June 6, 2016 12:24 pm A- A A+

এ্যাই ব্যাটা চুপ থাক, যা নির্দেশ দেই তাই কর

নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জ শহরের পুরাতন কোর্ট এলাকাতে অবস্থিত র‌্যাব-১১ এর ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন এমএম রানা ( চাকরিচ্যুত ও অবসরে পাঠানো নৌবাহিনীর কমান্ডার)। সাতজনকে অপহরণের পর রাতে তাদের ( লিডিং সি ম্যান আবদুস সামাদ, নায়েক আজম আলী ও আবদুর রাজ্জাক) জানানো হয় ইঞ্জিন চালিত বোট নিয়ে কাঁচপুর যেতে। নির্দেশ মোতাবেক তারা কাঁচপুর যান। সেখানে সাতজনের লাশ উঠানোর সময়ে তারা আঁতকে উঠে অফিসারদের বলেন, ‘লাশ কেন স্যার? আমাদের তো টহল দেয়ার কথা। লাশ বহনের তো কথা না।’

তখন আরিফ হোসেন (র‌্যাব-১১ এর সাবেক উপঅধিনায়ক ও ইতোমধ্যে অবসরে পাঠানো সেনাবাহিনীর মেজর) বলেন, ‘এ্যাই ব্যাটা, চুপ থাক। আমি যা নির্দেশ দেই তাই কর।’ পরে ইঞ্জিন চালিত বোটে করে সাতজনের মৃতদেহ শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরীর মোহনাতে নিয়ে ফেলে আসা হয়।

সোমবার (৬ জুন) সকালে আলোচিত সাত খুন মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দেয়ায় সময় এসব তথ্য দেন লিডিং সি ম্যান আবদুস সামাদ, নায়েক আজম আলী ও আবদুর রাজ্জাক। আদালত সূত্র এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এছাড়াও সাক্ষ্য দেয়া অপর দুইজনের মধ্যে মেজর সুরুজ জানান, তিনি নরসিংদি ক্যাম্পে থাকার সময়ে নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের কয়েকজন সদস্য গিয়ে খাবারের জন্য দুই হাজার টাকা চেয়ে নেন। পরে তিনি সাত খুনের বিষয়গুলো জানতে পারেন।

র‌্যাব-১১ এর ডিএডি আবদুস সালাম শিকদার জানান, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সকালে তাকে মেজর আরিফ নির্দেশ দেন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে চেকপোস্ট বসাতে। দুপুরে ফোন দিয়ে জানান, সাদা ও কালো রঙয়ের দুটি প্রাইভেটকার আটকাতে। দুপুরে ওই দুটি প্রাইভেটকার আটকানোর আগেই মেজর আরিফ হোসেন ও কমান্ডার এম এম রানাকে বহন করা দুটি গাড়ি ওই কালো ও সাদা প্রাইভেটকারের সামনে গিয়ে গতিরোধ করে। তখন দুটি গাড়ি হতে সাতজনকে নামিয়ে একটি নীল রঙয়ের হাইএইস গাড়িতে উঠানো হয়।

নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে এর আগে সকাল সাড়ে ৯টা হতে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত গ্রেপ্তারকৃত নূর হোসেনসহ ২৩ আসামির উপস্থিতিতে র‌্যাবে কর্মরত ওই ৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। শুনানি শেষে আগামী ১৩ জুন পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেছে আদালত। এ নিয়ে ৬৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতের পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, সোমবার সাত খুনের ঘটনায় ৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। তারা হলেন খাগড়াছড়িতে অবস্থিত র‌্যাবের মেজর সুরুজ মিয়া (সাত খুনের সময়ে র‌্যাব-১১ নরসিংদি ক্যাম্পে ছিলেন), র‌্যাব-১১ এর ডিএডি আবদুস সালাম শিকদার, র‌্যাব-১১ এর লিডিং সি ম্যান আবদুস সামাদ, নায়েক আজম আলী ও আবদুর রাজ্জাক।

সাত খুনের ঘটনায় দুটি মামলা হয়। একটি মামলার বাদী বিজয় কুমার পাল হলেন নিহত অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের মেয়ে জামাতা ও অপর বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি হলেন নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী। দুটি মামলাতেই অভিন্ন সাক্ষী হলেন ১২৭ জন করে। এ কারণে উভয় মামলার সাক্ষীদের একই সঙ্গে দুই মামলায় জেরা করা হয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহীম অপহৃত হন। পরে ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের ও ১ মে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

তদন্ত শেষে প্রায় এক বছর পর গত ৮ এপ্রিল নূর হোসেন, র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। গত ৮ ফেব্রুয়ারি সাত খুনের দুটি মামলায় নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এ মামলায় নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২৩ জন কারাগারে আটক রয়েছেন। আর চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে এখনো ১২ জন পলাতক রয়েছে।

সংবাদটি পড়া হয়েছে মোট 964 বার