মো. ফরিদ আহমেদ, নেছারাবাদ:
সংবাদপত্রের পাতায় যখন সত্য তুলে ধরার পথটি মসৃণ ছিল না, কিংবা লোভ-লালসার ফাঁদে নিজেকে সঁপে দেওয়ার অগণিত সুযোগ ছিল, ঠিক সেই সময়ে নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে অবিচল ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রখ্যাত সাংবাদিক সুনীল ব্যানার্জি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তাঁর অবদান ও বস্তুনিষ্ঠতার চর্চা এ দেশের গণমাধ্যম ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
অনন্য প্রতিভাময়ী সুনীল ব্যানার্জি ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ২০ এপ্রিল সাতক্ষীরা শহরের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকতা পেশার সাথে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের সাংবাদিকতা পেশায় তিনি দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক বাংলা এবং দৈনিক জনকণ্ঠে কাজ করেছেন। দেশের অবহেলিত জনপদ ও বিভিন্ন অনুসন্ধানী রিপোর্টের আলোকে সুনীল ব্যানার্জি নামটি পাঠক মহলে হয়ে ওঠে প্রশংসিত ও আলোচিত। বিসিএস পাস করে ক্যাডার সার্ভিসে যোগ না দিয়ে সাংবাদিকতাকে তিনি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাছাড়াও তাঁর ছিলো এলএলবি ডিগ্রি। সুতরাং ক্রাইম রিপোর্টিং-এর ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা এবং পারিপার্শ্বিকতা ছিলো অতুলনীয়। নিজের প্রাণ বাজি রেখে তাঁর কলম চলেছে তীরের মতো। পেশাগত দায়িত্ব পালনের বাইরেও যার পরিচিতি ছিলো ব্যাপক ও বিস্তৃত।
তিনি ছিলেন একাধারে জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন (ক্র্যাব)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য। অবিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নের সাথেও তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দের একুশে গ্রন্থ মেলায় সুনীল ব্যানার্জি’র লিখিত বই ‘সাংবাদিকতায় বিড়ম্বনা’ পাঠক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। বইটির মুখবন্ধ লিখেছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কবি শামসুর রাহমান। সেখানে তিনি সুনীল ব্যানার্জিকে একজন “আপাদমস্তক সাংবাদিক” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
পেশাগত দায়িত্ব পালনের বাইরেও সুনীল বাবুর পরিচিতি ছিলো ব্যাপক ও বিস্তৃত। অত্যন্ত সুদর্শন এবং সদালাপি ব্যক্তিত্ব বোধ সকলকেই খুব আকৃষ্ট করতো। সত্যের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল তাঁর পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের কর্মকাণ্ড। সাংবাদিকতা পেশায় সততার সর্বতোমুখী স্বাক্ষর সুনীল ব্যানার্জি স্বয়ং। প্রবীণ সাংবাদিক ওবায়েদ উল হকের ভাষায়, “তাঁর মৃত্যু নেই। তাঁকে বরণ করে মৃত্যুও ধন্য।”
সুনীল ব্যানার্জি-কে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন মরণোত্তর বিশেষ সম্মাননা স্মারক প্রদান করেছে। এর আগে মুক্তিযুদ্ধে অমূল্য অবদানের জন্য তাঁকে ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মরণোত্তর স্বীকৃতি স্মারক প্রদান করা হয়। এছাড়াও সাতক্ষীরায় ‘মুক্ত চিন্তার মঞ্চ’ আয়োজিত গুণীজন সংবর্ধনায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট সাংবাদিক সুনীল ব্যানার্জিকে (মরণোত্তর) সম্মানসূচক ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
২০০৬ খ্রিস্টাব্দের ২৮ আগষ্ট ভোররাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরস্থ নিজ বাস ভবনে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। প্রয়াত সুনীল ব্যানার্জির স্ত্রী শিখা ব্যানার্জি অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা এবং সুনীল ব্যানার্জির একমাত্র সন্তান সাংবাদিক শুভাশিস ব্যানার্জি (শুভ) এসবিডি নিউজ টুয়েন্টিফোর.কম এর প্রধান সম্পাদক।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।