বুধবার, ২২শে মে, ২০১৯ ইং, রাত ১১:৫২

যে আলো কৃষ্ণপক্ষের!

যে আলো কৃষ্ণপক্ষের!

dynamic-sidebar

পর্ব এক ( ০১ )

১৯৮২ সালের শেষ দিকে চারজন যুবক ঘুরতে আসে কীর্তিপাশা অঞ্চলে। অঞ্চলটা ঝালকাঠী জেলাধীন। অনেক পুরানো আমলের জায়গা। সেখানে একটা পুরাতন জরাজীর্ণ জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ আছে আর আছে তার পার্শ্বস্থ একটা সহমরন বেদী। তারা অর্থাৎ সেই যুবকরা আসে অনেক দুর থেকে, আসে মূলতঃ জমিদার বাড়ি আর সহমরন বেদীটা দেখতে। সকালে আসে, দুপুর পর্যন্ত ঘোরাঘুরি করে। জীর্ন জমিদার বাড়ির অবশিষ্ট দেখে, তার পাশে সেই আমলের দীঘি দেখে, বড় হরিমন্দির দেখে আর দেখে মন্দিরের বিপরীতে সেই সহমরন বেদী। চুপচাপ শুয়ে আছে বেদীটি। পাশে ছোট একটি কৃষ্ণ মন্দির। পাশে কীর্তিপাশা বাজার, সেখানে দুপুরে পেট ভরে ভাত-তরকারী খায় সেই চার যুবক। খেতে খেতে স্থানীয় বয়স্ক দোকানীর কাছে টুকটাক কথাবার্তা বলে তারা জানতে পারে- অনেক আগের এক জমিদার কীর্তিনারায়ন রায়ের নামে এই অঞ্চলের নাম কীর্তিপাশা। সেই জমিদারের পরের কোন জমিদারের স্ত্রী না যেন কন্যার সহমরন বেদী ওইটা। দোকানী এর বেশী কিছু বলতে পারেনা। খাওয়া শেষ করে চার যুবক ফের ঘুরতে বের হয়। গ্রাম দেখে। শেষ বিকালে তারা হরিমন্দিরের ভিতরে ঢোকে। সেখানে কিছু ভক্ত আর পুরোহিত। ধর্মালোচনা করছে তারা। যুবকদের দেখে পুরোহিত কথা থামিয়ে ইশারায় তাদেরকে বসতে বলেন। তারা বসতেই পুরোহিত বলেন, বাবারা তোমরা রাতে ঐ জমিদার বাড়িতে থেকোনা। এক যুবকের মুখ ফস্কে বের হয়, কেন ঠাকুরজী সাপের ভয়? পুরোহিত বলেন, বাবা কিসের যে ভয় তাতো বলতে পারবোনা তবে ভয় যদি হয় তবে তা সাপের চাইতেও। সিনিয়র যুবকটি বলে, ঠাকুর সতর্ক করার জন্য ধন্যবাদ তবে দেখি, রাততো এখনও অনেক দূরে।

পুরোহিত তাদেরকে কিছুক্ষন দেখে বিগ্রহের স্থান থেকে একটা মোমবাতি নিয়ে সিনিয়র যুবকের হাতে দিয়ে বলে , বাবা অসোয়াস্তি মানুষের পরম বান্ধব, যখন যে মুহুর্তে স্বস্তি পাবেনা তার মানে সামনে কোন ঘটন বা অঘটন, ঐ সময় ভগবান মানুষকে সতর্ক হবার সময় ও সুযোগ দেন। তখন মনে করে দিবা হউক রাত্তির হউক মোমবাত্তিটা জ্বালাবা। এই বলে পুরোহিত ফের ভক্তদের সাথে ধর্মালোচনায় মগ্ন হলেন। যুবক চারজন কিছুক্ষন বসে থেকে মন্দির থেকে বের হলো এবং ফের জমিদার বাড়ির দিকে যাত্রা করলো। এরপর যেটা হলো- তারা জমিদার বাড়ির মুল ভবনের মধ্যে প্রবেশ করলো। জমিদার বাড়ির মুল ভবনটার সামনের দিকে পূজা মন্ডপ, সেটা হাতের ডানদিকে রেখে মুল ভবনে প্রবেশ করতে হয়, সেখানে ভাঙ্গাচোড়া, আগাছার জঞ্জাল, অন্ধকার কোথাও এমন জমাট যে দিনের বেলাও আঁধারে ঢেকে থাকে। মুল ভবনে বেশ কয়েকটি প্যাসেজ, কিছু চোরাকুঠুরি সড়ুঙ্গের মত। যুবকগন একটি প্যাসেজ এবং একটা সুড়ঙ্গের মধ্যবর্তী একটা কক্ষের মেঝে সাধ্যমত সাফসুতরো করে সেখানে চাদর বিছিয়ে বসলো। তারা প্রত্যেকেই ট্র্যাভেলব্যাগ বহন করে এনেছে। তার মধ্যে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র। তারা যে যার মত আপন ভূবনে মগ্ন হলো। চার যুবকের দু‘জন মুসলমান, একজন হিন্দু অপরজন খৃষ্টান। যে খৃষ্টান সে একটা বই পড়তে ছিলো। যে হিন্দু সে নীচু স্বরে কবিতা আবৃত্তি অনুশীলন করতে লাগলো এবং মুসলমান বন্ধুদ্বয় খাতা কলম নিয়ে কি সব হিসাবে ব্যস্ত। অনেকক্ষন পরে তখন এশার নামাযও শেষ, মুসুল্লীগন যে যার বাড়ি ফিরে গেছে। আশপাশ বা দূর থেকে ছাড়া ছাড়া শব্দ, কথার আওয়াজ এইসব আর কানে আসছেনা, জীর্ন জমিদার বাড়িটি জমাট অন্ধকার আর নিঃশব্দের চাদরে গা ঢাকা দিয়েছে। শুধু নিঃসঙ্গ দ্বীপের মত খান কয়েক মোমবাতি জ্বলছে। তার আলোয় চারটি ছায়া মাঝে মাঝে কেপেঁ কেপেঁ ওঠে , দু’এক পাশের দেয়াল বড় জায়গা নিয়ে ভাঙ্গা যে পড়ার মত কোন অবলম্বন পায়না ছায়ারা। সেই খৃষ্টান যুবক পড়তে পড়তে দেয়ালের সেই ভাঙ্গা অংশের দিকে চোখ রাখে, কিন্তু অন্ধকারে দৃষ্টি যায়না, ফের বইয়ের পাতায় দৃষ্টি দেয়। কি মনে করে আবার সেই অন্ধকারে চোখ রাখে। তার কেন যেন মনে হচ্ছে দেয়ালের ভাঙ্গা অংশের দিকে কেউ একজন তাকে একবার হাত ইশারায় ডাকছে আবার কি সব যেন বলছে। হিন্দু যুবক আবৃত্তি করতে করতে হঠাৎ থেমে গেলো, তার কেন জানি আচমকা মনে হলো দ্বিতলে একটা বিপদজনকভাবে ভাঙ্গা পাঁচিলের উপর কেউ একজন এলোমেলো পদক্ষেপে হাটছে, যে কোন সময় পা হড়কাবে, তাকে বাচাঁনো বা সাবধান করা জরুরী। যে মুসলমান যুবকদ্বয় হিসাব মেলাতে ব্যস্ত ছিলো তাদের একই সাথে মনে হলো খালপাড়ে কেউ একজন মারাত্মক বিপদে পড়েছে, তার সাহায্যার্থে এক্খনি দুজনের ছুটে যাওয়া উচিত। কিছু সময়ের মধ্যে সেই চার যুবক তিনদিকে ছুটে গেলো। খৃষ্টান যুবক ঝটকা মেরে উঠে ভাঙ্গা দেয়ালের অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো, হিন্দু যুবক বেশ কসরত করে ভাঙ্গা সিড়ি মাড়িয়ে দ্বিতলে উঠে গেলো, আর মুসলমান যুবকদ্বয় প্রায় দৌড়ে চলে গেলো পাশেই খালপাড়ে। পরদিন দুপুর নাগাদ সেই চার যুবক ভিন্ন ভিন্ন পথে যে যার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো। তারা ভোলা,বরগুনা,পিরোজপুর আর পটুয়াখালীর বাসিন্দা এবং একটি ঐতিহ্য ও পুরাতত্ব পর্যটন সংস্থার সদস্য। 
তার মাস ছয়েক পরের কথা- ভোলার বাসিন্দা সেই হিন্দু যুবক এক ঝড় জলের রাতে মারা যায়। কোথাও থেকে ফিরছিলো প্রায় মাঝরাতে। প্রবল বর্ষনে ভিজতে ভিজতে বাড়ি আসে। পরদিন সকালে আকাশ পাতাল জ্বর, ডাক্তার কবিরাজ সব দেখানো হলো চিকিৎসা ভালোই হলো কিন্তু অনিল মারা যাবে সামান্য বৃষ্টি ভেজা জ্বরে সেটা কেউ ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করেনি। পরদিন গত রাতের ঠিক সেই সময়ে প্রবল বর্ষনের মধ্যে নিজ ধামে অনিল দেহত্যাগ করে। শোকে সবাই স্তব্ধ, বাক্-শক্তিরহিত, অনিলের মা,বাবা, ভাইবোন আরো আত্মীয়-স্বজনগন। কিন্তু অনিলের বড়দা সুনিল মূখার্জী ভীড় বাঁচিয়ে একাকী উঠানের এ কোনে বসে গভীর ভাবে একটি বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে লাগলো যে, মারা যাবার পূর্বে অনিল প্রলাপের মত বার বার বলেছে- অ দাদা মোবাতি তুই খুজে জ্বালাবি ও দাদা.. আরো কি কি সব বলেছে তা আর ভালো করে শোনা যায়নি, এইটুকু মোটামুটি পষ্ট করে বোঝা গেছে। যথারীতি অনিলের দাহ হলো। দিন