বৃহস্পতিবার, ২২শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, রাত ২:০২

ঘুরে আসুন ধাঁধার চর

ঘুরে আসুন ধাঁধার চর

গিয়েছিলাম ঢাকার পাশেই ধাঁধার চর। সাত সকালে বের হয়ে যানজট ঠেলতে ঠেলতে, মাঝে জুমা নামাজের বিরতি দিয়ে পৌঁছাই বেলা আড়াইটায়। স্থানীয় এক টুর্নামেন্টের খানা-পিনার আয়োজনে আচমকা ভাগ বসিয়ে উদর পূর্তি করি বেশ আয়েশ করে। আগে থেকেই চাটারবাগের সোহেলের বদৌলতে ঘাটে নৌকা ছিল প্রস্তুত, আর দেরি না করে নাও ভাসাই শীতলক্ষ্যার জলে, আমাদের দল দে-ছুট ছুটছে রানীগঞ্জের ধাঁধার চরপানে। নদীর দুকূলে বীজতলার সবুজ আর নানা বর্ণ ধারণ করা সবজি ক্ষেতের আবহ তৈরি করেছিল এক ভিন্ন জগৎ। হরেক ঋতুতে প্রকৃতির নানা রূপ— এ যে ‘দেশ চেনা’ আয়োজনেরই বিশেষ অংশ, অল্প সময়ের মধ্যেই কালো রঙের পানকৌড়ি আর সাদা বকের বিচক্ষণ চাহনির ছুটে চলা ভঙ্গি, সঙ্গী করে নাও ভেড়ায় মাঝি ধাঁধার চরঘাটে। তীর থেকে অল্প একটু হাঁটতেই চোখ গিয়ে ওঠে কপালে— ওয়াও! ঔসম! চর বলে কেন এটাকে অবমূল্যায়ন করা হয়— মাথায় খেলে না আমার! ধাঁধার চর যেন সবুজের মাঝে একখণ্ড দ্বীপ। শীতলক্ষ্যার বুকে অপার সম্ভাবনা নিয়ে জেগে ওঠা প্রকৃতির এক অপরূপ নিদর্শন। শস্য ও ফলদ বাগানে ভরপুর। লম্বাকৃতির ধাঁধার চরের একপাশ থেকে আরেক পাশে হেঁটে বেড়ানোর মজাই আলাদা। পেয়ারা, কলাবাগানের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে মনে হবে যেন হারিয়ে যাচ্ছি অজানাতে, লতাগুল্ম আর আকাশছোঁয়া গাছের ছায়ায় মনেই হবে না যে, আপনি আছেন ব্যস্ত নগরী ঢাকার পাশেই কোলাহলের জেলা গাজীপুরের মাঝে। সত্যিই ধাঁধার চর যেন সৌন্দর্যের গোলকধাঁধা। স্থানীয়রা অনেকে এটাকে মাঝের চর নামেও ডাকে। ভ্রমণপিপাসুদের কাছে শিগগিরই ধাঁধার চর হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম ঘুরে বেড়ানোর প্রাণকেন্দ্র। মানুষজনের আচার-আচরণও পর্যটনবান্ধব। সহযোগিতা করার জন্য তারা যেন মুখিয়ে থাকে। ইচ্ছা হলে গাছ থেকে নিজ হাতে পেড়ে খাবেন ফল, বাধা নেই কোনো। একসময় মনে হবে নিজের বাগানেই যেন আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। চরে বসে দেখা লাল টুকটুকে সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য আপনাকে নিশ্চিত ধাঁধার চরে ফিরিয়ে নিতে চাইবে বারবার। গোধূলিলগ্নে নৌকা ভাসল, গন্তব্য এবার তারাগঞ্জ। সঙ্গীদের উচ্ছ্বাসে নদীর পানিতে যেন ঢেউ খেলে। গাজীপুর জেলায় বহমান শীতলক্ষ্যা নদীর পানি বেশ পরিষ্কার। এ পাশটায় পানি যেন গাঢ় নীল। আনমনেই গেয়ে উঠবেন: ও নীল নয়না… আমার কথা কি তোমার মনে পড়ে না। সত্যিই নদীদূষণের এ দুঃসময়েও এখানকার পানি নীলাভ স্বচ্ছ। নীড়ে ফেরা পাখি আর দলবেঁধে পানিতে ভেসে বেড়ানো পাতিহাঁসের পিছু পিছু ছুটে আধাঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন তারাগঞ্জ গ্রামে। সাজানো-গোছানো, প্রকৃতির মাঝে গড়ে ওঠা তারাগঞ্জ গ্রাম। সেই গ্রামেরই সহজ-সরল ছেলে মুরাদ রানা ঢাকা থেকে ঘুরতে এসেছি জেনে বেজায় খুশি, নিয়ে গেলেন তাদের বাড়ি। পান করালেন গাছ থেকে পেড়ে কচি ডাবের পানি। সত্যিই অবাক করা বিষয়! পথিকের জন্য তাদের এত ভালোবাসা? নদীর কূলে তারাগঞ্জ গ্রাম। চারপাশে সবজি ক্ষেত, ভেসালে মাছ ধরার দৃশ্য, খোলা প্রান্তর। সব মিলিয়ে বসন্তের মৃদু হাওয়ায় জোছনা রাতে ক্যাম্প করার মতো অসাধারণ এক মায়াবি পরিবেশ।

সন্ধ্যা ৭টা, এবার বিদায়ের পালা, অর্ধচন্দ্রের মায়াবী আলো আর ওই দূর আকাশে মিটিমিটি করে জ্বলে থাকা তারাবাতি সঙ্গী করে ফেরার পথ ধরি।

যোগাযোগ

ঢাকার মহাখালী থেকে ভাওয়াল পরিবহনে কাপাসিয়ার রানীগঞ্জ বাজার। ভাড়া ১২০ টাকা। এছাড়া গুলিস্তান থেকে প্রভাতী বনশ্রীতে কাপাসিয়া বাজার, সেখান থেকে সিএনজি বা অটোতে রানীগঞ্জ বাজার। খেয়াঘাট থেকে ইঞ্জিন নৌকায় ধাঁধার চর ও তারাগঞ্জ সারা দিনের জন্য নৌকা ভাড়া নেবে ১৫০০-১৮০০ টাকা। দিনে দিনে ঘুরে আসা সম্ভব, তবে দূর জেলাগুলো থেকে যারা আসতে চাইবেন, তারা গাজীপুর জেলা সদরে রাত যাপন করতে পারবেন। সেখানকার আবাসিক হোটেলগুলোয় আগে থেকে বুকিং দেয়ার প্রয়োজন নেই।

কোথায় খাবেন

রানীগঞ্জ বাজারে মোটামুটি মানের খাবারের রেস্টুরেন্ট রয়েছে। আর যদি সারা দিনের জন্য নৌভ্রমণ ও ধাঁধার চরে কাটাতে চান, তাহলে প্যাকেটে খাবার সঙ্গে নিন।

আর কী কী দেখবেন

বাঘের বাজারে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, ভাওয়াল রাজবাড়ী, জাতীয় উদ্যানসহ অনেক কিছু।

টিপস

সঙ্গে করে নেয়া অপচনশীল দ্রব্য বা মোড়ক যত্রতত্র না ফেলে ব্যবহারের পর আবার প্যাকেট করেই নিয়ে আসুন।

ঘুরে বেড়ানোর সময় খেয়াল রাখবেন—সবজি ক্ষেত, ফলের গাছের যেন কোনো ক্ষতি না হয়।

ধাঁধার চরে এখনো সেভাবে পর্যটকদের পদচারণা, নেই সুতরাং ভালো হবে, যদি স্থানীয় কাউকে সঙ্গে রাখেন। তবে ঘুরে বেড়ানো যথেষ্ট নিরাপদ।

10Shares
Categories

Desing & Developed BY EngineerBD.Net