রিয়াজ ফরাজী, ভোলা প্রতিনিধিঃ
নদীভাঙন, অনিশ্চয়তা আর বিনা বেতনে শিক্ষকতা—ভোলার বোরহানউদ্দিনে এক প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার লড়াই। ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বড়মানিকা ইউনিয়নের বর্তমান ৬ নম্বর ওয়ার্ডে দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণ বাটামারা জৌনপুরী দাখিল মাদ্রাসা। নাম আছে, শিক্ষার্থী আছে, ইতিহাস আছে; নেই শুধু এমপিওভুক্তির স্বীকৃতি। দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এমপিওবিহীন এই প্রতিষ্ঠান টিকে আছে কেবল শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষের ত্যাগ আর অদম্য চেষ্টায়। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ২০০১ সালে মাদ্রাসা বোর্ড থেকে পাঠদানের অনুমতি এবং ২০০৪ সালে একাডেমিক স্বীকৃতি লাভ করে প্রতিষ্ঠানটি। তখন বড়মানিকা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত মাদ্রাসাটি দাখিল পরীক্ষায় শতভাগ পাসের গৌরব অর্জন করে উপজেলায় আলোচনায় আসে। ফলাফলের ধারাবাহিকতায় এটি নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান হয়েও কেন্দ্রসেরা হওয়ার নজির গড়ে। বছরের পর বছর সরকারের পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে প্রতিষ্ঠানের সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখেছে। কিন্তু সাফল্যের সেই দিনগুলো বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এমপিওভুক্তির অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়া তদারক করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়—কিন্তু তালিকায় নাম না ওঠায় প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর সরকারি বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত। সেই সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন জোট সরকার বছরের পর বছর নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত না করায় শিক্ষকদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে পড়তে হয়। চাকরির স্থায়িত্ব, আর্থিক নিরাপত্তা ও পরিবারের ভরণপোষণ—সবকিছু নিয়েই উদ্বেগ তৈরি হয় তাঁদের জীবনে। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে একাধিক শিক্ষক বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসার চালাতে কেউ টিউশনি করেছেন, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা করেছেন, কেউ আবার ধার-দেনা করে জীবন চালিয়েছেন। তবুও সকাল হলে তাঁরা শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়েছেন নিয়মিত। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ববোধ তাঁদের ব্যক্তিগত কষ্টকে ছাপিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে কয়েকজন শিক্ষক অবসর নিয়েছেন, কেউ কেউ না-পাওয়ার বেদনা নিয়েই পৃথিবী ছেড়েছেন। জীবনের সিংহভাগ সময় একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য উজাড় করে দিয়েও আর্থিক নিরাপত্তা পাননি তাঁরা। অবসরজীবনে নেই কোনো সরকারি পেনশন, নেই স্থায়ী সঞ্চয়। আছে কেবল দায়িত্ব পালন করার তৃপ্তি আর বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস। এরই মধ্যে ২০১০ সালে রাক্ষুসে মেঘনার ভাঙনে মাদ্রাসার স্থায়ী অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ভিটেমাটি হারিয়ে চারবার স্থানান্তরিত হতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ফলে পাঠদান ব্যাহত হয়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে, অবকাঠামো বারবার গড়ে আবার ভেঙেছে। বর্তমানে ৬ নম্বর ওয়ার্ডে সীমিত সামর্থ্যে নতুন করে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে। নদীভাঙন শুধু ভবন কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে স্থিতিশীলতার স্বপ্নও। তারপরও শিক্ষা কার্যক্রম থেমে থাকেনি। শিক্ষকরা অনিশ্চয়তার মধ্যেও শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়েছেন, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করেছেন, শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। আজও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান দাবি একটাই—দ্রুত এমপিওভুক্তি। এতে শিক্ষকরা ন্যায্য বেতন-ভাতা ও আর্থিক নিরাপত্তা পাবেন, প্রতিষ্ঠানটি পাবে স্থায়ী ভিত্তি। প্রান্তিক জনপদের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুই যুগের অপেক্ষা, নদীভাঙনের ক্ষত আর বিনা বেতনের দীর্ঘ সংগ্রাম নিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে স্বীকৃতির আশায়। দক্ষিণ বাটামারা জৌনপুরী দাখিল মাদ্রাসার গল্প কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি অবহেলিত জনপদের শিক্ষকদের আত্মত্যাগ, বঞ্চনা আর অনিশ্চয়তার এক দীর্ঘ ইতিহাস। এখন প্রশ্ন একটাই—এই প্রতীক্ষার অবসান কবে?
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।