বৃহস্পতিবার, ২২শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, রাত ২:৫৭

একটি সড়ক, বৃক্ষরাজি এবং একজন হিরনের জন্য অপেক্ষা

একটি সড়ক, বৃক্ষরাজি এবং একজন হিরনের জন্য অপেক্ষা

 

একটি সড়ক, বৃক্ষরাজি এবং একজন হিরনের জন্য অপেক্ষা

 
সুমন খান ঃ

ধলপহরে হলুদ স্টিমার যখন সিটি দিয়ে কীর্তনখোলায় মোড় নেয়, তারও আগে সামনের ডেকে দাঁড়িয়ে দূর থেকে আদম আলী হাজির পরিত্যক্ত ভবন, কসাই জামে মসজিদ, এবাদুল্লাহ মসজিদের মিনার দেখে আপ্লুত হই। ওই তো বরিশাল; আমাদের প্রিয় বরিশাল। গিরদে বন্দর নামে পত্তন হওয়া এই আধা-গ্রাম আধা-শহরের বিশেষ সুনাম ছিল সবুজের জন্য। যার ছিটেফোঁটা এখনও টিকে আছে।

পুরনো বরিশালকে উপলব্ধি করতে এখনও যে সড়কটি দেখে আমরা স্মৃৃতিবিলাসে আক্রান্ত হই, তার নাম রাজা বাহাদুর সড়ক। বাংলাবাজারমুখী সৈয়দ নজরুল সড়ক আর ক্লাব রোডের মাঝ থেকেই এ সড়কের শুরু। লেডিস ক্লাবের সামনে দিয়ে সড়কটি দু’ভাগ হয়ে একটি পেঁৗছেছে ডিসির বাংলোর সামনে দিয়ে চাঁদমারীতে বান্দ রোডে, অন্যটি চান বাংলোর পাশ ঘেঁষে প্লানেট ওয়ার্ল্ড নামে শিশু পার্কের সামনে। এই সড়কটি প্রভাবশালীদের অত্যাচারে ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে পড়েছিল।
একদা এই সড়কের পাশ ঘেঁষে খাল ছিল। নব্বইয়ের শুরুতে যার কিছুটা আমারও নজর এড়াতে পারেনি। পৌরসভার ঠিকাদারি কাজ করতে গিয়ে আক্তারুজ্জামান হীরু খাল বন্ধ করে ড্রেন নির্মাণের কাজ করতে গিয়েও কেটেছেন একাধিক ছোট-বড় গাছ। এই সড়কের বড় বৈশিষ্ট্য মেঘ শিরীষ, সোনাইল, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, বট-অশ্বত্থ_ এমন নানা জাতের গাছের সমাহার। এর কোনোটিই বাংলাদেশের চেয়ে তরুণ নয়। ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসা এই সড়কটি নিয়ে আমাদের, সবুজপ্রিয় বন্ধুদের উদ্বেগের সীমা ছিল না। এমনকি বরিশালের বরেণ্য আইনজীবী, ক্ষ্যাপাটে অথচ সহজ-সরল মানুষ_ তপন চক্রবর্তীর ভগি্নপতি দ্বিজেন শর্মাকে রীতিমতো অভিযোগ করে সে সময়ের ভোরের কাগজে একটি লেখাও লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিলাম।
রাজনৈতিক নেতাদের হুমকি-ধমকিতে বরিশাল ত্যাগে বাধ্য হওয়া আমি মইন_ফখরুদ্দীন জমানার বেশ পরে বরিশাল গিয়ে, রাজা বাহাদুর সড়কের অবস্থা দেখে চক্ষু চড়কগাছ। এও কি সম্ভব! বৃক্ষ রক্ষা এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য প্রশস্ত করা হয়েছে রাজা বাহাদুর সড়কটি সেই লেডিস পার্ক পর্যন্ত। একটিও গাছ কাটা হয়নি, বরং গাছ রক্ষার জন্য বরিশাল ক্লাব, বিআইডবি্লউটিএর মতো প্রতিষ্ঠানকে জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছে। বয়োবৃদ্ধ মেঘ শিরীষের শরীরে পরজীবী অর্কিড বাড়ছে নিশ্চিন্তে। পাখিরাও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে একটুও উদ্বিগ্ন নয়।
অনেকে হয়তো হাসতে পারেন। তবে আমাদের ভালো লাগে, মনে-প্রাণে ছোঁয়া লাগে, যখন এখনও এই সড়কের এমন পরিবেশের কারণে গভীর রাতে শোনা যায় শিয়ালের ডাক। যে ডাক আমাদের মনে করিয়ে দেয়_ এই তো আমাদের বরিশাল। এই তো আমাদের মিলু হেঁটে যায় বান্দ রোডের লাল সুরকির পথ ধরে। কুসুম কুমারী দেবী চেয়েছিলেন তার আত্মভোলা ছেলেটা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়। অনেক দিন আগের এসব কথা ভিড় করে মনে। যেন এই শহরের এমন সড়ক ধরেই ট্রামের নিচে প্রাণ হারানো জীবনানন্দ দাশ ফিরে আসেন।
সড়কের মুখে বেশ বড় করেই লেখা উদ্বোধক আর পৃষ্ঠপোষকের নাম। সড়কের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা এক নব্য রাজনীতিকের সমালোচনা করি। এমনভাবে নাম লাগানোর কী দরকার ছিল? আবার আমাদের কেউ কেউ বলে ওঠে, এমন বৃক্ষরাজি রক্ষায় কত কিছুই না করেছি! মিছিল-মিটিং তো কম হয়নি। আর একজন মানুষ গাছকে ভালোবেসে, বরিশালকে ভালোবেসে এমন কাজটি করলেন_ তার কোনো মূল্যায়ন নেই? আমাদেরও তো চাহিদার শেষ নেই। এমনই যদি পারেন, তবে কেন পুরো শহরটা বৃক্ষে ঢেকে দিলেন না তিনি?
রাত গভীর হলে যারা জিলা স্কুুলের লাগোয়া ফুটপাত ধরে শহরের দিকে এগোতে চান, তাদের নাকে এসে লাগে হাসনাহেনার গন্ধ। অল্প জায়গাতেই হাসনাহেনা থেকে বাগান বিলাস_ এমন সব গাছের মাখামাখি যে কোনো পথিককেই থমকে দেয়। আর যারা বয়সী বটের মতো সাক্ষী এই শহরের; হাসনাহেনার গন্ধ তাদের স্মরণ করিয়ে দেয়_ একদা এই শহরের একতলা আর টিনশেড বাড়িগুলোর সামনে হাসনাহেনা আর কামিনী গন্ধ ছড়াত চাপ চাপ অন্ধকারে।
বিবির পুকুরের চারপাশটার উন্নয়ন নিয়ে নানা বিতর্ক হতেই পারে। মেয়রদের আগে-পরের কেউ কেউ বলতে পারেন নানা কথা। তবে আমরা ভুলিনি_ এক মেয়র বিবির পুকুরের একপাশটা জুড়ে দোকান তুলেছিলেন। হিরন চারদিকে বসার ব্যবস্থা করলেন। নিউ মার্কেটের যে জমিতে বহু দিনের ভাঙা ভবন জমা পড়ে ছিল, সেখানে তরুণ প্রজন্মের জন্য মিলনমেলার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন শওকত হোসেন হিরন। বরিশালে এ মূহূর্তে তারুণ্যের সবচেয়ে দারুণ জায়গা এই স্কয়ার।
বরিশাল আরও বেশি কেন আমাদের পুরনো দিনের বরিশাল হলো না_ তাই নিয়ে আশার সুতীব্র চিৎকারে হিরনের মুণ্ডুপাত করি। বরিশালে পৌর পিতার তো অভাব ছিল না। এমন উদ্যোগ তো কেউ নেননি। হিরন কেন এমন হলেন? বরিশাল পৌরসভা আর সিটি করপোরেশন মিলে ইতিহাসটা শতাব্দী পার করেছে বহু আগে। আমরা যারা চলি্লশোর্ধ্ব তারাও তো কম দেখিনি! দেখেছি কীভাবে বিবির পুকুর পাড়ের কৃষ্ণচূড়া, পাম গাছগুলো উন্নয়নের নামে খুন হয়েছে। মেডিকেল কলেজের চারপাশে থাকা দারুণ সব শিমুল, মেঘ শিরীষ, হাসপাতাল রোডের পাকুড়, ছাতিম বান্দ রোডের ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বোতল পাম কীভাবে শেষ হয়েছে।
