সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

শিক্ষকদের দাপ্তরিক কাজ : মানসম্মত শিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় 

 

কবির হোসাইন
সহকারী শিক্ষক (আইসিটি)
দারুল কুরআন মহিলা আলিম মাদ্রাসা
উন্নত জাতি গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম শর্ত হলো মানসম্মত শিক্ষা। শিক্ষার মানই নির্ধারন করে একটি জাতির উন্নয়নের গতি ও দিকনির্দেশনা। আর শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন শিক্ষক। একটি শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের ভেতর একজন শিক্ষকই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন, সম্ভাবনা, মানবিকতা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের কাজ করেন। তাই শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শিক্ষকের ভ’মিকা এবং কর্মপরিবেশের বিষয়টি সামনে চলে আসে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে শিক্ষকদের প্রধান কাজ পাঠদান হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তাদের সময়ের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় বিভিন্ন দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজে। ফলে অনেকেই আজ প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকদের দাপ্তরিক কাজই কি মানসম্মত পাঠদানের প্রধান অন্তরায়?
প্রশ্নটি শুধু আবেগের নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বাস্তব সমস্যা।
শিক্ষক নাকি প্রশাসনিক কর্মচারী?
একজন শিক্ষককে সাধারণত পাঠ পরিকল্পনা, পাঠদান, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন, পরামর্শদান এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের কাজ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, শিক্ষকদের বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। বিদ্যালয়ের নানা তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন ডাটাবেজ হালনাগাদ, উপস্থিতি ও ফলাফলের প্রতিবেদন তৈরি, সরকারি জরিপে অংশগ্রহণ, প্রশিক্ষণ, সভা-সেমিনার, বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, এমনকি অনেক সময় নির্বাচন বা অন্যান্য সরকারি কার্যক্রমেও সম্পৃক্ত হতে হয়।
এসব কাজের কিছু অংশ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কারণ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক কার্যক্রম অপরিহার্য। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এসব কাজের পরিমাণ এত বেশি হয়ে যায় যে শিক্ষক তার মূল কার্য পাঠদান থেকে মনোযোগ হারাতে বাধ্য হন।
একজন দক্ষ শিক্ষক কখনোই শুধু বই খুলে ক্লাস নেন না। তাকে প্রতিটি ক্লাসের জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়, শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা বুঝতে হয়, নতুন শিক্ষণ কৌশল প্রয়োগ করতে হয় এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা করতে হয়। এসবের জন্য প্রয়োজন সময়, মনোযোগ এবং মানসিক প্রশান্তি। অথচ অতিরিক্ত দাপ্তরিক কাজ সেই মূল্যবান সময় কেড়ে নেয়। শিক্ষককে শিখন কর্ম থেকে পরিনত করে কর্মচারীতে।
শ্রেণিকক্ষে এর প্রভাব কী?
শিক্ষকের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে শ্রেণিকক্ষে।
ধরা যাক, একজন শিক্ষককে দিনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় রিপোর্ট তৈরি, তথ্য হালনাগাদ বা বিভিন্ন দাপ্তরিক নির্দেশনা বাস্তবায়নের কাজে ব্যয় করতে হচ্ছে। তখন তিনি পাঠ পরিকল্পনার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবেন না। ফলে ক্লাস হবে প্রস্ততিহীন, আকর্ষণহীন এবং কম কার্যকর।
একজন শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সমস্যা, শেখার দুর্বলতা কিংবা সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য আলাদা সময় না দিতে পারেন, তাহলে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। শিক্ষা তখন কেবল পরীক্ষায় পাস করার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়; জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধ গঠনের প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীরা হয়তো বইয়ের তথ্য মুখস্থ করতে শিখবে, কিন্তু বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা কিংবা নৈতিক মূল্যবোধ অর্জনের সুযোগ কমে যাবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট কী বলে?
শিক্ষকদের প্রশাসনিক কাজ নিয়ে উদ্বেগ শুধু বাংলাদেশের নয়; এটি একটি বৈশ্বিক আলোচনার বিষয়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ঙঊঈউ)-এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের বহু দেশের শিক্ষক অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজকে তাদের পেশাগত চাপের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন। শিক্ষকরা মনে করেন, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও রিপোর্টিংয়ের কারণে তাদের পাঠদানের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তারা শিক্ষকের সময়কে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে শিক্ষককে এমন কাজে ব্যস্ত রাখা হয় না, যা অন্য কোনো প্রশাসনিক কর্মীও করতে পারে।
ফিনল্যান্ডের শিক্ষা থেকে শিক্ষা
বিশ্বের অন্যতম সফল শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে ফিনল্যান্ডের নাম প্রায়ই আলোচিত হয়। দেশটির শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে ভালো ফলাফল করে আসছে।
ফিনল্যান্ডের সাফল্যের পেছনে অনেক কারণ থাকলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শিক্ষকদের প্রতি আস্থা এবং পেশাগত স্বাধীনতা। সেখানে শিক্ষকদের ওপর অপ্রয়োজনীয় রিপোর্টিংয়ের ও দাপ্তরিক কাজের চাপ তুলনামূলক কম। শিক্ষকরা তাদের সময়ের বড় অংশ পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি উন্নয়নে ব্যয় করতে পারেন।
ফিনল্যান্ড বুঝেছে যে একজন শিক্ষক যখন কাগজপত্রের চেয়ে শিক্ষার্থীর ওপর বেশি সময় ব্যয় করেন, তখনই শিক্ষার প্রকৃত মান উন্নত হয়।
