June 20, 2016 6:52 am A- A A+

জঙ্গিদের সুইসাইড স্কোয়াড গঠন: প্রথম টার্গেট দক্ষিনাঞ্চলের ১০ জন

ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার আগে জঙ্গি সন্ত্রাসী ফয়জুল্লাহ ফাহিম চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য দিয়ে গেছে। ফাহিমের জবানিতে বেরিয়ে এসেছে সাম্প্রতিক গুপ্তহত্যার ক্রীড়নকদের অনেকের নামধাম। পুলিশ জানতে পেরেছে- হিজবুত তাহরীর, জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে জামায়াত ও শিবিরের প্রশিক্ষিত ক্যাডাররা এসব হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে।

মূলত সামনে জঙ্গি নামধারীদের ব্যবহার করা হলেও পেছনে রয়েছে যুদ্ধাপরাধী দলের ক্যাডাররা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখন তারা কিলিং মিশনে পরিচিতি পাওয়া জঙ্গি সদস্যদের ব্যবহার করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব ক্যাডাররাও অংশ নিচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে ফাহিম অন্তত তার পরিচিত সহযোগী হিসেবে দেড় ডজন ব্যক্তির নাম-পরিচয় জানিয়েছে। এছাড়া কয়েকটি বড় অস্ত্রের মজুদের সন্ধানও দিয়েছে ফাহিম। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের নানামুখী তৎপরতা ও অভিযান অব্যাহত আছে।

কেন তাদের এমন হত্যা মিশনে নামানো হয়েছে প্রশ্নের জবাবে ফাহিদ পুলিশকে জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি ভারতকে বিক্ষুব্ধ করে তুলতেই তাদের মাঠে নামানো হয়েছিল। এজন্য বেছে বেছে তাদের দিয়ে হিন্দু পুরোহিতসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনকে হত্যা করানো হচ্ছে। আর নিরাপদ মনে করে ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলকে তারা বেছে নিচ্ছে। নির্দেশদাতারা জানিয়েছে, ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন নিয়ে এ সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে। তাই ভারতকে ক্ষুব্ধ করতে না পারলে কোনোভাবেই এ সরকারকে বিদায় করা যাবে না। আর তাদের এ মিশন সফল হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে জামায়াত-শিবির।

ফাহিম জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানিয়েছে, ধাপে ধাপে তাদের এ হামলা আরও শক্তিশালী হবে। এরপর সমাজের বিশেষ ব্যক্তিদের ওপর হামলার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকদের ওপর আত্মঘাতী হামলা চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে জামায়াতের। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জামায়াত হাত মিলিয়েছে হিযবুত তাহরীর, জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ বেশকিছু জঙ্গি সংগঠনের প্রশিক্ষিত সদস্যদের সঙ্গে। ইতিমধ্যেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল গঠন করে তাদের প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে।

শনিবার সকালে মাদারীপুরে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য দিয়ে গেছে গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম। ফাঁস করে দিয়েছে ভয়ংকর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলের নেতৃত্বে থাকা অন্তত ১৮ জনের নাম।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশানল (সিটি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিমকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় ফাহিমের দেয়া তথ্য ভিডিও করে রেখেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এছাড়া ফাহিমের দেয়া তথ্যানুযায়ী পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা গত দু’দিনে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে অসংখ্য অভিযান পরিচালনা করে। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে পুলিশ ভয়ংকর জঙ্গিদের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। শনিবার উত্তরা থেকে ১০৮টি চাইনিজ পিস্তল, ২১৭টি ম্যাগাজিন, ১১টি বেয়োনেট ও ১ হাজার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শনিবার বলেন, তার দেয়া তথ্যে তিন জঙ্গিসহ ইতিমধ্যেই চারজনকে আটক করা সম্ভব হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে হাসান আল বান্না সোহাগ নামে একজন আইনজীবীও রয়েছেন। যিনি মাদারীপুরে ওই কিলিং মিশনে যাওয়ার আগে ফাহিমসহ ৬ জনের ওই দলটিকে দেড় লাখ টাকা দিয়েছিলেন। শুক্রবার বিকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন কাজলা এলাকা থেকে জামায়াতপন্থী ওই আইনজীবীকে আটক করা হয়। তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। কিলিং মিশনে যাওয়া দলটিকে তিনি মাদারীপুরে তার এক বন্ধুর (আইনজীবীর) কাছে পাঠিয়েছিলেন। ওই আইনজীবী মূলত মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দীন কলেজের প্রভাষক রিপন চক্রবর্তীকে চিনিয়ে দেন। ইতিমধ্যেই ওই আইনজীবীকে গোয়েন্দারা নজরদারির মধ্যে রেখেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে ওই আইনজীবীর নাম প্রকাশ করতে চাননি।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগে গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম এ ধরনের টার্গেট কিলিংয়ের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত অন্তত ১৮ সদস্যের নাম বলে গেছে। এরা হচ্ছে- জাকারিয়া, সবুজ, সাজেদুর, মানিক, মাজিদ, ফারুক, শফিক, মিলন, কফিল উদ্দিন ওরফে রব মুন্সি, আজিবুল ইসলাম ওরফে আজিজুল, শাহান শাহ, হামিদুর রহমান, বজলুর রহমান, বাবর, শরিফ, খাইরুল ইসলাম, নাদিম ও ময়েজ উদ্দিন। এদের মধ্যে প্রথম চারজন নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে জড়িত। বাকি ১৪ জন শিবিরের সদস্য।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতার পক্ষ থেকে আত্মঘাতী স্কোয়াড গঠনের জন্য মোটা অংকের টাকাও খরচ করা হচ্ছে। কিভাবে আত্মঘাতী হতে হয় সে বিষয়ে তাদের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ে অস্ত্র পরিচালনা ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

ফয়জুল্লাহ ফাহিম তার দেয়া তথ্যে পুলিশকে বলেছে, তাদের ৬ জনের দলটির টার্গেটে ছিল সংখ্যালঘু পরিবারের ১০ সদস্য। এদের সবাই দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দা। মাদারীপুরে সফল হলে তাদের পরবর্তী টার্গেট ছিল বরিশালের আরেক হিন্দু আইনজীবী। মাদরীপুরের মিশন শেষে তাদের দলটি বরিশালে মিশনে নামত। তবে মাদারীপুরে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের পরবর্তী টার্গেট পূরণ সম্ভব হয়নি।

বুধবার (১৫ জুন) বিকালে মাদারীপুরে স্থানীয় সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষক ও পুরোহিত রিপন চক্রবর্তীর ওপর জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। হামলা চালিয়ে পালানোর সময় স্থানীয়রা ধাওয়া করে ফয়জুল্লাহ ফাহিমকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেন। এ ঘটনায় পুলিশ ফয়জুল্লাহ ফাহিমসহ ৬ জনকে আসামি করে বৃহস্পতিবার স্থানীয় থানা পুলিশ মামলা করে। শুক্রবার ওই মামলায় পুলিশ ফাইিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৫ দিনের রিমান্ড আবেদন জানিয়ে শুক্রবার মাদারীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইদুর রহমানের আদালতে হাজির করেন। আদালত শুনানি শেষে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদিকে রিমান্ডের প্রথম দিন শেষে শনিবার সকালে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

পুলিশের দাবি, ফাহিমের দেয়া তথ্য অনুযায়ী দলটির কয়েক সদস্যকে গ্রেফতারের জন্য শনিবার সকাল ৭টার দিকে পুলিশ সদর উপজেলার মিয়ারচর এলাকায় যায়। সেখানে একটি পাট ক্ষেতের কাছাকাছি পৌঁছলে ফাহিমের সহযোগীরা পুলিশের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। পুলিশও পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। এ সময় পালনোর চেষ্টা করলে দু’পক্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয় ফাহিম। পরে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফাহিমকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় পুলিশের এক সদস্যও আহত হন এবং ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।

সুত্রঃ  দৈনিক যুগান্তর

সংবাদটি পড়া হয়েছে মোট 1523 বার