April 22, 2018 8:07 pm A- A A+

অস্ত্রবাজ-চাঁদাবাজ’ রনির বিচার চাই

অণ-লাইন ডেস্কঃ

প্রভাষ আমিনঃ
নুরুল আজিম রনির সাথে আমার আলাপ নেই,কখনো দেখাও হয়নি।ফেসবুক সূত্রে পরিচয়।তাও অস্ত্র হাতে গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর।অস্ত্র হাতে গ্রেপ্তার হওয়া একজন সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ নেতার সাথে আমার ভাব-ভালোবাসা হওয়ার কথা না।তারপরও হয়েছে।সেটা একতরফা।দূর থেকে দেখে দেখে এই সাহসী,তেজী, আদর্শে দৃঢ়,কিন্তু বোকা ও অভিমানী ছেলেটাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি।কিন্তু সে ভালোবাসার বিষয়টি রনিকে জানানো হয়নি,জানানোর দরকারও হয়নি। ফেসবুকে তালিকায় থাকলেও খুব একটা যোগাযোগ নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত কৌতূহল থেকে কিছু খোঁজ নিয়েছি।তাতে মুগ্ধতা বেড়েছে,বৈ কমেনি।বাংলাদেশে এখন কোনোভাবে ছাত্রলীগের কোনো পর্যায়ের কমিটিতে থাকতে পারলেই ভবিষ্যৎ ঝরঝরে।টেন্ডারবাজী,চাঁদাবাজী,দখলবাজী- ছাত্রলীগের আয়ের অসংখ্য উৎস। বড় নেতাদের ঘরে কমিশন চলে আসে।বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে মারামারি হয় নির্মাণকাজের ঠিকাদারীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। ছাত্রলীগের সভাপতি জেলা সম্মেলনে যান হেলিকপ্টারে চড়ে। সেখানে রনী উজ্জ্বলতম ব্যতিক্রম। সাড়ে ৪ বছর দায়িত্ব পালনের পর চট্টগ্রাম মহানগরের মত গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের সাধারণ সম্পাদকের পদ যখন অভিমান করে ছাড়লেন;তখন তার সঞ্চয় ৫টি মামলা আর দুই বছরের সাজা। রনি রাজনীতি করে মধ্যবিত্ত বাপের টাকায়।রনির সর্বশেষ ঝামেলা কিন্তু এই বাপের টাকা নিয়েই। বাপের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এক বন্ধুর সাথে ব্যবসা করতে গিয়েছিলেন।এখন সেই বন্ধু টাকাও দেয় না,ব্যবসার হিসাবও দেয় না। ক্ষেপে গিয়ে রনী তাকে চড় মেরেছেন;একটি-দুটি নয়,গুনে গুনে ১৩টি। যত রাগই হোক,কারো গায়ে আপনি হাত তুলতে পারেন না। এটা অন্যায়,শাস্তিযোগ্য অপরাধ।রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। রনি তাই হেরেও গেছেন।পদ ছেড়ে দিয়ে এখন তাকে সেই বন্ধুর করা ২০ লাখ চাঁদা দাবির মামলায় আদালতের বারান্দায় সময় কাটাতে হবে। বাপের কাছ থেকে টাকা এনে উকিলকে দিতে হবে। এমনকি জেলের ভাতও খেতে হতে পারে। অবশ্য জেলের ভাত খাওয়ার অভিজ্ঞতাও তার আছে। রনি বোকা বলে টাকা দিয়ে ব্যবসার অংশীদার হতে গেছেন। চালাক ছাত্রলীগ নেতারা শেল্টার দেয়ার বিনিময়ে ব্যবসার অংশীদার হয়ে যান। মজাটা হলো রনির বিরুদ্ধে যা যা অভিযোগ, তার সবই সত্যি। এর আগে চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষকে মারধোর করেছেন,সেটাও কিন্তু সত্যি।
এরশাদ পতনের পর থেকে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি কলুষিত হয়ে গেছে। আমার কাছে অনেকদিন ধরেই মনে হচ্ছিল,ছাত্র রাজনীতির নামে এখন যা হচ্ছে,তাতে এটা বন্ধ করে দিলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু রনি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ছাত্রনেতাদের এখনও ছাত্রদের জন্য,সমাজের জন্য অনেককিছুই করার আছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার আগে নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত টাকা নেয়া হতো। সরকার গেজেট করে নিষিদ্ধ করলেও আড়ালে-আবডালে সবখানেই বাড়তি টাকা নেয়া হয়,শুধু চট্টগ্রাম ছাড়া। কারণ চট্টগ্রামে রনি আছে।কোথাও বাড়তি ফি নেয়া হচ্ছে শুনলেই রনি ছুটে যান,ঠেকিয়ে দেন।
চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাথাপিছু পাঁচ হাজার করে টাকা আদায় করা হয়েছিল। কলেজের অধ্যক্ষ সেই বাড়তি ফি ফিরিয়ে দিতে গাইগুই করছিলেন। তাই রনি তাকে কিলঘুষি মেরেছেন।কিন্তু যে কারো গায়ে হাত তোলাই বেআইনী।আর একজন অধ্যক্ষের গায়ে হাত তোলা তো মহা অন্যায়। সেই অন্যায়টাই করেছেন রনি। এখন তাকে আইনী পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।
কিন্তু মজাটা হলো রনির বিরুদ্ধে হেনস্থার সত্য মামলা নয়,হয়েছে চাঁদাবাজীর মিথ্যা মামলা। তিনি নাকি অধ্যক্ষের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিলেন, না পেয়ে মারধোর করেছেন।আবারও সেই কথা,রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। সেই বন্ধুও কিন্তু রনির বিরুদ্ধে লাঞ্ছনার মামলা করেননি। তিনিও করেছেন চাঁদাবাজির মামলা। রনি নাকি তার কাছেও ২০ লাখ টাকা চেয়েছিল। অধ্যক্ষের করা মামলার জামিন করাতে সেই বন্ধুর কাছে পাওনা টাকা ফেরত চেয়েছিলেন রনি। কিন্তু এমন বন্ধু থাকলে তার আর শত্রু লাগে না।তবে রনির শত্রুর কোনো অভাব নেই। ঘরে-বাইরে শত্রু।জামাত-শিবির তার জীবনের শত্রু। চট্টগ্রামের মাটি জামাত-শিবিরের ঘাঁটি। সেই ঘাঁটিতে বসেই তাদের সাথে রনির লড়াই হয়। জামাত কন্যা এবং জামাতা যখন মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী আর আওয়ামী লীগের এমপি হন, আওয়ামী লীগের অনেক নেতার নীতি-নৈতিকতা-আদর্শ যখন আপসের চোরাবালিতে হারিয়ে যায়;তখনও রনিরা জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখেন। আর লড়াই করতে হাতে তুলে নেন অস্ত্র। আবারও ভুল,আইন হাতে তুলে নেয়া।জামাত-শিবির বেআইনী কিছু করলে সেটা সরকার দেখবে।অস্ত্র হাতে লড়াই করা ছাত্রনেতার কাজ নয়। এটা বেআইনী।এ জন্য পুলিশ তাকে ধরেছে। জেলও খেটেছেন।এখন মুক্ত আছেন জামিনে।গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিলে রনিকে চাঁদার জন্য গিয়ে গিয়ে মারধোর করতে হতো না। বখরা চলে আসতো বাসায়। কিন্তু রনি গা ভাসাননি, স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ান, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো রনি বাড়তি ফি’র বিরুদ্ধে লড়াই করে, শিবিরের বিরুদ্ধে লড়াই করে,খেলার মাঠ বাঁচাতে রাস্তায় নামে,খাল পরিস্কার করে।রনিটা না বড্ড সেকেলে। ডিজিটাল বাংলাদেশের ছাত্রনেতাকে হতে হবে স্মার্ট। এই অভিভাবকদের পাশে থাকা,নিজে গিয়ে মেরে আসা, খেলার মাঠ বাঁচানো,খাল পরিস্কার করা নেতাদের দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতি চলবে না। চলবে না বলেই রনিরা একা হয়ে যান,রনিদের চলে যেতে হয়,রনিরা দলছুট হয়ে যান।দলছুট তো হবেনই,বাইরের চেয়ে যে দলের ভেতরে তার শত্রু বেশি। রনি আসলেই সেকেলে। আমার ধারণা তিনি পুরোনো দিনের বাংলা সিনেমা দেখেন আর রবিনহুডের গল্প পড়েন। তাই তো তার মধ্যে ষাটের দশকের রাজ্জাকের মত রাগী যুবকের ইমেজ সৃষ্টির অবচেতন প্রয়াস দেখা যায়।রবিনহুড স্টাইলে অন্যায়ের প্রতিকার করতে চান। কিন্তু তিনি ভুলে যান,বাংলাদেশ একটি আইনী কাঠামোতে চলা রাষ্ট্র।এখানে আইন হাতে তুলে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন,প্রতিকারের জন্য আইনের আশ্রয় নিন,প্রয়োজনে নিজের পদ ব্যবহার করে উর্ধ্বতনদের প্রভাবিত করুন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আইন হাতে তুলে নিতে পারেন না। নিলে শাস্তি আপনাকে পেতেই হবে।একটু আত্মসমালোচনা করি।রনি যে অনেকদিন ধরে একা একা লড়াই করে যাচ্ছে,আমরা কিন্তু একটি লাইনও লিখিনি। কিন্তু যখনই তার মারধোরের ভিডিও ভাইরাল হলো অমনি আমরা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছি। বেচারা রনি। অবশ্য ছাত্রলীগ নেতা অধ্যক্ষকে মারছেন বা ব্যবসায়ীকে পেটাচ্ছেন,এমন ভিডিও পেলে আমিও প্রবল উৎসাহে তা প্রচার করবো।ব্যাড নিউজ ইজ গুড নিউজ। গণমাধ্যম যে কিভাবে একটি ভালো ছেলেকে সন্ত্রাসী বানিয়ে ফেলতে পারে,রনি তার উদাহরণ হয়ে থাকবে।অভিমান করে বা বাধ্য হয়ে পদ ছেড়েছেন রনি বা দল তাকে বহিস্কার করেছে। কিন্তু অভিমান করে যেন রনি রাজনীতি ছেড়ে না দেন। বাংলাদেশের রাজনীতি,সমাজ বদলাতে অনেক অনেক রনি দরকার। তবে তাকে রাজনীতিতে ফিরতে হবে অপরাধের শাস্তি ভোগের পরে। মানুষের গায়ে হাত তোলার জন্য, অস্ত্র হাতে নেয়ার জন্য যতটুকু শাস্তি পাওনা, ততটুকুই ভোগ করে শুদ্ধ রনি ফিরে আসুক। তার আবেগের জন্যই তাকে ভালোবাসি। কিন্তু সেই আবেগ হতে হবে পরিশুদ্ধ,বেপরোয়া নয়।ফিরে এসেও কারো গায়ে হাত তোলা যাবে না,আইন হাতে তুলে নেয়া যাবে না; তবে প্রতিবাদ জারি রাখতে হবে। তবে রনি যদি বদলাতে গিয়ে বিষ দাঁতটা বাসায় রেখে ঢোড়া সাপ হয়ে রাজনীতিতে ফিরলে আমি অন্তত তাকে স্বাগত জানাবো না। এমন ঢোড়া সাপ রাজনীতিতে অনেক আছে। আমরা সেই প্রতিবাদী,রাগী রনিকেই চাই,তবে তাকে হতে হবে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।ইউটোপিয়ান জগতে থেকে রাজনীতি করলে হবে না,বুঝতে হবে বাস্তবতাটাও।আসুন এই বোকা,অভিমানী,ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো রাগী যুবকটির পাশে দাঁড়াই।
পুনশ্চ:এই লেখার ঝূঁকিটা আমি জানি।একজন চিহ্নিত অস্ত্রবাজ,মারদাঙ্গা ছাত্রনেতার পাশে দাঁড়ানোর দায়ে আমাকে অনেক গালি শুনতে হবে।অনেকেই আমাকে সরকারের দালাল,ছাত্রলীগের চামচা বলে গালি দেবেন। কিন্তু সব ঝূঁকি জেনেই আমি রনির পাশে দাঁড়াচ্ছি। একটি ভালো ছেলেকে হারিয়ে যেতে দেয়া যায় না।
মতান্তরে প্রকাশিত সকল লেখার দায় লেখকের।এর সঙ্গে দৈনিক বাংলাদেশ বাণীর নীতি যুক্ত নয়।

সংবাদটি পড়া হয়েছে মোট 251 বার