রবিবার, ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং, রাত ৩:৪৮

আর কোন বসন্ত দেখতে দিলো না মেরীকে

আর কোন বসন্ত দেখতে দিলো না মেরীকে

dynamic-sidebar

আমি শাহনেওয়াজ। পেশায় একজন ক্রাইম রিপোর্টার। ঘটনাটি আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনা, বন্ধুটি দীর্ঘ বছর ইউরোপে ছিলো রাজনৈতিক আশ্রয়ে। ১৯৯৪ সালে সে যখন পূর্ব রোমানিয়ায় তখন এক সন্ধ্যায় সে দানিয়ূব নদীর সূর্যাস্ত দেখতেছিলো, তখন সে টের পায় পিছনে কার যেন ভারী হাতের স্পর্শ। পিছন তাকিয়ে দেখে এক বর্ষীয়ান স্ট্রীট রুমানিয়ান, এবং সে পুরুষ, ভাঙ্গা ইংরেজীতে যা বললো তার অর্থ হচ্ছে- যে মানুষ জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান সে মাটি বা যেখানে দাড়ায় সে জায়গাটাকে সে ভালোভাবে দেখে নেয়, তুমি সেটা করোনি, তাতে তুমি কোন অন্যায় করোনি কিন্তু তোমার পাপ হয়েছে। বন্ধুটি তাকে দেখে নিচের দিকে তাকালো, না কোন বিশেষত্ব দেখতে পেলোনা, কিছু লাল রঙা ধূসর মাটি, তার চেয়েও বলা যায় ধূলা, তবে একটু পাশেই কয়েক গুচ্ছ ঝোপ। বন্ধুটি কিছু অবাক এবং কিছু বিরক্ত হয়ে বললো, আমার একজন প্রিয় ব্যক্তি আছেন তার নাম অ্যামোনিয়াস স্যাক্কাস, বাড়ি তার তিউনিসিয়ায়, আগে ছিলেন এখন নেই, মারা গেছেন চারশো বছর আগে। তাহলে সে তোমার প্রিয় হলো কোন কায়দায়? রুমানিয়ানের

কণ্ঠে জানার আগ্রহ। জবাবে বন্ধুটি বলে, মুত্যূর পূর্বে তিনি একটা কথা বলেছেন সেজন্য, তুমি কি সেটা শুনতে চাও? লোকটি হ্যাঁ বলে। বন্ধুটি তখন জবাব দেয়, তিনি বলেছেন চেতনার সর্বোচ্চ স্তর মানিনা আর সর্বনিম্ন স্তর জানিনা। আমি চেতনার কোন স্তরে আছি সেটা কি আপনি জানেন? লোকটি স্থির চোখে বন্ধুটিকে দেখে বলে আর একটু পরে রাত জমবে। তুমি নিশ্চয়ই খাও? আমার সাথে ডিনার করবে? ভাজা মাছ আর পাউরুটি ? আগেই বলেছি বন্ধুটি আমার ইউরোপ এসেছে রাজনৈতিক আশ্রয়ে , এখানে তার ভাগ্যের অনেক কিছুই অনিশ্চিত। হোক স্ট্রীট তবুতো ইউরোপিয়ান, বন্ধুটি আন্তরিক ভঙ্গিতে রাজী হলো। তবে বললো, আমার একটা কথার উত্তর দিবেন দয়া করে। আমার কোন অন্যায় হয়নি পাপ হয়েছে, বিষয়টা কি? বৃদ্ধ তখন পাশের রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলে, চলো রাস্তায় ওখানে এখন নৈশকালীন গান গাইবে জিপসীরা তারপর বলছি। কৌতূহল নিয়ে বন্ধুটি গেলো।

দেখতে দেখতে রাস্তায় বেশ লোক জমে গেলো। রংচংএ পোষাকের জিপসী-হিপ্পিরা কি দূর্বোধ্য ভাষায় গান গাইছে বন্ধুটি বুঝতে পারছেনা, তবে বোঝা যায় কোন ট্র্যাজেডিক সং। বন্ধুটি অবাক হয়ে একবার দেখলো তার সঙ্গী রুমানিয়ানের চোখ থেকে পানি পড়ছে, কাদঁছে স্ট্রীট রুমানিয়ানটি। সে রাতে দানিয়ূব নদীর তীরে বন্ধুটি ভাজা মাছ আর পাউরুটি খেতে খেতে সেই স্ট্রীট রুমানিয়ানের মুখ থেকে যা শুনলো আমি সেই বর্ণনাগুলো হবহু দিচ্ছি- তখনও ইউরোপে রেনেঁসা শুরু হয়নি। ষোড়শ শতকেরও পূর্বের কথা। রুমানিয়ায় ট্রান্সিলভেনিয়া নামের একটি গ্রাম আছে সে গ্রামটির আর একটি নাম গিলবার্ট, গিলবার্ট নামের আর একটি গ্রাম আছে পতূর্গালে সে গ্রামে ডন পেড্রো নামের এক প্রাক্তন জলদস্যূ বাস করতো, রুমানিয়ার গিলবার্ট গ্রামেও ডনপেড্রো নামের এক আউট’ল বাস করতো তখন। একবার এক বড়দিনের উৎসব শেষে গ্রামবাসীরা নৈশভোজ শেষে ঘুমাতে যায়। গ্রামে একটি বড় গীর্জা, সেখানে বড় ঘন্টাটি প্রতি ঘন্টায় বাজিয়ে গ্রামবাসীদেরকে সময় জানানো হয়। সে রাতে ডনপেড্রো গ্রামের পরিত্যক্ত পুরনো কবরস্থানের পাশের এক ভবঘুরেদের সরাইখানায় বসে মদ্যপান করছিলো, রাত বারোটার ঘন্টাধ্বনী শুনে কাঠের টেবিল চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাবে বিছানায় তখন হঠাৎ শুনলো তীক্ষ্ম গলার একটা গান বাতাসে গ্রামময় যেন ছড়িয়ে পড়ছে। গানটা এরকম- ক্ষয়ে যায় ট্রান্সিলভেনিয়া আর তাই মাঝ রাতে প্রতিবেশীনি মেরী বেটসীর সমাধীটা বেশ করে খোড়ো তুমি ও বুড়ো সায়মন আর কোন বসন্ত দেখতে দিলে না মেরী বেটসীকে.. ডনপেড্রো দরজা

খুলে বাইরে বের হয়। কিন্তু চারিদিকে নিরব গ্রাম আর প্রকৃতি, ফ্যাকাসে আলোর জমাট অন্ধকার। ভাবলেশহীন পেড্রো চুপচাপ ঘুমাতে যায়। পরের রাতে পেড্রো একইভাবে সেই গানটি শোনে এবং তা ঠিক রাত বারোটার ঘন্টা ধ্বনীর পর। কয়েক রাত এরকম শোনার পর এক সকালে পেড্রো একটা ধারালো ভোজালী নিয়ে পরিত্যক্ত কবরস্থানে কি সব খোড়াখুড়ি করে, গাছ-গাছালি লতা-পাতা কাটে। তার ঠিক এক সপ্তাহ পড়ে এক শেষ বিকালে ডনপেড্রো গীর্জায় যায়, ঐ সময়ে ফাদার রোনাল্ড চার্চের সবুজ চত্বরে হেলানো চেয়ারে বসে শেষ বিকালের সূর্যাস্ত দ্যাখে। পেড্রো সরাসরি ফাদারের সামনে যেয়ে বলে ফাদার আমি কি অভিশপ্ত? ফাদার বলে, না বাছা জগতের কোন মানুষই অভিশপ্ত নয়, স্বয়ং প্রভূ যীশু বলেছেন পাপকে ঘৃনা করো পাপীকে নয়। পেড্রো তখন তার ডান হাতটা পিছনে নিয়ে বলে ফাদার পূর্ব গিলবার্টের পরিত্যক্ত কবরস্থানে যে ঘুমাচ্ছে সেই অ্যালেন আমার দূর সম্পর্কের বোন হতো, ধীরে ধীরে ফাদারের কপালে ভাঁজ পড়ে, চেহারায় একটা কুৎসিত ছায়া পড়ে। পরদিন সমগ্র ট্রান্সিলভেনিয়াবাসী জানতে পারলো

মাতাল হয়ে জেলখাটা অপরাধী ডনপেড্রো ভোজালী দ্বারা পুরোহিত ফাদার রোনাল্ডোকে হত্যা করেছে। ঘটনা হচ্ছে অ্যালেন বেটসীর মেয়ে মেরী বেটসীকে ডাইনী বিদ্যা যেটা কিনা উইচ সেই চর্চ্চার অপরাধে জীবন্ত কবর দেয় কিছু উত্তেজিত গ্রামবাসী, রাতের অন্ধকারে। ফাদার রোনাল্ড ছিলো সেই হত্যাযজ্ঞের নেতৃত্বে তখন সে ছিলো যুবক বয়সী এবং সায়মন নামে গোরখোদকের কাজ করতো। গান শোনার পর পেড্রো পুরনো কবরস্থানের আগাছা সাফ করে একটি কবর আবিষ্কার করে যেটা এ্যালেন বেটসী নামের এক মহিলার, অতঃপর পেড্রো গ্রামবাসী কারো কাছ থেকে জেনে নেয় অ্যালেন বেটসীর মেয়ে মেরী বেটসীকে ডাইনী বিদ্যা চর্চ্চার অপরাধে জীবন্ত গোর দেয়া হয় ট্রান্সিলভেনিয়ার কোথাও। অ্যালেন ডনপেড্রোর কিছু হয়না। মা অ্যালেন বেটসী ঘটনার পরদিন ক্ষোভে-দুঃখে আত্মহত্যা করে। তাকে সেখানে কবর দিয়ে গীর্জা কর্তৃপক্ষ কবরস্থানটিকে পরিত্যক্ত ঘোষনা করে এবং গীর্জা সংলগ্ন নতুন কবরস্থান নির্মান করা হয়। ডনপেড্রোকে গ্রামবাসীরা দানিয়ূব নদীর তীর থেকে আটক করে হাত পা বেধে নদীতে ফেলতে চাইলে গ্রাম পঞ্চায়েত নিষেধ করে বলে, না তা হলে দানিয়ূব নদীর জল অপবিত্র হবে। তাকে নদীর তীরে জ্যান্ত কবর দেয়া হয় যেখানে আমার বন্ধুটি দাড়িয়ে ছিলো, ডাইনিবিদ্যা চর্চ্চা করুক আর না করুক জিপসী হিপ্পি বোহেমিয়ানদের একটা বড় অংশের কাছে মেরী বেটসী এবং ডনপেড্রো হিরো-হিরোইন, তাদের নিয়ে তারা অনেক শোকগাঁথা নির্মান করে। যদিও বর্তমান সমাজের কাছে পেড্রো মধ্যযুগের ডাইনীবিদ্যাকে সমর্থন করার অপরাধে পরিত্যক্ত, ঘৃনিত।

17Shares

Count currently

  • 35565Visitors currently online:

Counter Total

Facebook Pagelike Widget

Desing & Developed BY EngineerBD.Net

error: Content is protected !!