচিত নাম হলো মামা খোকন। মামা খোকন ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত যে আতংক ছিল বর্তমানে সেই আতংক একটুও কমেনি। কৌশলে গাঁ ঢাকা দেয়া এই দূধর্ষ সন্ত্রাসীর কর্মকান্ড প্রকাশ্যে না  হলেও কৌশলে অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন বহালতবিয়তে। নগরীর নাজিরা পুল এলাকায় অবস্থিত তার টর্চাল সেলটিও রয়েছে সুরক্ষিত। প্রশাসনিক কয়েকটি মাধ্যম থেকে জানা গেছে, কঠোর নজরদারীতে রাখা আছে তার সেই টর্চার সেল। নজরদারীতে থাকলেও একটি ক্লাবের নাম করে সব কিছুই জায়েজ করে নিচ্ছেন সেখানে। ক্লাবের নাম দিয়েছেন নবজাগরন যুব সংঘ। এখানে নতুন কিছু জাগরিত না হলেও নিত্য দিন হাতে খড়ি হয় অপরাধিদের। স্থানীয়দের অভিযোগ মতে মামা খোকনের কিলার বাহিনীর বেশ কয়েকজন সার্বক্ষনিক নিরাপত্তা ও দেখভাল করে থাকে এই ক্লাবটির। ক্লাবে ওপেন সিক্রেট ভাবে চলে জুয়া খেলা। পাশাপাশি নগরীর অপরাধপ্রবণ এলাকাসমূহতে অস্ত্র সাপ¬াইয়ের কাজও হয়ে থাকে এখান থেকে। একই সাথে মাদকের সর্ব বৃহৎ চালান অবতরণ কেন্দ্র হিসেবেও ক্লাবটির খ্যাতি রয়েছে। ক্লাবটিকে সার্বক্ষনিক দেখাশুনা করার দায়িত্বে রয়েছেন বর্তমানে মামা খোকনের ৪ সিপাহি মজিবর, সুলতান, কিশোর ও মামুন। এর মধ্যে দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে আসা মাদকের চালান নিয়ন্ত্রণ করে মামুন। মামুনের নিয়ন্ত্রণে আসা মাদকের চালান পাইকারী ও খুচরা ভাবে পৌছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করে মজিবর ও সুলতান। ক্লাবের সামনে গেলে আপাত দৃষ্টিতে চোখে পড়ে ছোট একটি পানের দোকান নিয়ে বসে আছে সুলতান। বস্তুত সুলতান কোন পান বিক্রেতা নন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন ক্লাবে আসা লোকদের গতিবিধি লক্ষ্য এবং তাদের কাছে মাদক বিক্রির জন্য নির্ধারিত ভাবে বসে থাকেন সুলতান। আর মজিবরের কাজ হলো মাদক ক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পুলিশ হয়রানী করলে মুঠো ফোনে পুলিশের সাথে মামা খোকনের কথা বলিয়ে দেয়া। কিশোরের নাম নগরীতে অনেকেই জানেন। নগরী এবং নগরীর বাইরে কন্ট্রাক্ট কিলিং এর জন্য কিশোর কাজ করে থাকে বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। ওদিকে মামা খোকনের দৈনিক আয়ের হিসাব চালু রাখে মামুন। যিনি নিজে ভাড়ায় মটর সাইকেল চালিয়ে থাকে। জানা গেছে, মটর সাইকেল চালানো তার আই ওয়াশ মাত্র। বস্তুত এই মামুন এই ভাড়ায় মটর সাইকেল চালিয়ে নগরীর প্রায় অর্ধশত স্পট থেকে মামা খোকনের নামে চাঁদাবাজী করে থাকে। এদিকে নবজাগরণ যুব সংঘের নামে সুরক্ষিত মামা খোকনের টর্চার সেলে অস্ত্র বেচাকেনা কিংবা অস্ত্র পৌঁছে দেয়ার কাজ করে থাকে ছাত্রলীগের তথাকথিত নেতা রইজ আহম্মেদ মান্না। জানা গেছে আইন পেশায় যুক্ত থাকলেও মামা খোকন বস্তুত তার সাম্রাজ্য চালিয়ে রেখেছেন আন্ডার ওয়ার্ল্ড এর মাধ্যমে। এলাকায় মামা খোকনের কথার বিপরীতে কেউ কোন কথা বললে তাকে এই টর্চার সেলে এনে নির্যাতন করা হয়। এমনকি নির্ধারিত স্পটের চাঁদা অনেকেই এই টর্চার সেলে এনে পৌঁছে দেয়। বরিশাল ও এর আশেপাশের এলাকায় যাদের ঘুম হয়না কিংবা যে সমস্ত শিশুরা অতি বেয়াড়া তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে এখনো রূপকথার গল্পের মত বলা হয় যার নাম তিনি মামা খোকন। ভয়ংকর সন্ত্রাসী বরিশাল মহানগর পুলিশের উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান পুলিশের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় এখনো প্রথম নামটি হল কাউনিয়ার কুখ্যাত সন্ত্রাসী রফিকুল ইসলাম ওরফে মামা খোকন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঐ কর্মকর্তা আরও বলেন হয়তো প্রশাসনের প্রত্যেকটির দফতরে এই নামটি রয়েছে। গোয়েন্দাদের সাথে কথা বললে জানা গেছে নগরীর আন্ডারওর্য়াল্ড এখনো নিয়ন্ত্রণে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। তাহলে কেন এই দুধর্ষ সন্ত্রাসী থেকে যাচ্ছে ধরাছোয়ার বাইরে ? সূত্রগুলো রয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায় সাত খলিফার সাম্রাজ্য অটুট রাখছেন মামা খোকন। এর মধ্যে এক বছর আগে র‌্যাবের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয় মোস্ট ওয়ান্টেড পানামা ফারুক। সে সময়ে ঘটনাস্থল থেকে দুটি পিস্তল, একটি কাটা রাইফেল, একটি পাইপগান, তিনটি ছোরা এবং ৩৪টি গুলি উদ্ধার করে। এছিল পানামা ফারুকের কাছে জমাকৃত সর্বশেষ অস্ত্র। অথচ কৌশলী মামা খোকনের অস্ত্রের হদিস এখনো মিলছেনা। নরগীর বিশেষ একটি পরিবারের প্রশ্রয়ে ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত সন্ত্রাসের গডফাদার মামা খোকনের অস্ত্র ভান্ডারে আজও হাত দেয়নি পুলিশ। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, শুধুমাত্র কাউনিয়ায় তার আন্ডারে ২১-২৫ জন পেশাদার পেশাদার সন্ত্রাসী কাজ করছে। যারা নিয়মিত কাঁচা বাজার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সড়কের যান চলাচল থেকে চাঁদা উত্তোলন করে থাকে। বরিশালের বাইরে কন্ট্রাক কিলিংয়ে লোকও পাঠান মামা খোকন। আদালত সূত্র বলছে, বরিশালে প্রায় ডজন খানেক মামলার রেগুলার আসামী তিনি। তা চোখে পরে না কারণ সন্ত্রাসীর পাশাপাশি নিজে আইন পেশায় যুক্ত হয়ে নিজের মামলাই মোকাবেলা করছেন। নাজিরেরপুল এলাকার এক ব্যবসায়ী জানান, কালা নামের এক লোক প্রত্যেকদিন মামা খোকনের নামে ১৫ টাকা করে চাঁদা দেন। এই ব্যবসায়ী ভ্যানে কাঁচা তরকারী বিক্রেতা। কাউনিয়া সূত্র বলছে, মামা খোকনের বাসাই এখন বরিশালের অপরাধীদের অস্ত্র ভান্ডার হিসেবে পরিচিত। বেশ কয়েকটি মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে তার কাছে এখনো একে-৪৭ রাইফেল, ৪/৫টি বিদেশী পিস্তল, শর্টগান এবং পাইপগান রয়েছে। নগরীর একমাত্র বন্দুকের দোকান সিদ্দিক এন্ড সন্স এর কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ বানীর সাথে আলাপকালে স্বীকার করেন, তাদের কাছে প্রায়ই কাউনিয়া থেকে অর্ডার আসে। কখনো বিদেশী বন্দুক সারানোর ডাকও পরে। জানতে চাওয়া হয় কোন বাসা থেকে ? কর্মচারীর সহজ উত্তর, বরিশালে অস্ত্রের ব্যবসাতো একজনই করে; খোকন মামা। জানা গেছে বরিশালে ক্যাডার নির্ভর রাজনীতি এ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ারের হাত ধরে শুরু হলেও দক্ষিনবঙ্গ তথা সমগ্র বাংলাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে ফেলেন বর্তমানে আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা। তার সেই নাম করেফেলা ক্যাডারদের মধ্যে ৮ জনের বিশেষ বিশেষ টিম ছিল। ৮টি টিমের নেতৃত্বে ছিলেন রফিকুল ইসলাম খোকন ওরফে মামা খোকন। আদালতের নাম পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এযাবৎ কাল বরিশালের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকান্ড ছিল সাত খলিফার নেতা মামা খোকনের হাতে পুলিশ কামাল হত্যাকান্ড। নথির বয়ান মতে, ১৯৯৬- থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বরিশালে মানুষ হত্যা বিশেষ কোন অপরাধ ছিলনা। যেমনি খুন হন পুলিশ কামাল। জানা যায় পুলিশ কামালও মামা খোকনের পরিচিত ছিল এবং একই এলাকার লোক। ২০০১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে কাউনিয়া বিসিক এলাকায় সন্ত্রাসীরা আড্ডা দিচ্ছিল। এসময় মানুষের মৃত্যুর অনুভূতি কেমন হয় তা দেখতে সামনে থেকে পুলিশ কামালকে গুলি করে মামা খোকন। তখন সাথে আরও ছিল আফতাব হোসেন, বিএম কলেজ ছাত্রলীগ নেতা জসিম উদ্দিন, নিখোঁজ হওয়া ছাত্রলীগ নেতা শফিউল¬াহ মোনায়েম, হুমায়ুন কবির, পানামা ফারুক, ছক্কু, মাসুদ রানা ওরফে কুতুব রানা তার ভাই মান্না, কাইয়ুম হোসেন মিল্টন, তারেক বীন ইসলাম সহ ২১ জন সন্ত্রাসী। ওদিকে ছাত্রদল নেতা রাহাতকেও গুলিকরে হত্যা করে সুরক্ষিত রয়ে গেছে মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী মামা খোকনের অস্ত্র ভান্ডার।

সংবাদটি পড়া হয়েছে মোট 1297 বার