সোমবার, জুলাই ২০, ২০২৬

২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ঢাকায় একদিনেই নিহত হয় ভোলার ১৩ জন

ভোলা প্রতিনিধি : ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে রাজধানী ঢাকায় সংঘর্ষে ভোলার ১৩ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ১২ জন গুলিবিদ্ধ এবং একজন পদদলিত হয়ে মারা যান। এদিকে, দুই বছর পরও হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন নিহতদের স্বজনেরা।

ভোলার সাবেক জেলা প্রশাসক, সাবেক পুলিশ সুপার, বর্তমান সিভিল সার্জন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), ভোলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক, জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক রাহিম ইসলাম ও হিমুর ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত শহীদ তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯ জুলাই নিহত ১৩ জনের মধ্যে ছিলেন ভোলা সদর, বোরহানউদ্দিন, লালমোহন ও চরফ্যাশন উপজেলার বাসিন্দারা। তাদের মধ্যে ছিলেন কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থী, দিনমজুর, রাজমিস্ত্রী, রিকশাচালক, ট্রাকচালক, হোটেলকর্মী, বেকারির বিক্রয়কর্মী ও দোকানকর্মী।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, গণঅভ্যুত্থানের ওই দিনে দেশের অন্য কোনো জেলার এত মানুষ নিহত হননি।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের ড্রাইভার বাবুল (৪০); বোরহানউদ্দিন উপজেলার ভোলা সরকারি কলেজের ছাত্র নাহিদ (২১), রাজমিস্ত্রী ইয়াছিন (২৩), পদদলিত হয়ে নিহত রিকশাচালক জামাল উদ্দিন (৩৫); লালমোহন উপজেলার হোটেলকর্মী আরিফ (১৭), লন্ড্রির দোকানকর্মী মোসলেহ উদ্দিন (৩৫), রিকশাচালক আক্তার হোসেন (৩৫), মুফতি শিহাবউদ্দিন (৩০), মিষ্টির দোকানকর্মী শাকিল (২০), হোটেলবয় সাইদুল (১৪); এবং চরফ্যাশন উপজেলার বেকারির বিক্রয়কর্মী সোহাগ (১৭), রাজমিস্ত্রী বাহাদুর হোসেন মনির (১৮) ও ট্রাকচালক মো. হোসেন (২৫)।

আজ ওই নিহতদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। স্বজনেরা বলছেন, ১৯ জুলাই তাদের কাছে এখনো এক বিভীষিকাময় দিন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হলেও প্রধান আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্তদের বিচার এখনো শুরু হয়নি।

১৯ জুলাই ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন লালমোহন উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আরিফ (১৭)। দরিদ্র কৃষক ইউসুফের একমাত্র ছেলে আরিফ স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় আলিমে পড়তেন। মাদ্রাসা বন্ধ থাকায় কাজের উদ্দেশ্যে ঢাকায় গিয়েছিলেন তিনি।
শহীদ আরিফের বাবা ইউসুফ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘কেন আমার নিরীহ ছোট্ট পোলাডারে গুল্লি কইরা মারলো? আমার বংশের বাতি জ্বালানোর মতো তো কেউই রইলো না। পোলাডা অনেক নম্রভদ্র ছিল, মাদরাসায় পড়ত।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাদরাসা বন্ধ থাকায় আরিফকে তার মামাতো ভাই তার দোকানে কাজ করার জন্য ঢাকায় নেয়; সেখানেই কাজ করত। কিন্তু ১৯ জুলাই যখন আরিফ রাস্তায় গেল, তখন গুল্লিতে পোলাডার মাথা ফুডা হইয়া গেছে। লাশ বাড়িতে আনার সময়ও প্রতি পরতে পরতে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এহন আমি বুড়া হইয়া গেছি, অনেক আশা ছিল পোলাডারে লইয়া। পোলাডা বাঁইচা থাকলে আমার আর কোনো চিন্তা থাকত না। কাজকাম করার শক্তি নাই শরীলে। সরকার মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা দেয়, যা দিয়ে মেয়েদের পড়াশোনা আর সংসার চালানো যায় না। আমি কিছুই চাই না, চাই শুধু পোলা হত্যার বিচার। ১৯ জুলাই আমার আদরের পোলার মৃত্যুবার্ষিকী, তাই গত শুক্রবার বাড়ির সামনের মসজিদে মিলাদ পড়াইছি।’

ভোলা সরকারি কলেজের সাবেক ছাত্র নাহিদের বাবা জলিল মাতুব্বর বলেন, ‘আমার একমাত্র পোলাডারে তো চিরদিনের জন্যেই হারাইলাম, আর তো ফিরে আইবো না। পোলার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে দুইদিন আগেই গত শুক্রবার বাড়িতে মিলাদ পড়িয়েছি। সারাক্ষণ পোলাডার কথা মনে পড়ে।’
এ ছাড়া, অন্যান্য শহীদদের স্বজনেরাও তাদের রুহের মাগফিরাত কামনায় মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন করেছেন।

শহীদ সিয়ামের ভাই এবং ভোলার শহীদ পরিবার প্রতিনিধি রাসেল হোসেন রাফি বলেন, ‘ভোলার জুলাই শহীদ পরিবারগুলো খুবই কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। সরকারিভাবে এসব পরিবারকে প্রতিমাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হয় যা প্রয়োজনের তুলনায় কিছুই না। প্রতিটি পরিবারের যিনি যিনি শহীদ হয়েছেন, তিনি বেঁচে থাকলে পরিবারগুলো আরও ভালোভাবে চলতে পারত। প্রত্যকের বাবা-মা ও স্ত্রী সন্তান রয়েছে। সরকার যদি আরও উদ্যোগ নিতো, তাহলে শহীদ পরিবারগুলো ভালোভাবে দিন কাটাতে পারত।’

রাসেল আরও বলেন, ‘শহীদরা তাদের রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে যে বৈষম্যহীন কাঙ্খিত বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিল, তা হয়নি। সেই বৈষম্য রয়েই গেল। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। শহীদদের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা দায়ের করা হলে মামলাগুলোর কোনো অগ্রগতি নেই, বিচার পাচ্ছি না। আমরা আসলে এমন বৈষম্যের বাংলাদেশ চাইনি। সরকারের কাছে আমাদের শহীদ পরিবারগুলোর প্রত্যাশা হলো, আমরা খুনীদের বিচার চাই।’

‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ সংগঠনের ভোলা জেলা শাখার সদস্যসচিব মো. রাকিব বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৯ জুলাইতেও আমরা ঢাকার রাজপথে ছিলাম। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছিল দলে দলে, সাধারণ মানুষও ঘরে বসে থাকেননি। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অবিস্মরণীয় দিন, এদিন ঢাকার রাজপথে শহীদ হন শুধু ভোলারই ১৩ জন। রামপুরা, বাড্ডা, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন জায়গার আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। আন্দোলন দমাতে পুলিশ ও র‍্যাবের সঙ্গে মিলে আওয়ামী লীগ এবং তাদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। ভোলার মানুষও আন্দোলনে ছিল, পিছপা হয়নি। গুলির সামনে আমরা আবু সাঈদের মতো বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলাম, গুলিতে অনেকেই হয়েছেন শহীদ, আবার অনেকেই আহত।’
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, মাদারীপুর ও ভোলায় সংঘর্ষে এক নারীসহ ভোলার মোট ৪৮ জন নিহত হন।

 

আরো পড়ুন

এই বাংলাদেশ দেখার জন্য বুলেটের সামনে দাঁড়াইনি-শায়খে চরমোনাই

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশালে ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশ-এর ১০ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সমাবেশ উদযাপিত। ২০ জুলাই সোমবার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *