March 9, 2016 6:35 am A- A A+

কুয়াকাটার বাউলি বন বিনোদনের নতুন দিগন্ত

এম জাকির হোসাইন, কুয়াকাটা
ইংরেজ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেন, প্রকৃতি আমাদের দুই বার আনন্দ দেয়। একবার প্রকৃতির কোলে ঠাঁই নিয়ে। প্রকৃতির নীরব সুধা পান করে। অপরটি নিঃসঙ্গ ও বিষণœ জীবনে প্রকৃতির সুখকর স্মৃতি রোমন্থনের মাধ্যমে। প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের প্রত্যাশা এমন একটি হৃদয়কাড়া স্থান ভ্রমণ করা যা স্মৃতির ক্যানভাসে সুদীর্ঘ সময় প্রোথিত থাকে। কুয়াকাটার ‘বাউলি বন’ তেমনই একটি নান্দনিক স্থান। প্রকৃতির দুই আনন্দের মাঝেই যেন তারা খুঁজে পায় জীবনের অনাবিল শান্তি।

 

কুয়াকাটার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে বাউলি বন অনন্য। একটি নতুন আকর্ষণ সংযোজন হয়েছে কুয়াকাটা পর্যটন জোনে। ‘বাউলি’ শব্দের অর্থ জনশূন্য স্থান বা খোসা-ছাড়ানো মাসকলাই। তবে অধিকাংশের মতে এ বন এলাকায় এক সময় কোন জন বসতি ছিলো না। উল্লেখযোগ্য লোকালয় না থাকায় এ বনের নাম করণ হয় বাউলি বন। বন বিভাগের ১৫৪ হেক্টর জমির ওপর বেড়ে ওঠছে চির সবুজ ঝাউ বন। কুয়াকাটার আলীপুর থেকে ১৭কিমি পূর্বে ধুলাসার ইউনিয়নে চরচাপলির ধোলাই মার্কেট।

 

এখান থেকে কাউয়ারচর এলাকার পূর্ব দিকের সমুদ্রপাড়ে এ বাউলি বনটির অবস্থান। ইতোমধ্যে এ সবুজ বন ভ্রমণ বিলাসি পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। দৃষ্টি নন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে বাউলি বনের রয়েছে বিশেষ সুনাম। এ জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক-দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠেছে এ বন। এ সবুজ বনের পরশ দীর্ঘ দিনের কর্মক্লান্ত মনে এনে দেয় সজীবতা। এক বুক নির্মল বায়ু সেবনে ঘুচে যায় মানসিক অবসাদ।

 

বিভিন্ন আকারের ঝাউ গাছ প্রকৃতি পূজারির কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। সারি সারি লম্বা গাছগুলো প্রকৃতির মাঝে যেন নীরব শৃঙ্খলার শিক্ষা প্রদান করে আগত পর্যটকদের। মরুদ্যান মরুপথের ক্লান্ত পথিকের কাছে সুশীতল প্রশান্তিময় স্থান। ঠিক তেমনি দেশ-বিদেশের ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকদের হৃদয় জুড়ানো প্রশান্তির জায়গা হচ্ছে বাউলি বন। মাঝারি ও ছোট আকারের গাছগুলোর ফাঁকে শরীর লুকিয়ে সেলফিসহ বিভিন্ন ঢংয়ের ছবি তুলছে বেড়াতে আসা পর্যটক। চিকন কোমল সবুজ পাতাগুলো দখিনা বাতাসে ঢেউ তুলছে। আর পাতার ফাঁকে বাতাস ঢুকে এক অন্য রকম শিস্ ধক্ষনি বিমোহিত করে প্রকৃতি প্রেমীদের। এ যেন বন দেবী আগত অতিথিদের বরণ করছে মোহনীয় বাঁশির সুরে। হাতে হাত রেখে দীর্ঘ দিনের লালিত কথাগুলো বলতে যেন একদম ভুল করেন না বন্ধুযুগল। অন্যদিকে পর্যটক শিল্পিরা হৃদয়কাড়া কথা ও সুরে মাতিয়ে রাখেন পুরো বিনোদন এলাকা। এছাড়া এ বাউলি বনের কাছেই রয়েছে লাল কাকঁড়ার বিচরণ।

 

বেড়াতে আসা অসংখ্য পর্যটক এ লাল কাঁকড়ার সাথে খেলায় মেতে ওঠে। আর মোবাইল ক্যামেরায় তুলে নেয় বালু চরে লাল কাঁকড়ার তুলিতে আঁকা নানা রকম আল্পনার ছবি। একদিকে বিশাল সাগরের শোঁ শোঁ শব্দ আর অপরদিকে নয়নাভিরাম ঝাউবনে পাগলা-হাওয়া মন নিয়ে তারা হারিয়ে যায় অজান্তে। সারা দুপুর দৌড়-ঝাঁপ করার পর ক্ষুধা নিবারণের জন্য রয়েছে বাহারি সামুদ্রিক মাছের খাবারের দোকান। ইচ্ছে করলেই যে কোন পর্যটক খাবার দোকানে বসে খেতে পারেন তার পছন্দের ভাজা মাছ ও সাদা ভাত। বাউলি বনে বেড়াতে আসা বিএমএসএফ কুয়াকাটা শাখার সভাপতি মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘বাউলি বন হৃদয়কাড়া বিনোদন স্পট। এখানে এসে আমার মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেছে।

 

বাউলি বনে অসংখ্য পর্যটকের সমাগম ঘটায় স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’ প্রথম দিকে এ বন এলাকায় পর্যদকদের বিনোদন সুবিধা বলতে তেমন কিছু ছিলো না। স্থানীয় বাসিন্দারা ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের দিকে বাউলি বনে পর্যটকদের যাতায়াতের পরিবেশ সৃষ্টি করেন। ২০ জানুয়ারি ২০১৬ সালে পর্যটকদের জন্য খাবার দোকান ও পর্যটক ছাউনি তৈরি করেন স্থানীয় দোকানিরা। তাদের কাছে জানা যায়, এখানে প্রতিমাসে পর্যটকদের চার-পাঁচটি বনভোজন সম্পন্ন হয়।

 

ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত প্রতিনিয়ত পর্যটক আসে এ বাউলি বনে। সরকার ও স্থানীয়দের সহায়তায় পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশ সৃষ্টি করা হলে এটা হবে আরও মনোরম সুস্থ বিনোদন জোন এমন মত প্রকাশ করেছেন পর্যটন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি পড়া হয়েছে মোট 1042 বার