ফাহিম ফিরোজ : দিন দিন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা। প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা, ঝরছে তাজা প্রাণ। অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গতি ও নিয়ন্ত্রণহীন চলাচলের কারণে নগরবাসীর জন্য এখন আতঙ্কের নাম ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান। গত এক মাসের ব্যবধানে বরিশাল নগরীতে দুই কোমলমতি শিশুর মৃত্যু হয়েছে অটোরিক্সার চাপায়। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে অবৈধ অটোরিক্সা চালকরা।
জানা গেছে, বরিশাল নগরীতে বৈধ যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার হলেও বাস্তবে প্রায় ৩৫ হাজারের বেশি অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা চলাচল করছে। ১০ লক্ষাধিক মানুষের এই শহরে এসব যানবাহনের অধিকাংশই চলছে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে। অনেক চালকের নেই বৈধ লাইসেন্স কিংবা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
নগরীর ফকিরবাড়ি রোডের বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন বলেন,“অটোরিক্সাগুলো এখন রাস্তায় মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। চালকদের অনেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অদক্ষ। তারা যেভাবে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়, তাতে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।”
ভাটিখানা এলাকার বাসিন্দা মাইনুল ইসলাম বলেন, “প্রশাসন মাঝে মধ্যে অভিযান চালালেও কয়েকদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। প্রতিদিন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।”
বিএম কলেজের শিক্ষার্থী মিম আক্তার জানান, “শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অটোরিক্সার দৌরাত্ম্য অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের সামনে এগুলোর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা সবসময় থাকে।”
একের পর এক প্রাণহানি:
গত বুধবার (৬ মে) সকালে নগরীর ভাটিখানা সাহাপাড়া সড়কে বেপরোয়া অটোরিক্সার চাপায় তীর্থা সাহা (৩) নামে এক শিশু নিহত হয়। সে ওই এলাকার শান্ত সাহার কন্যা। এ ঘটনার পর ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। তারা অবৈধ অটোরিক্সা চলাচল বন্ধ এবং দোষী চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এর আগে গত ৮ এপ্রিল বিদ্যালয় ছুটির পর সড়ক পারাপারের সময় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয় শেরে বাংলা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী চৈতি। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে তার মৃত্যু হয়। চৈতি তার মায়ের সঙ্গে নগরীর জিয়া সড়ক এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকত। তার বাবা ময়মনসিংহে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি বরিশাল বিএম কলেজের প্রথম গেট সংলগ্ন সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার ধাক্কায় নিহত হয় পটুয়াখালীর স্কুলছাত্রী জান্নাতুল মাওয়া (১০)। সে পরিবারের সঙ্গে বরিশালে বেড়াতে এসেছিল।
নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিক্সায় বাড়ছে জনদুর্ভোগ:
নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি—সবখানেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা। ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টো পথে চলাচল, অতিরিক্ত গতি এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এখন নিত্যদিনের চিত্র। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে দুর্ঘটনা, অন্যদিকে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, অবৈধ অটো রিক্স শুধু বরিশাল নয় গোটা দেশের একটি সমস্যা। নগরীর অবৈধ অটোরিকশা বন্ধে শীঘ্রই জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও সুধী সমাজের সঙ্গে বৈঠক করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, অবৈধ অটোরিক্সা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিবন্ধন ব্যবস্থা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত অভিযান ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নগরবাসীর দাবি, আর কোনো প্রাণহানির আগে অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।