যায় রাত আসে, রাতও শেষ হয়, অনিলের শ্রাদ্ধের সময় ঘনায়। কিন্তু সুনীলের মন থেকে কিছুতেই সরেনা- ও দাদা মোমবাতি তুই খুজে জ্বালাবি। সবার ছোট অনিলের তিন দাদা, কোন দাদাকে বলছিলো সেটা বিষয় না, সুনীল মূখার্জীর ভাবনা মোমবাতি কোথায় খুজে কোথায় জ্বালাবার কথা বলেছে অনিল? শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান চলছে। নেমন্তনে আসা অতিথিগন খেতে বসেছে সারি সারি। পাতে ভাত বেগুন ভাজা, পাঁচ মিশাল মাছ আলুর তরকারী, ছাগমাংস, পায়েস। সুনীল মূখার্জীর দায়িত্ব ছিলো বেগুন ভাজার তত্বাবধান। সেই সময়ে সুনীল লক্ষ্য করে যে সাধূ গোছের এক লোক ঠিক সাধূও নয় আবার গেরস্থ বলেও মনে হচ্ছেনা, তেমন এক ব্যক্তি উঠানের কোনের বড়ই গাছটা ধরে দাড়িয়ে আছে এবং মনে হলো গভীর মনযোগে লক্ষ্য করছে বড় একটা ডেকছির দিকে এবং ডেকছিটায় পাচঁমিশালী মাছ আলুর তরকারী। প্রথম বিষয়টা শুধু এক নজর দেখে সুনীল কিন্তু কিছু ভাবেন্ িকাজের ব্যস্ততায় আধঘন্টা ঠিকভাবে দমও ফেলবার ফুরসত পায়নি। আধঘন্টা পর হঠাৎ সে লক্ষ্য করলো যে, সেই সাধূ গোছের লোকটি ঘুরে ঘুরে সে জায়গাগুলোতে যাচ্ছে যেখানে মাছ-আলুর সালুনের ডেকছি। এইবার সুনীল মূখার্জীর কৌতূহলের মাত্রা বেড়ে যায়। এরপর যেটা হলো , সুনীলের মনে হলো সাধূ মত লোকটি বেছে বেছে নেমন্তন্নে আসা তাদের চেহারা যেন মুখস্থ রাখছে যারা সব খাচ্ছে কিন্তু মাছ-আলুর তরকারীটা খাচ্ছেনা। সুনীল বেগুনভাজার তত্বাবধানের দায়িত্ব মেজো ভাইয়ের উপর ছেড়ে প্রায় সাধূর পিছু নিলো, বিষয়টি কি ভালোভাবে দেখতে হবে, জানতে হবে। সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করলে প্রায় সাধূ ঠিকঠাক নাও বলতে পারে কিংবা সোজাভাবে সত্য কারনটি নাও বলতে পারে….
তার অনেক বছর পরের কথা। ২০১১ সালের প্রায় শেষভাগে এক শ্মশান দিপালীর শেষ রাতে বৃদ্ধ এক সাধূবাবা একটি সমাধী বেদীতে একটি মোমবাতি জ্বালায়। সে আলোতে দেখা যায় সমাধী বেদীর গাত্রে উৎকীর্ন – সুনীল মূখার্জী আমাদের বড় দা, বড় বৃক্ষের ছায়ায় রেখেছিলে আমাদের। চৈত্রের খড়ায় বেঁচে থাকা তোমার স্নেহের সুশীল মূখার্জী, নলিনী মূখার্জী, স্নেহলতা, সরোজীনি মূখার্জী..
পরিশিষ্ট-