তাহলে মেয়র শওকত হোসেন হিরন, কোথা থেকে এলে বাবা এত পরিবেশপ্রেমী? কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের বরিশালবাসীর ধাতে নেই। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা মানুষদের কাছে বর্তমানটাই আসল। আমি জানি, আমার এ কথায় অনেকেই মনোক্ষুণ্ন হবেন। এমনকি তীব্র প্রতিবাদও করতে পারেন। তবে তারা কি নিজের মনের কাছে প্রশ্ন করবেন_ মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে আমরা যত আহ্লাদিত হই, বেঁচে থাকতে তার কতটা করি?
হিরন ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের অনেকেরই সম্পর্ক ছিল ব্যক্তিগত। তবে তা ছিল মেয়র হওয়ার আগে। বরিশালে আমার প্যারারা রোডের বাসায় গভীর রাতে পলাতক হিরন ভাই আসতেন। আমি, মিরাজ ভাই, স্বপন, পুলক এবং কখনও কখনও লিটন সেই আড্ডায় শামিল হতেন। কখনও-বা প্লানেট ওয়ার্ল্ড নামে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। তুমুল আড্ডায় আমাদের সময় কাটত। তখন এই মানুষটাকে আমরা চিনতাম বন্ধুবৎসল হিসেবে। গান, কবিতা, ঝগড়া ছিল আমাদের আড্ডার নিয়ামক। মেয়র হওয়ার পরে এমন আড্ডা আমাদের আর হয়নি। তিনি বলতেন, শোনো, তোমরা সবসময় আমার মনে আছ। যারা নাই তাদের জন্য একটু সময় দিই।
ক্ষমতার কারণে তার চারপাশে যে মৌ-লোভীরা ছিলেন না_ এমন না। মেয়র নির্বাচনের সময় তার নিজ এলাকা আলেকান্দায় বিরোধী মানুষ ছিলেন গুলজার ভাই। আমি আর পুলক চ্যাটার্জি এই দুই মানুষকে মিলিয়ে দিয়েছিলাম। তবে সেই মিল শেষতক ছিল না। যতদূর বুঝি, মৌ-লোভীরা এ জন্য দায়ী।
হিরন ভাইয়ের সঙ্গে শেষ কথা হয় ফেব্রুয়ারিতে। এর পর দীর্ঘ এক মাস দেশে ছিলাম না। বরিশাল বিভাগীয় সাংবাদিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি বিষয়ে তার সঙ্গে ফোনে আমার ঝগড়া হয়। এমন ঝগড়া বহুদিনই আমি করেছি। কখনও কখনও লোকের কথার প্রাধান্য দিয়ে আমি তাকে গালিগালাজ করতাম। এমন অধিকার বহু আগেই আমি অর্জন করেছিলাম। কখনও কখনও গালিগালাজে কাজ না হলে রিয়াজ ভাই তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন।
হিরন ভাইয়ের বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার নেশা ছিল। আমাদের এক বন্ধু আজাদ ভাই বহুবার তার সঙ্গে ঘুরেছেন। ভালো কিছু দেখলেই আজাদকে তিনি ছবি তুলতে বলতেন, সেসব তিনি বরিশালে করবেন বলে। বরিশালকে তিনি মনের মতো করে সাজাতে চেয়েছিলেন। তবে তার আশা পূর্ণ হওয়ার আগেই বরিশালবাসী তাকে সরিয়ে দেয়। বরিশালকে এমন করে আর কেউ সাজিয়েছেন অন্তত গত পঞ্চাশ বছরে_ এমনটা আমার মনে পড়ে না। রাজা বাহাদুর সড়কের বৃক্ষরা আজ নত, অর্কিডেরা শঙ্কিত, নিরাপত্তাহীন পাখিদের পাখসাটে অস্থির মগডাল, প্রিয় শিয়ালেরা ডাকতে ভুলে গেছে, প্রিয় শহর বাঁচাতে, নিবেদিতপ্রাণ এক মানুষের জন্য।
শওকত মিলটন, সাংবাদিক

0Shares
Categories

Desing & Developed BY EngineerBD.Net