শনিবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬

বরিশাল বিভাগের ৪৯৫২টি স্কুলে নেই শহীদ মিনার ভাষার জন্য প্রাণ, অথচ প্রজন্মের জন্য নেই প্রতীক

ফাহিম ফিরোজ
ফাল্গুনের আগুনরঙা পলাশ-শিমুল যখন আকাশ ছুঁতে চায়, তখনই মনে পড়ে যায় ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া বীর সন্তানদের কথা। “একুশ মানে মাথা নত না করা”-এই শপথে দাঁড়িয়ে থাকা জাতির নাম বাংলাদেশ। কিন্তু সেই একুশের শহর-গ্রামজুড়ে, বিশেষত বরিশালের অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই কোনো স্থায়ী শহিদ মিনার। ইতিহাসের গৌরব আছে, স্থাপনার অভাবও আছে—এই বৈপরীত্যই আজ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাকেরগঞ্জ উপজেলার গুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মীম বলে, “বইয়ে পড়ি ভাষা শহিদদের কথা। পলাশ ফুল লাল হলে মনে হয় রক্তের মতো। কিন্তু আমাদের স্কুলে শহিদ মিনার নেই, ফুল দিতে পারি না।”
শিশুর এই সরল উচ্চারণেই ধরা পড়ে গভীর বঞ্চনা। প্রধান শিক্ষক ফারজানা ববি জানান, প্রতি বছর অস্থায়ী কাঠামো বানিয়ে কর্মসূচি পালন করতে হয়। “স্থায়ী শহিদ মিনার না থাকায় শিশুদের মনে যে প্রতীকী শিক্ষা গড়ে ওঠার কথা, তা অপূর্ণ থেকে যায়।”
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়-এর বাংলার সহকারী অধ্যাপক উন্মেষ রয় বলেন, “শহিদ মিনার শুধু ইট-সিমেন্টের কাঠামো নয়; এটি আত্মপরিচয়ের স্থায়ী স্মারক। প্রাথমিক স্তরেই যদি শিশুরা ইতিহাসের সঙ্গে প্রতীকী সংযোগ না পায়, তবে একুশের চেতনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”
বরিশাল জেলায় ১,৫৮৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১,৪৩৩টিতেই নেই শহিদ মিনার। পুরো বিভাগে ৬,২৩৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১,২৮৭টিতে রয়েছে এই স্মৃতিস্তম্ভ।
জেলাভিত্তিক চিত্র- পটুয়াখালী জেলা: ১,২৩৫টির মধ্যে ১,০৩৪টিতে নেই, পিরোজপুর জেলা: ৯৮৯টির মধ্যে ৫২০টিতে নেই, বরগুনা জেলা: ৭৯৮টির মধ্যে ৪৮৫টিতে নেই, ভোলা জেলা: ১,০৪৬টির মধ্যে ১,০১৪টিতে নেই, ঝালকাঠি জেলা: ৫৮৫টির মধ্যে ৪৬৬টিতে নেই।
এ পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়-এগুলো প্রজন্মের কাছে ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার অবকাঠামোগত ঘাটতির দলিল।
অভিযোগ রয়েছে, জেলার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারেও রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা থাকে না। দেয়ালঘেরা সাদা স্তম্ভগুলো অন্ধকারে হারিয়ে যায়। সংস্কৃতিকর্মীদের ভাষায়, “যেখানে একুশের প্রথম প্রহরে হাজারো মানুষ ফুল হাতে আসে, সেই স্থান যদি সারা বছর আলোর অভাবে অবহেলিত থাকে, তবে তা আমাদের চেতনার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।”
বরিশাল প্রাথমিক শিক্ষার উপ-পরিচালক নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, পর্যায়ক্রমে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহিদ মিনার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। নতুন করে যে সকল স্কুলের ভবন নির্মাণ করা হবে তাতে শহীদ মিনার স্থাপনের বিষয়টি যুক্ত হবে। তাছাড়া পুরোনো স্কুলগুলোতে শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য বাজেট চাওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা প্রস্তাব করছেন- শিক্ষা বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ, স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অংশগ্রহণ, কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে স্থায়ী আলোকায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল।
ভাষা আন্দোলনের শহিদরা কেবল অতীতের ইতিহাস নন; তারা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি। তাই বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে শহিদ মিনার মানে প্রতিদিনের শিক্ষা, প্রতিদিনের শপথ। আর নগরের শহিদ মিনারে আলো মানে চেতনার স্থায়ী জাগরণ।
ফাল্গুনের লাল ফুল যতবার ফুটবে, ততবার যেন বরিশালের প্রতিটি শিশু তার বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে গর্বভরে বলতে পারে- “আমার শহিদ মিনার আছে, আমার ইতিহাস আছে।”

আরো পড়ুন

কুয়াকাটায় দোকানে হামলা,ভাংচুর,আটক ১

বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়া: পর্যটন সৈকত কুয়াকাটার এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, হুমকির অভিযোগে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *