মইনুল আবেদীন খান, বরগুনা জেলা প্রতিনিধি:
তীব্র ডিজেল সংকটে বরগুনা জেলার পরিবহন ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল তরমুজে। মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উৎপাদিত তরমুজ বাজারজাত করতে না পারায় চরম লোকসানে পড়েছেন হাজারো চাষি। অনেক ক্ষেত্রেই পাকা তরমুজ ক্ষেতেই পড়ে নষ্ট হচ্ছে, যা কৃষকদের হতাশা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
জেলার আঠারোগাছিয়া, হলদিয়া, চাওড়া, আড়পাঙ্গাশিয়া, কড়াইবাড়িয়া, সোনাকাটা, এম বালিয়াতলী, ঢলুয়া, বুড়িরচর, আয়লা পাতাকাটা, নলটোনা, কালমেঘা, কাদিরাবাদ, হোসনাবাদ, বদরখালী ও শারিকখালীসহ আরো বেশ কয়েকটি লেবু ইউনিয়নে এবার ব্যাপক পরিমাণে তরমুজ উৎপাদন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যায় ফলন ভালো হলেও বাজারজাতকরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অসাধু ব্যবসায়িক কর্তৃক সৃষ্ট জ্বালানি সংকট।
চাষিদের অভিযোগ, ডিজেলের অভাবে ট্রাক, পিকআপ ও নৌযান স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছে না। ফলে দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সময়মতো তরমুজ পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন তরমুজ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দামও তলানিতে নেমে গেছে।
তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নের তরমুজ চাষি মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘প্রতি একর জমিতে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এখন পরিবহন সংকটের কারণে তরমুজ বাজারে নিতে পারছি না। অনেক তরমুজ খেতেই পচে যাচ্ছে। এভাবে চললে আমরা দেউলিয়া হয়ে যাব।’
আমতলী উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের চাষি মো. আব্দুল লতিফ মাতুব্বর বলেন, ‘অনেক আশা নিয়ে তরমুজ চাষ করেছিলাম। কিন্তু পরিবহন সংকটের কারণে ক্ষেতেই তরমুজ নষ্ট হচ্ছে। বিনিয়োগের টাকা ওঠানোই এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
আরেক কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আগে সহজেই ট্রাক পাওয়া যেত। এখন ডিজেলের অভাবে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। পেয়েও ভাড়া দ্বিগুণের বেশি, যা আমাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।’
পাইকার ও আড়তদাররাও একই সংকটের কথা জানিয়েছেন। বরগুনা শহরের আড়তদার মো. শাহীন বলেন, ‘ডিজেল সংকটের কারণে বাইরে থেকে পাইকাররা আসতে পারছেন না। ফলে স্থানীয় বাজারে তরমুজের চাপ বেড়ে গেছে, দাম কমে গেছে। এতে চাষি ও ব্যবসায়ী উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত।’ আরেক আড়তদার মো. মনিরুল আলম বলেন, ‘ডিজেল সংকট কেটে গেলে বাজার আবার চাঙ্গা হতে পারে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি খুবই খারাপ।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যেসব চাষি রমজান মাসে তরমুজ বাজারজাত করতে পেরেছেন, তারা মোটামুটি লাভবান হয়েছেন। কিন্তু ঈদের পর যারা বাজারে তরমুজ তুলতে গেছেন, তারা পড়েছেন বড় ধরনের সংকটে। যানবাহন সংকট, জ্বালানি সংকট এবং পাইকারের অভাবে তরমুজের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।
বরগুনা জেলা মানবাধিকার সংস্থার সহ-সভাপতি ডা. গোলাম কবির বলেন, ‘কৃষকদের এই দুরবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা দেশের খাদ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের উৎপাদিত পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রির নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দ্রুত ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক ও পরিবহন ব্যবস্থা সচল করা জরুরি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রথীন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, ‘এ বছর বরগুনায় ব্যাপক পরিমাণে তরমুজ উৎপাদন হয়েছে এবং ফলনও ভালো। কিন্তু পরিবহন সংকটের কারণে কৃষকরা সমস্যায় পড়েছেন। আমরা ইতোমধ্যেই মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট চাষীরা স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করে পেট্রোল পাম্প থেকে প্রয়োজনীয় ডিজেল পাবেন। তরমুজ পরিবহন সিস্টেমটি দ্রুত সচল হলেই কৃষকরা তাদের ন্যায্য মূল্য পাবেন। তাছাড়া বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি এবং দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।’
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা অবিলম্বে ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক করা, পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং প্রয়োজনে সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বরগুনার তরমুজ খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বরগুনাসহ দেশের কৃষি অর্থনীতিতে।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।