বুধবার, জুলাই ৮, ২০২৬

ক্ষমতার আলোয় নয়, ত্যাগের ইতিহাসেই রাজনীতির মর্যাদা—আনোয়ার ভূইয়া, মিলন, মতিন ও আমির বেপারীকে ঘিরে নতুন করে ভাবনার সময়

রিয়াজ ফরাজী বোরহানউদ্দিন

একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত পরিচয় শুধু ক্ষমতায় থাকা বা বড় বড় কর্মসূচি আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দলটি কতটা আন্তরিকভাবে তার ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করে, তাদের পাশে দাঁড়ায় এবং তাদের অবদানকে সম্মান জানায়—সেই মানদণ্ডেই একটি সংগঠনের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান নির্ধারিত হয়।

অথচ বাস্তবতা হলো, রাজনীতির কঠিন সময়ে যাদের কাঁধে ভর করে একটি সংগঠন টিকে থাকে, ক্ষমতার সময় অনেক ক্ষেত্রেই তারাই হয়ে পড়েন সবচেয়ে অবহেলিত।

ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে এমনই চারজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা ছিলেন মরহুম আনোয়ার হোসেন ভূইয়া, সাইদুর রহমান মিলন মিঞা, কাচিয়া ইউনিয়নের মতিন মিঞা এবং দেউলা ইউনিয়নের আমির বেপারী। ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, পরিবার কিংবা জীবিকার হিসাব না কষে তারা বছরের পর বছর দল ও আদর্শের জন্য কাজ করেছেন। মামলা-হামলা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দুঃসময়—সবকিছু উপেক্ষা করেও তারা সংগঠনের পতাকা হাতে রেখেছেন এবং নেতাকর্মীদের সাহস জুগিয়েছেন।

স্থানীয় প্রবীণ নেতাকর্মীরা বলেন, এই চার নেতা শুধু রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না; তারা ছিলেন সংগঠনের ভিত্তি। তাদের বাড়ি ছিল নেতাকর্মীদের আশ্রয়স্থল, তাদের পরামর্শ ছিল দলের সংকট মোকাবিলার শক্তি। ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে সংগঠনের স্বার্থই ছিল তাদের একমাত্র অগ্রাধিকার।

বিশেষ করে পৌর বিএনপির সভাপতি ও দুইবারের সফল মেয়র মরহুম সাইদুর রহমান মিলন মিঞা ছিলেন দায়িত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ। দীর্ঘদিন অসুস্থতা ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করেও তিনি দলের কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিয়েছেন। শরীর দুর্বল হলেও মনোবল ছিল অটুট। দলকে ভালোবেসে শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার মৃত্যুবার্ষিকীতে একটি সাধারণ দোয়া ও মিলাদ মাহফিলও আয়োজন না হওয়ায় অনেক নেতাকর্মী কষ্ট ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।

একইভাবে আনোয়ার হোসেন ভূইয়া, মতিন মিঞা ও আমির বেপারীর মতো নেতারাও জীবনের মূল্যবান সময় সংগঠনের পেছনে ব্যয় করলেও শেষ সময়ে প্রত্যাশিত সম্মান ও মূল্যায়ন কতটুকু পেয়েছেন—সেই প্রশ্ন আজও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন কর্মী যখন জীবদ্দশায় অবহেলিত থাকেন, অসুস্থতার সময়ে তার খোঁজ নেওয়া হয় না, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো হয় না, তখন মৃত্যুর পর ব্যানার, ফুল কিংবা স্মরণসভা আয়োজন সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। প্রকৃত শ্রদ্ধা হলো মানুষটি বেঁচে থাকতে তার অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া, সম্মান করা এবং বিপদে তার পাশে দাঁড়ানো।

সচেতন মহলের মতে, বর্তমানে অনেকেই রাজনীতিতে আসছেন পদ-পদবি, প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের আশায়। কিন্তু যারা আজ রাজনীতি করছেন, তাদের মনে রাখা উচিত—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। একদিন তারাও প্রবীণ হবেন, একদিন তারাও সংগঠনের ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবেন। আজ যদি তারা ত্যাগী নেতাদের সম্মান করতে না শেখেন, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও হয়তো তাদের একইভাবে ভুলে যাবে।

তাদের মতে, একটি রাজনৈতিক সংগঠনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার মূল্যবোধের ওপর। যেখানে ত্যাগের মূল্য নেই, সেখানে আদর্শ টিকে থাকতে পারে না। আর যেখানে জীবিত মানুষ সম্মান পান না, সেখানে মৃত্যুর পরের স্মৃতিচারণ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।
স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন প্রশ্ন উঠেছে—দলের জন্য সারাজীবন শ্রম দেওয়া এসব নেতার অবদান কি শুধু স্মৃতিচারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তাদের আদর্শ ও ত্যাগকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরে সম্মান জানানোর একটি স্থায়ী সংস্কৃতি গড়ে উঠবে?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আনোয়ার হোসেন ভূইয়া, সাইদুর রহমান মিলন মিঞা, মতিন মিঞা ও আমির বেপারীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে ত্যাগী নেতাকর্মীদের জীবিত অবস্থায় মূল্যায়ন করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলেই রাজনীতি আবারও মানুষের আস্থা ও আদর্শের জায়গায় ফিরে আসবে। কারণ ইতিহাস বলে, ক্ষমতা নয়—ত্যাগই একটি রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

আরো পড়ুন

মহিপুরকে প্রশাসনিক উপজেলা করতে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

মাহতাব হাওলাদার, মহিপুর প্রতিনিধি: পটুয়াখালীর মহিপুর পুলিশি থানাকে পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক উপজেলা হিসেবে ঘোষণার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *