রবিবার, মার্চ ১৫, ২০২৬

নদীতীরের জীর্ণ ঘরে আলেয়া বেগমের একাকী সংগ্রাম

নেছারাবাদ প্রতিনিধি //
আলেয়া বেগম। বয়স ৯০ ছুঁইছুঁই। মলিন মুখে নেই জীবনের কোনো হাসি। সংসারের সদস্য বলতে এই বৃদ্ধা একাই। স্বামীকে হারিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের তিন বছর পর। ছেলেমেয়ে বলতে এক ছেলে ও এক মেয়ে থাকলেও শেষ বয়সে তাঁদের সান্নিধ্য কিংবা সহযোগিতা কিছুই জোটে না। যেন অবহেলা আর নিঃসঙ্গতাই তাঁর ভাগ্যলিপি।

জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসেও দুমুঠো আহারের জন্য তাঁকে কাজ করতে হচ্ছে। বয়সের ভার, ঝাপসা দৃষ্টি আর নানা শারীরিক অসুস্থতায় হাঁটাচলাতেই কষ্ট হয়। তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই। প্রতিদিন সংগ্রাম করেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাঁকে।

প্রায় ৯০ বছর বয়সী এই অসহায় বৃদ্ধা বসবাস করেন নেছারাবাদ উপজেলার কামারকাঠি ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে। কামারকাঠি গ্রামের সন্ধ্যা নদীর পাড়ঘেঁষা একটি ছোট, জীর্ণ ঘরই তাঁর একমাত্র আশ্রয়। নদীর তীরবর্তী হওয়ায় বৃষ্টি ও বন্যার দিনে দুর্ভোগ যেন আরও বেড়ে যায়। জীবনের শেষ বয়সে তাঁর ভরসা বলতে একমাত্র ছেলে। কিন্তু সেই ছেলেও একটি দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ঢাকায় শয্যাশায়ী, নিজ ছেলেদের ভরসায় দিন কাটাচ্ছেন।

অন্যদিকে মেয়েকে কোনোরকমে বিয়ে দিলেও স্বামী হারিয়ে তিনিও টানাপোড়েনের মধ্যে আছে। ফলে নিরুপায় হয়ে আলেয়া বেগম ঝাপসা চোখে ধারালো দা হাতে নিয়ে সুপারির খোসা ছাড়িয়ে জীবন চালাচ্ছেন।

গত বুধবার সরেজমিনে দেখা যায় তাঁর জীবনসংগ্রামের করুণ চিত্র। নদীর তীরবর্তী জীর্ণ ঘরের সামনে কুঁজো হয়ে বসে দা দিয়ে সুপারির খোসা ছাড়াচ্ছেন তিনি। পাশে বস্তাভর্তি কাঁচা সুপারি। একটি একটি করে খোসা ছাড়িয়ে অন্য পাত্রে রাখছেন। সঙ্গে যেন ফেলছেন দীর্ঘশ্বাস।

আলেয়া বেগম বলেন, ‘১০০ সুপারিতে হয় এক কুড়ি। ১০ কুড়ি সুপারি ছিলাতে পারলে ৫০০ টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু বয়স আর শরীরের কষ্টে ১ হাজার সুপারি ছিলাতে আমার ৭ দিন লাগে। ৭ দিনে ৫০০ টাকা দিয়েই তাঁর একার আহার চলে।’

সুপারির মৌসুম না থাকলে কী করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তখন মাঝেমধ্যে আধপেটা খেয়েও থাকতে হয়। মেয়েও কখনো কখনো তিন-চার শ টাকা পাঠায়। এভাবেই আল্লাহ চালিয়ে নিচ্ছেন।’

দেখা গেছে, শীতের এই মৌসুমেও আলেয়ার ঘরে নেই বিদ্যুতের আলো। শরীরে নেই কোনো গরম পোশাক। বুধবার তাঁর ঘরে রান্না করার মতো ছিল সামান্য কিছু চাল আর তিনটি আলু। সেগুলো দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এতেই আমার চলে যাবে। একটু কষ্ট করে থাকতে হয়, কী করব।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. নুরুল আমীন লিটন বলেন, ‘আলেয়ার বয়স নব্বইয়ের কাছাকাছি। স্বামী হারিয়েছেন যুদ্ধের পরপরই। তাঁর এক ছেলে ও মেয়ে। ছেলে অসুস্থ। মেয়েটাও ডিভোর্সি। তাই এই বয়সেও খুবই কষ্ট করে তাঁর কাজ করে পেট চালাতে হচ্ছে। তাঁর খাবারে যেমন সমস্যা, তেমনি কষ্ট হয় শীত ও বর্ষায়। যেহেতু তাঁর ঘরটি নদীর পাড়ে। তাঁর থাকার ঘরটিও নড়বড়ে।’

অশীতিপর আলেয়া বেগমের জীবন যেন সমাজের অবহেলা আর নিঃসঙ্গতার এক নীরব দলিল, যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার বাস্তব চিত্র।

 

আরো পড়ুন

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে  জনপ্রিয়তার শীর্ষে চেয়ারম্যান প্রার্থী  বিএনপি নেতা মিঠু

পিরোজপুর প্রতিনিধি নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই পিরোজপুর জেলার সাতটি উপজেলায় বইছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *