August 8, 2016 6:28 pm A- A A+

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার শেখ হাসিনার মুক্তি আন্দোলনে বরিশালের ছাত্রনেতারা

শফিকুল ইসলাম:
১৬ জুলাই ২০০৭। দেশে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা দখল করলো। শুধু ক্ষমতা দখল করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা, ঐদিন সকাল বেলা খবর আসলো আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই সংবাদটি বিদ্যুতের গতির চেয়েও দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পরে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পরে। সারা দেশের মত আওয়ামীলীগের সহযোগী অঙ্গসংগঠনের নেতা ও কর্মীর উদ্যোগে বৃহৎভাবে কোথাও শেখ হাসিনার মুক্তির প্রতিবাদ চোখে পরেনি। বরিশালও এর বাইরে নয়। ঠিক দুপুর ১২টায় বরিশালের ছাত্রলীগের অপ্রতিদ্বন্দ্বি নেতা মঈন তুষার, তৌহিদুর রহমান ছাবিদ, মো. জসিম উদ্দিন, কামরুজ্জামান লিখন, সমর দাস, মুনির উদ্দিন তারিক, জিয়াউর রহমান জিয়া, লিটন রায়, মিজানুর রহমান মিজান, আসাদুজ্জামান আসাদ, মিলন ভূঁইয়া, ইমরুল আহম্মেদ উজ্জ্বল সহ ৩০/৪০ জন ছাত্রলীগের কর্মী বরিশাল আইন মহাবিদ্যালয়ের সামনে জরো হয়। সেখান থেকে শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য একটি বড় ঝটিকা মিছিল বের করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

মিছিল কারীরা মূল দলের নেতাদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও সেই সময়ের সিনিয়র নেতারা মিছিলটির পক্ষে কথা বলেননি। এদিকে ১/১১ জারির ঐ দু:সময়ে যেন আ’লীগের কেউ মাঠে নামতে না পারে তা প্রতিহত করতে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যৌথ বাহিনী শহরের অলি-গলিতে টহলরত অবস্থায় ছিল। ভয়ভীতি উপেক্ষা করে তরুন নেতৃত্ব মঈন তুষার, তৌহিদুর রহমান ছাবিদ, মো. জসিম উদ্দিন, কামরুজ্জামান লিখন, সমর দাস, মুনির উদ্দিন তারিক, জিয়াউর রহমান জিয়া, লিটন রায়, মিজানুর রহমান মিজান, আসাদুজ্জামান আসাদ, মিলন ভূঁইয়া, ইমরুল আহম্মেদ উজ্জ্বলের নেতৃত্বে আইন বিদ্যালয়ের সামনে থেকে প্রস্তুতি নেয়া সেই মিছিলটি করেছিল। আর এর মাধমেই বরিশালে শেখ হাসিনার মুক্তির আন্দোলনের বীজ বপন হয়। অবাক করা কথা হলো দেশের মধ্যে শেখ হাসিনা মুক্তির আন্দোলন বরিশালেই প্রথম হয়েছিল। ১৬ জুলাই সারাদেশে আর কোথায় তাৎক্ষনিক কোন প্রতিবাদ মিছিল হয়নি। তবে সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর কেন্টিনের সামনে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং তার মুক্তির দাবীতে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়।

এই মিছিলের ছবিটি জাতীয় ‘দৈনিক যায়যায় দিন’সহ বরিশালের সকল স্থানীয় পত্রিকায় প্রথম পাতায় প্রকাশ হয়। তারপর থেকে সারা দেশে জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তি আন্দোলন বেগবান হতে থাকে। এর ফলে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। দেশ জাতি ও আ’লীগের সেই অবর্ননিয় দুঃসময়ে যারা সকল রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে, কোন বন্দুকের ভাষার সামনে মাথা নত না করে প্রতিবাদ করেছিল বরিশালের সেসব নেতৃত্বকে আজ অবহেলিত করে রাখা হয়েছে। সেদিনকার মঈন তুষার জীবন বাজি রেখে দলের কান্ডারির মুক্তির জন্য রাজপথ কাপিয়েছিল তাকে দলীয় বিভাজনের কারনে বার বার দল থেকে বহিস্কার করা হয় । যদিও চক্রান্তকারীরা সর্বশেষে আজও সফল হতে পারেনি। তার যোগ্যতায় ছাত্রলীগ বরিশাল বিএম কলেজ শাখার যুগ্ম আহবায়ক এবং বিএম কলেজের ২৮ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর প্রাণের দাবীর কারনে বিএম কলেজ ছাত্র কর্মপরিষদ (বাকসু) গঠিত হয় সেখানে তাকে সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত করা হয়। জীবনের অনেক ঝুঁকি নিয়ে রাজপথ কাঁপিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বিরোধী সরকার পতনের যত আন্দোলন, অসংখ্য মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেল যান।
সাবেক চীফ হুইপ বরিশাল জেলা আওয়ামীলীগের সংগ্রামী সভাপতি বর্তমান জাতীয় সংসদের সদস্য। এই বর্ষিয়ান নেতাকে বিএনপি ও জামায়াত জোট সরকার হয়রানীমূলক মিথ্যা মামলা দিয়েছিল।

111-768x527

তাতেও আওয়ামীলীগসহ সহযোগী সংগঠনের সাথে এই মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জন্য এবং আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহকে মিথ্যা মামলা থেকে মুক্ত করার জন্য যে দূর্বার গণআন্দোলন তৈরী হয়েছিল তাতেও সবার মঈন তুষার ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়। অথচ বর্তমানে বরিশাল রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দলীয় বিভাজন এতটাই প্রকট আকার ধারন করেছে যে, ১/১১তে যারা রাজপথ কাঁপিয়েছে, বিএনপি জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে তাদেরকে আওয়ামীলীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর কোন পদ-পদবী দেয়নি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বরিশাল আওয়ামীলীগের নেতারা নির্বাসনে চলে যান। বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগ করার মত কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা। আর যারা ছিল তারা বিএনপি-জামায়াতের ভয়ে ছাত্রলীগের পদ-পদবী নিতে অনিহা প্রকাশ করে। তখন তৌহিদুর রহমান ছাবিদকে মহানগর ছাত্রলীগের যুগ্ম আহবায়ক নির্বাচিত করা হয়। নির্বাচিত হওয়ার পর মহানগর ছাত্রলীগের কর্মীদের নিয়ে বিএনপি জোট সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে ঝাপিয়ে পরে। যেই সময় ছাত্রলীগের কর্মী পাওয়া কষ্টসাধ্য ছিল তখন ছাবিদ বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগকে সুসংগঠিত করে।

১ মাস ২৮ দিন কারাভোগের পর আবারো ছাত্রলীগের কর্মীদের নিয়ে হাসনাত মুক্তি গণআন্দোলনে ছাবিদও প্রথম সারিতে ছিল। তখন আওয়ামীলীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল না। আর আওয়ামীলীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর বরিশাল ছাত্রলীগের প্রাণভোমরা নিরবে নিভৃতে কোন পদ-পদবী ছাড়াই আছেন। ঐ লড়াইয়ের আর এক কর্মী মো. জসিম উদ্দিন। সেই দিনের জসিম আজ বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি। কিন্তু বরিশালের আওয়ামী রাজনীতির মধ্যে বিভাজন থাকার কারণে মো. জসিম ছাত্রলীগের এক কর্মী রেজা হত্যা মামলার মিথ্যা আসামী হিসেবে বরিশালের রাজনীতি ছাড়া। সেদিনকার এই জসিম জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে হাসিনা মুক্তির আন্দোলন করেছিল। অথচ আওয়ামীলীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরও একটি মিথ্যা মামলায় বরিশাল ছাড়া।

কামরুজ্জামান লিখন-বিএনপি জোট সরকারের সময় তাকে ধরে তার দুই হাত দুই পায়ে ওই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সন্ত্রাসীরা লোহার পেড়েক ঢুকিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করার চেষ্টা করে। শেখ হাসিনা দলীয় কার্যক্রমে বরিশাল আসলে সেই সময় লিখনকে হাতে হাতকড়া পরিহিত অবস্থা শেরে-বাংলা মেডিকেল কলেজে দেখতে যান। সেটি ছিল বিএনপি জোট সরকারের আমল। আর কামরুজ্জামান লিখনকেও আওয়ামী সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরও সন্ত্রাসীরা নির্মম ভাবে হত্যা করার জন্য চেষ্টা চালায়। তার মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে তারা চলে যায়। বেচে থাকলেও আজ সে পঙ্গু। তবে তৎকালীন বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের নেতৃত্বরা যেভাবে জীবন বাজী রেখে দলীয় কার্যক্রম করে গেছে আর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। হালুয়া রুটির ভাগ নিয়ে শকুনের মত বরিশাল আওয়ামী রাজনীতিকে এখন ছিড়ে ছিড়ে খাচ্ছে। পরিহাস হলো এদেরকে ১৬ জুলাই ২০০৭ এ বরিশালের রাজপথে দেখা যায়নি।

তারা কোন হামলা মামলারও শিকার হননি। যারা রাজপথে থেকেছে, হামলা মামলার শিকার হয়েছে তারা আজ নিজ ঘরে পরবাসী। যারা নিজের শরীর বাঁচিয়ে ঝুঁকি না নিয়ে রাজনীতি করেছে তারা আজ বরিশাল আওয়ামী রাজনীতির কর্ণধার। সেদিনের গর্জে ওঠা ছাত্রলীগের নেতাদের দেখার কেউ নেই এখন। দলের প্রধান বর্তমান প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা দেশকে আলোর পথে নিয়ে যাচ্ছেন। দেশবাসী একাগ্রচিত্তে আ’লীগ সরকার বিশেষ করে এই শতকের যোগ্য নেতৃত্ব আপনার মুখাপেক্ষি। আপনার সদয় বিবেচনায় আবেদন দলের প্রয়োজনে দুঃসময়ে যারা দলের শক্তি ছিল, যারা জাতির জনকের আর্দশকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে  সত্যিকারের সেসব বঙ্গবন্ধুর সৈনিকদের দিকে দৃষ্টি আর্কষণ করার।

আওয়ামী রাজনীতির সাথে রক্ত মাংসে মিশে আছে যারা, আর বর্তমানে বরিশালের রাজনীতির সাথে মিশে আছে যারা তাদের কাছে টেনে নেবার। এও নজরে আনার সানুনয় আবেদন জানাই, কারা দলীয় মতভেদ সৃষ্টি করছে এবং দলের স্বার্থ পরিপন্থি হয়ে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যস্ত হয়ে পরছে এই ছাত্রলীগের পরীক্ষিত সৈনিকদের রাজনৈতিক ভাবে যদি মূল্যায়ন করা না যায় তাহলে বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগ হয়তো বড় ধরনের সংকটে পরবে। তাই দলের স্বার্থ রক্ষার্থে এই সকল ত্যাগী নেতাদের যথাযথ মর্যাদা দেয়া উচিৎ।

সংবাদটি পড়া হয়েছে মোট 7341 বার