১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সম- সাময়িককালে কীর্তিপাশার সেই জমিদার বাড়িতে প্রান ছিলো। তখন জমিদার ছিলেন রাজকুমার সেন। এক ঝড় জলের রাতে জমিদারিত্বের লোভে রাজকুমার সেনকে তার দেওয়ান আর ঠাকুর খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যা করে। এবং বিভিন্ন কৌশলে বিশ্বাসঘাতক সেই দুইজন আরো কিছু ষড়যন্ত্রকারীদের নিয়ে আফিম খাইয়ে রাজকুমার সেনের স্ত্রী সুভদ্রা দেবীকে সহমরনে বাধ্য করে। সেই চার যুবক জমিদার বাড়ির পাশে যে সহমরনের বেদীটা দেখেছিলো সেটা সেই বেদী। সহমরনের নামে সুভদ্রা দেবীকে হত্যার রাতে ঠাকুর আর দেওয়ান আবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সেই চার যুবক যে কক্ষে মোমবাতি জ্বালিয়ে বিশ্রাম নিয়েছিলো সেই কক্ষেই তারা দুজনে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। জমিদার এবং তার পত্নীকে দুনিয়া থেকে সরানো হয়েছে কিন্তু পথের কাঁটা রয়ে গেছে, জমিদারের নাবালক সন্তান, পাচঁ বছর বয়সী পুত্র প্রসন্ন কুমার সেন। কিন্তু তাকে আগলে রেখেছে নিহত জমিদার রাজকুমার সেনের অতি বিশ্বস্ত ভৃত্য রাজু ভান্ডারি। নিশ্চিত মৃত্যূর মুখে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজু ভান্ডারি বালক প্রসন্নকুমার সেনকে বুকে আগলে রাখে। প্রায় প্রতি দিন অবস্থান বদল করে নিরাপদ আশ্রয় নিতে হচ্ছে। সেই সঙ্কটময় মূহুর্তে রাজু ভান্ডারির পাশে এসে দাড়ায় এক মৃধা, তার নাম রজব মেরধা। হিন্দু জমিদারদের মুসলমান লাঠিয়ালকে বলা হয় মৃধা, দেশজ গ্রামীন উচ্চারনে মেরধা। বালক প্রসন্ন কুমারকে মূহুর্তের জন্যও কাছ ছাড়া করেনা রাজু ভান্ডারি, ধারালো ভোজালি গোজা থাকে রাজু ভান্ডারির কোমরে। সাহসী লাঠিয়াল রজব মেরধা পার্শ্ববর্তী জায়গাগুলোতে টহল দেয়, পর্যবেক্ষনে রাখে। সেই সময়ে রাজু ভান্ডারি রোজ প্রসন্ন কুমারের খাদ্যে একটু একটু করে বিষ মিশিয়ে খাওয়ায়। যাতে করে ষড়যন্ত্রকারীদের বিষ প্রসন্ন কুমারের কোন ক্ষতি করতে না পারে। বালকের বয়স যখন ১০ বছর তখন রাজু ভান্ডারি বুঝতে পারে তার সময় শেষ হয়ে আসছে, যেভাবেই হোক তাকে ষড়যন্ত্রকারীরা দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিবে, এটা মনে হবার কারন ষড়যন্ত্রকারীরা ভাড়াটে ডাকাত দ্বারা নির্মমভাবে খুন করায় সাহসী লাঠিয়াল রজব মেরধাকে। উপায়ন্তর না দেখে রাজু ভান্ডারি প্রসন্নকুমারকে নিয়ে বিভিন্ন কৌশলে বরিশাল শহরে আসে। কালেক্টরেট ভবনে পৌছায়, সেখানে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ স্মীথ সাহেবের কাছে যেয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন এবং আরো বলেন, সাহেব আমি এই পর্যন্ত, আপনি একে রক্ষা করেন , আর যদি পারেন তাইলে ষড়যন্ত্রকারীদের নির্মূল করে অন্ততঃ একদিনের জন্য হলেও প্রসন্নকে কীর্তিপাশার জমিদারিত্বে বহাল করবেন.. মিঃ স্মীথ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলেন। তিনি আলমীরা, দেরাজ হাতড়ে কিছু নথিপত্র বের করলেন। যা ছিলো পূর্বতন ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ র‌্যালী সাহেবের। সেখানে সহমরনের নির্মম ঘটনাটির বর্ণনা আছে। সেখানে উল্লেখ্য যে, র‌্যালি সাহেবের কাছে যখন এই সংবাদ এসে পৌছায় যে, কীর্তিপাশার জমিদার পত্নীকে তার সদ্য প্রয়াত স্বামীর সাথে জ্যান্ত দাহ করবার আয়োজন সম্পন্ন হচ্ছে! কোন বিলম্ব না করে র‌্যালি সাহেব বন্দুকধারী একদল পুলিশ নিয়ে কীর্তিপাশা ঘটনাস্থলে পৌছায়, তার বর্ণনা মতে, তিনি পৌছায় কিন্তু ভীড়ে জায়গায় যেতে পারছিলেন না, চারদিকে ঢাক-ঢোলের বিকট আওয়াজ, ধূপের গন্ধ, উলুধ্বনী। র‌্যালী সাহেবের নির্দেশে ফাঁকা গুলি বর্ষন করে পুলিশ, মূহুর্তে গ্রামবাসীর বেশিরভাগ হিংস্র হয়ে ওঠে, তাদের চোখে মুখে ছিলো খুনের নেশা, আর র‌্যালি সাহেবের সাথে ছিলো মাত্র কয়েকজন বন্দুকধারী যা দেওয়ান, পুুরোহিত আর ষড়যন্ত্রকারী শক্তির কাছে তাৎক্ষনিক কিছুই না। অসহায় র‌্যালি সাহেবের চোখের সামনে সুভদ্রা দেবীকে ওরা স্বামী জমিদার রাজকুমার সেনের জ্বলন্ত চিতায় তুলে দিলো, র‌্যালি সাহেব বেশ বুঝতে পারছিলেন ষড়যন্ত্রকারীদের খাওয়ানো আফিমের ঘোরে সোজা হয়ে দাড়াতে পারছিলেন না সুভদ্রা দেবী। তাকে এক প্রকার টেনে হেচঁড়ে চিতায় তুলে দেয় ধর্মের নামে অধর্ম বর্বররা.. স্মীথ সাহেব রাজু ভান্ডারীর সামনেই বালক প্রসন্ন কুমারকে দত্তক গ্রহন করেন তাকে আশ্বস্ত করেন এই মর্মে যে- তার পক্ষে যতদুর করনীয় প্রস্নন কুমার সেনের জন্য সেটা তিনি অবশ্যই করবেন। সাহেবের কথায় আশ্বস্ত হয় রাজু ভান্ডারী। শেষ বিকালের ম্লান আলোয় শহর ছাড়ে রাজু ভান্ডারি। তারপর কত শুক্লপক্ষ পাড় হলো, চান্নিপসর রাইতে কত নবদম্পতি নতুন জীবনের শুরু করলো। প্রসন্ন কুমারের বয়স যখন দশ বছর তখন স্মীথ সাহেব তাকে বিবাহ দেন ষষ্ঠিপ্রিয়া দেবীর সাথে। দেবীর বয়স তখন পাচঁ বছর। প্রসন্নকুমার যখন পরিপূর্ন তরুন হয়ে ওঠে তখন অর্থাৎ অষ্টাদশ বছর বয়সে তার এক ছেলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়, এক শুভ তিথীতে প্রসন্নকুমার-ষষ্ঠিপ্রিয়া দম্পতি ছেলের নাম রাখে রোহিনী কুমার- )

এক.
নিজধামে পৌছাতে সন্ধ্যা গড়াবে , জোরে পা চালাবার জো নাই দয়ালের। সাথে গেন্দা। গেন্দার ভালো নাম গোকুল। ও লাফায়ে লাফায়ে চলে তাতে লাভ হয়না বড়, লাফ দেয় ও আসমানের দিকে, পথ পানে সামনে হইলে আগানে জোর হইতো। অঃ গোকুল বাপ আমার, কোলে আয় তাইলে জোরে দৌড়াবার পাড়ি, সাইঝের আলো নিভতে আছে যে নেভলে সব্বোনাশ!। বাবা , দৌড়ে বাপের সমান হয় গোকুল আমি বকুলতলার রাস্তা চিনি, ওই দিকে লও। দয়াল পা থামায়, ছেলেকে দেখে, তুই কিরম বাইলে চিনলি? জানিনা, পরে কমুনে।
প্রভা রানির অসোয়াস্তি বাড়তে লাগে। বেলা বাড়তে বাড়তেতো আর বাড়তে পারেনা, সাঝঁবেলা ঘনায়া আসছে অথচ কি সৃষ্টিছাড়া কান্ড দয়াল দাসের নাম নাই গন্ধও নাই, কর্তার আসবার সময় হয়েছে। প্রভারানি উঠানের কোনের তুলসি গাছটার গোড়ায় ঠায় দাড়িয়ে, এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে গোলাবাড়ির গা ঘেষা ফ্যাকাসে রেখাটির দিকে, দয়াল দাসের আসবার ওই একটাই পথ। কর্তা উল্টা পথের। সেটা পথ নয়। বড়বাগানের খোলা চত্বর। আবার ঠিক খোলাও নয়, গাছ- গাছালি বেশ। বাগানের ও মাথায় বিশু মিত্তিরের বাড়ি। কর্তা ওখানে, বাগান নিয়া ম্যালা ফ্যাসাদ। দফায় দফায় সালিশ মীমাংসা, আজও সেই দশা। প্রভারানী আগে চিকন দাগে মনে করতো, এখন মোটা দাগে মনে করে সালিশদারদের আঠারো মাসে বচ্ছর, নিত্য নিত্য বৈঠক বসাতে পারলে ভালোমন্দ খাওয়া যাবে, তামুক চলবে দেদারছে , বাগানতো আর দৌড়ে পালাচ্ছেনা.. প্রভারানী ওসব নিয়ে এখন ভাবছেনা, গোলাবাড়ির পথটা চোখের সামনে মিলাতে লাগছে, তখনই মনে হলো দয়াল আসছে , দয়াল হড়বড় করে হাটে, আস্তে হাটলেও। দয়ালই , কাছে এসে পেন্নাম করলো, আরো আগে পৌছবার পারতামগো মা জননী, গেন্দা হ্যাপা লাগাচ্ছিলো, ঠিক তাও না কোলে আসবেনা জোরেও হাটবেনা.. চুপ থাক দয়াল, প্রভারানীর চাপা কণ্ঠ। কর্তা এই আসলো বলে, পত্র দে। হাত বাড়ালো প্রভারানি , ্একটা সাবধানে ভাঁজ করা কাপড় আলগোছে দিলো দয়াল, প্রভারানি চকিতে তা আঁচলে লুকালো।
সন্ধ্যা রাতের পরে বড় মন্দিরে হাত ঘন্টি বাজে। ঠাকুরে তা ঘুরে ঘুরে বাজায়, যখন পশ্চিম মুখে আসে তখন সে শব্দ শোনা যায়। এখন শোনা যাচ্ছে। দ্বিতলের চাতর কক্ষ থেকে আলগোছে বের হলো ষষ্ঠিপ্রিয়াদেবী। সিড়ির মুখে দাড়ালো। লম্বা ঘোমটা টানা বিশ্বস্ত ঝি লাবন্য একদম সম্মুখে এসে ঘোমটা সরালো। রানীমাতা, ঐ দিককার অবস্থা নাকি সুবিধের না, রামুদাদায় কোনরকম কইতে পারলো, বেত্তান্ত জানা যায়নি, আপনি চাইলে.. ঠোঁটে আলগোছে আঙ্গুল রাখে ষষ্ঠিপ্রিয়া দেবী। ঠায় চুপ হয়ে যায় ঝি লাবন্য। কাপড়ের আড়াল থেকে ভাঁজ করা কাপড়টা রানীমাতার সামনে ধরে। চকিতে ওটা স্বীয় চাদরের আড়ালে অদৃশ্য করে ফের উল্টো মুখে হাটা ধরে। তবে এবার চাতর কক্ষে গেলো না পাশে নিজ কক্ষে গেলো, খোকা ঘুমাচ্ছে। রোহিনীর শিশু মুখটায় চাঁেদর আলো পড়ছে। ফুঁ দিয়ে মোমের বাতি নিভালো ষষ্ঠিপ্রিয়া , শুধু চাঁদের আলোয় রোহিনীর মায়াবি মুখে মাতৃস্নেহের চুমু খেলো ষষ্ঠিপ্রিয়া দেবী। চত্ত্বরের মশালের আলোয় ফের মোমের বাতি জ্বালিয়ে নিলো ষষ্ঠিপ্রিয়া দেবী। তারপর সে আলোয় আলগাছে কাপড়ের ভাঁজ খুলে পত্রটি বার করলো, চোখ আকৃতির বেশ বড় একটি পত্র, মসৃন দিকটায় কালোর মধ্যে সবুজাভ রেখা। পত্রটি কাচাঁ হলুদ গাছের। জোরে শ্বাস নিলে এখনও সুগন্ধ ছড়ায়, কেমন ঝাঁঝালো সুগন্ধ। বেলকনির কিনারায় যেয়ে ঘোমটা টেনে সাবধানে সামান্য উকি দিলে, এখান থেকে বড় মন্দির পষ্ট দেখা যায় , নিচে কি প্রকান্ড মেঝে, তার ও পাশের পুরাটাই বড় মন্দির। ধোঁয়ায় প্রায় আচ্ছন্ন , ধূপের ধোঁয়া, সে গন্ধের সাথে হোমযজ্ঞের ঘৃত, বেলপাতা আরো কি সব দগ্ধ হবার গন্ধ। ষষ্ঠিপ্রিয়া বেশ দেখতে পাচ্ছে খোকার বাবাকে, ধূতির লম্বা পাড় সাবধানে সামলে ঠাকুরের বাড়ানো হাত থেকে ধূপের মালশাটি নিয়ে ধুম্র ছিটাচ্ছে, মঙ্গল দেবতার ধূম্র।