জাপান ও সিঙ্গাপুরের শিক্ষা ব্যবস্থা
অনেকে যুক্তি দেন যে জাপান বা সিঙ্গাপুরে শিক্ষকদের কাজের চাপ অনেক বেশি। কথাটি সত্য, কিন্তু সেখানে কাজের প্রকৃতি ভিন্ন।
জাপানে শিক্ষকরা দীর্ঘ সময় কাজ করেন। তবে এর বড় অংশ ব্যয় হয় শিক্ষার্থী সহায়তা, সহশিক্ষা কার্যক্রম, ক্লাব পরিচালনা এবং শিক্ষা-সম্পর্কিত দায়িত্বে। একইভাবে সিঙ্গাপুরেও শিক্ষকরা পাঠ পরিকল্পনা, পেশাগত উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সময় দেন।
অর্থাৎ কাজের চাপ থাকলেও সেটি মূলত শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিপরীতে যখন শিক্ষককে এমন কাজে ব্যস্ত রাখা হয়, যার সঙ্গে শিক্ষাদানের সরাসরি সম্পর্ক নেই, তখন সেটি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসার উল্লেখযোগ্য হলেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। শিক্ষকদের ওপর প্রশাসনিক চাপ তার অন্যতম কারণ বলে অনেক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ মনে করেন।
বর্তমানে শিক্ষকদের নানা ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও আপলোড, বিভিন্ন প্রকল্পের রিপোর্ট প্রস্তুত, সভা এবং নানা প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশ নিতে হয়। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তি কাজ সহজ করার পরিবর্তে নতুন ধরনের রিপোর্টিংয়ের চাপ সৃষ্টি করেছে।
ফলে একজন শিক্ষককে একই তথ্য একাধিকবার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে জমা দিতে হয়। এতে সময় ও শ্রম উভয়ের অপচয় ঘটে।
অনেক শিক্ষক অভিযোগ করেন যে কখনো কখনো তাদের এমন কাজেও নিয়োজিত করা হয়, যা শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষের প্রস্তুতি ও শিক্ষার্থীদের প্রতি মনোযোগ কমে যায়।
শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্ন
অতিরিক্ত দাপ্তরিক কাজ শুধু শিক্ষার মানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না! এটি শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
একজন শিক্ষক যখন একই সঙ্গে পাঠদান, মূল্যায়ন, প্রশাসনিক কাজ এবং নানা নির্দেশনা বাস্তবায়নের চাপে থাকেন, তখন তার মধ্যে ক্লান্তি, উদ্বেগ ও পেশাগত অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত কাজের চাপ শিক্ষকদের পেশাগত অবসাদ (ইঁৎহড়ঁঃ) বাড়ায়। এর ফলে অনেক শিক্ষক পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন বা সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণে অনীহা দেখান।
একজন অনুপ্রাণিত শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে পারেন, তেমনি অতিরিক্ত চাপে থাকা একজন শিক্ষক তার সর্বোচ্চ দক্ষতা প্রয়োগ করতে পারেন না।
তাহলে কি দাপ্তরিক কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে?
একেবারেই নয়।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য কিছু প্রশাসনিক কাজ অবশ্যই প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের তথ্য সংরক্ষণ, ফলাফল ব্যবস্থাপনা, প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট পরিমাণ দাপ্তরিক কাজ থাকবে।
কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো এই কাজের ভারসাম্য কোথায় ?
যে কাজ একজন প্রশাসনিক সহকারী করতে পারেন, তা কেন একজন শিক্ষককে করতে হবে? যে কাজের সঙ্গে পাঠদানের সরাসরি সম্পর্ক নেই, তা কেন শিক্ষকের মূল্যবান সময় নষ্ট করবে?
সঠিক সমাধান হলো শিক্ষকদের ওপর অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ কমিয়ে তাদের মূল পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেওয়া।
করণীয় কী?
প্রথমত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত প্রশাসনিক সহায়ক কর্মী নিয়োগ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, একই তথ্য বারবার সংগ্রহ ও রিপোর্ট করার সংস্কৃতি কমাতে হবে।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এমনভাবে উন্নত করতে হবে যাতে তা শিক্ষকের কাজ সহজ করে, জটিল না করে।
চতুর্থত, শিক্ষকদের শিক্ষাবহির্ভূত সরকারি কাজে নিয়োগের প্রবণতা সীমিত করতে হবে।
পঞ্চমত, নীতিনির্ধারণের সময় শিক্ষকদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বাস্তব সমস্যাগুলো সবচেয়ে ভালো জানেন তারাই।
ষষ্ঠত, অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক তদারকি/ নজরদারী থেকে বিরত থাকা।
উপসংহার
শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য নতুন পাঠ্যক্রম, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব উদ্যোগ তখনই সফল হবে, যখন শিক্ষক তাঁর মূল কাজটি করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ পাবেন।
একজন শিক্ষক যদি দিনের বড় অংশ কাগজপত্র, রিপোর্ট এবং প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করতে বাধ্য হন, তবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। কারণ শিক্ষকের হারানো সময় শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীর শেখার সুযোগ থেকেই কেটে নেওয়া হয়।
তাই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন চাইলে আমাদের একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করতে হবে শিক্ষকের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তাঁর সময়। সেই সময় যত বেশি শ্রেণিকক্ষে, শিক্ষার্থীদের মাঝে এবং শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় হবে, ততই জাতির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে।
মানসম্মত শিক্ষার জন্য তাই শিক্ষকের হাতে আরও ফাইল নয়, আরও সময় তুলে দেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

আরো পড়ুন

বিএম কলেজ ডিগ্রি হলে ছাত্র অধিকার পরিষদের ফল উৎসব

সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের মহাত্মা অশ্বিনীকুমার (ডিগ্রি) হলের বি ব্লকে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ বিএম …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *