বুধবার, ২২শে মে, ২০১৯ ইং, রাত ১১:১২

মুক্তিযুদ্ধের এক অকথিত ইতিহাস “কপিলমুনি “

মুক্তিযুদ্ধের এক অকথিত ইতিহাস “কপিলমুনি “

dynamic-sidebar

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলার দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলে হানাদার-রাজাকারদের দখলকৃত একটি ভয়ঙ্কর দূর্গবাড়ি ছিলো, যার নাম কপিলমুনি। বাংলার মুক্তিকামি মানুষের উপর এমন কোন বর্বরতা নেই যা কপিল মুনিতে সংঘটিত হয়নি! ইতিহাসের সেই সব সত্য ঘটনা অবলম্বনে
কপিলমুনি!
১.
নদীর নাম শিবসা। তখন বর্ষাকাল। দিবা-রাত্তির মুষল ধারায় বর্ষন। চাগাড় দেয় শিবসা, দু’কুলে উপচানো জল। বানের জলে ভেসে যেতে চায় পাইকগাছা আর দাকোপ। কোন রকম জমিন আকঁড়ে ধরে বাচঁতে চায় মানুষ আর পশু। একটা শক্ত বজরা নদীর কুল ধরে ঠাহরে ঠাহরে যাচ্ছে। যে কুলে দাকোপ সেই কুল ধরে। হাল ধরা গাজী আয়াতউল্লাহ জোরে চ্যাচায়, হা-জা-রি নাও চললে বিপদ হইবে! ঢেউ ভাঙ্গার শব্দ আর বাতাসের ক্রুদ্ধ গর্জন ছাপিয়েও গাজীর গলা শোনে হাজারি। পাল্টা আওয়াজ দেয় । কুনহানে? আরো কি সব বলে হাজারি কান পেতে সে সব শোনা লাগে। হালের মোটা দন্ড দুইহাতে জাপটে ধরে জিরান দেয় আয়াত গাজী। বেদমই হাপাচ্ছে। সাদা কম্বলের মত চারদিকে ফ্যাকাসে, বৃষ্টির এমন তেজ। সজোরে বাতাস হাড় ভেদ করে। মাথার উপরে আচ্ছাদন ছিলো সে সব ছিঁড়ে ছিঁড়ে উড়ে গেছে শিবসার আকাশে বাতাসে। মনু হাজারির কথা সত্য, বজরা ভিড়াতে গেলে বিপদ.. ১৭৬০ সাল। বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত। নবাব সিরাজউদ্দৌলা নিহত! মুর্শিদাবাদ ক্লাইভ-মীরজাফর আলি খানের দখলে। তাদেরকে সমর্থন দিচ্ছে সাবেক পূর্নিয়া রাজ্যের সেনাপতি ইয়ার লতিফের অনুগত সৈন্যরা। নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিশ¡স্ত যোদ্ধাদের মধ্যে বেচেঁ যাওয়া নৌবেসিং হাজারির কিছু লাঠিয়াল (বর্তমান) দক্ষিন খুলনা অঞ্চলের পথ ধরে বজরা সহযোগে উত্তরে অগ্রসর হচ্ছে। গন্তব্য বরিশালের গৌরনদী। সেখানের জমিদার সৈয়দ ইমামউদ্দিন নবাব সিরাজের অনুসারী। মুর্শিদাবাদের গেরিলারা বিভিন্ন পথে নলচিড়ায় সমবেত হচ্ছে । দেশীয় বিশ্বাসঘাতক আর ইংরেজ দখলদারদের বিরুদ্ধে পূর্বাঞ্চলের শেষ চেষ্টা। একটা আশার খবর হচ্ছে চাখারের প্রভাবশালী মজুমদাররা সৈয়দ ইমামউদ্দিনের সাথে যোগ দিয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ইংরেজ সৈন্যদের অবস্থানের উপরে তিনটি কামান দাগাচ্ছে ইমামউদ্দিনের গোলন্দাজ বাহিনী। কামানের গোলার অভাব। বজরায় করে গোলার সরবরাহ যাচ্ছে নলচিড়ার উদ্দেশ্যে। গাজী ভাই, বজরার কাষ্ঠ এবং সিক্ত দেয়াল ধরে ধরে আসে মনু হাজারি। কবা কি কও, আলো নিভা যাইবে , কতা কম সব গুছায়া গাছায় লইতে হইবে। তাগাদা দেয় আয়াতউল্লাহ গাজী।
২.
বসন্ত চলে গেছে। পূর্ব বাংলায় এপ্রিলের শুরু হবে আর মাত্র কিছুদিন। তবে যুদ্ধ এসে ফের হানা দিলো বাংলায়। ঘাতক ট্যাংক, ভারী মর্টার আর মেশিনগান কালবোশেখি হয়ে উড়ালো রাজারবাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, বুড়ো বটের পাখির দঙ্গল আর আলিম মোড়লের রক্তে আকাঁ সাদা চাদর। ২৮ শে মার্চ সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ সালাম মোড়ল সংবাদ পায় ভূষুন্ডির মাঠে কারা কারা যেন এয়েচে, অদ্য আসরবাদ মোদাব্বের মন্ডলের উঠানে সালিশ বসবে থাকা জরুরী, কার্তিক ঘোষের কন্যার বৈবাহিক সম্বন্ধ পাকাপাকি হবে ভস্সন্ধ্যেবেলা, পাত্র বিল ডাকাতিয়ার পাড়ের সুশীল ভদ্রের বড় পুত্র। আর একটি কথা বলতে বলতে থামে মর্করম। মেজাজ খারাপ হয় সালাম মোড়লের। শেষ চুমুকে চা তলানিতে ঠেকিয়ে দোকান ছাড়ে ইয়ার বন্ধুদের নিয়ে ভীড় বাচিঁয়ে। কাছাড়িবাড়ির দিকে হাটা ধরে। পিছে পিছে মর্করমও। সালাম ভাই দাড়ান এট্টুহানে। বুক ভরে শ্বাস নেয় ও টের পায় সালাম মোড়ল। গা করেনা। হাটা থামায়না। ছাগোলের গুষ্ঠি , গাল পাড়ে মনে মনে। একটা কথা সোজাভাবে বলতে যেয়ে সাতেরো বার মোচড়াবে.. ভস্সন্ধেবেলা নিশিরে দেখা হয়না সুনিল ভদ্রের। মোড়ল বাড়িতে বুক ফাটা কান্না! আহারে মানুষ এমন কলজে খা খা করা ঢুকঁড়ে কান্দে! মানুষের এ কেমন দুনিয়া? পাথরের মূর্তি যেন সালাম মোড়ল। ইয়ার বন্ধু দু’চারজন ছড়ানো ছিটানো বসা নির্বিকার। সবচেয়ে ঘাড়ত্যাড়া শাহাদাৎ আনমনে কচি ঘাষের ডগা চিবায় , ক্ষুধা না রাগের দমকে না ক্ষোভ ঘৃনার ঠাহর করা যায় না। কেবল মর্করম কোনদিকে না তাকায়ে ফিসফিসের মত বলে, আমিতো সে কথা কইতে চাচ্ছিলাম দুপুর অক্তে, ছোট মেয়াভাইরে মিলিটারীরা গুল্লি দিছে , গঞ্জেরতন কার থেইকা যে শুনলাম, মর্করম গভীর ভাবতে থাকে এমুন আচানক সম্বাদটা কেডায় দিলো ক্যাঠায় সেই জন? (চলবে)- এস এম তুষার

31Shares

Count currently

  • 102122Visitors currently online:

Counter Total

Facebook Pagelike Widget

Desing & Developed BY EngineerBD.Net