মন্দিরে বিগ্রহ কি অপ্রতুল? বিষয়টা সন্ধ্যারাত থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছে জমিদার প্রসন্ন কুমারের মনে, কিন্তু কাউকে কিছু বলছে না, না ঠাকুর নারায়ন চক্কোতি না দেওয়ান রাধাকান্ত না প্রিয় ইয়ার রাণা হরজিৎকে। মালশায় ধূপ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ধোয়াঁর শেষ চক্করটা দিতে দিতে আড়চোখে নজর করলেন জমিদার হরজিৎ চোখ মুদে আছে। ঘুমাচ্ছে কিনা বোঝা যাচ্ছেনা, হরজিৎর এই একটা বিশেষ গুনাবলী দাড়িয়ে দাড়িয়ে ঘুমাতে পারে , ঠেলে জাগালে অবলীলায় বলবে, আহ দিলেতো ধ্যানটা ভেঙ্গে, আদিনাথ পর্যন্ত পৌছে গেছিলুম.. আদিনাথটা কে তা আর বলবেনা, কথা পাশ কাটাতে পারে হরজিৎ , এইটা বিশেষ গুনাবলীর মধ্যে পড়ে, মিথ্যা না বলে কথা পাশ কাটাবে, প্রয়োজনে দ্বারকা যেতে কিস্কিন্ধ্য ঘুরে যাবে। বিশেষ ভদ্র আর উচ্চ মানসিকতার সৎ চরিত্রের হরজিৎ’র পূর্ব পুরুষ ছিলো মেবারের রাণা প্রতাপ সিং। কি মনে করে মালশাটা যথাস্থানে রেখে একবার উপরে তাকালেন জমিদার প্রসন্ন কুমার, তখন মনে হলো ঘোমটা টানা একটা মুখ চকিতে সরে গেলো নাকি? মুখটা তার স্ত্রী ষষ্ঠিপ্রিয়ার? মন্দির থেকে সর্বদা শান্ত স্নিগ্ধ চিত্তে বের হন জমিদার প্রসন্নকুমার। সিড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে দ্বিতলে উঠে যান স্বীয় কক্ষে। ঝুঁকে খোকার দিকে চেয়ে আছে স্ত্রী ষষ্ঠিপ্রিয়া। ঘুমাচ্ছে খোকা রোহিনী। প্রসন্নকুমারের ভিতরটা যেন কিরম করে ওঠে। খোকাকে একবার ছুয়ে দেখতে ইচ্ছা করে কিন্তু সামলে নিলো নিজেকে। মুদুস্বরে ষষ্ঠিপ্রিয়াকে বললো, …… (চলবে)- এসএম তুষার

5Shares

Count currently

  • 102129Visitors currently online:

Counter Total

Facebook Pagelike Widget

Desing & Developed BY EngineerBD.Net