নিজস্ব প্রতিবেদক : দক্ষিণাঞ্চলে দুর্যোগকালীন খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর তীরে ৩৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক খাদ্যভাণ্ডার সাইলো। ৪৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার এই স্থাপনা ঘিরে খাদ্য সংরক্ষণ ও জরুরি সরবরাহের বড় সম্ভাবনা তৈরি হলেও বাস্তবে এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি এর কার্যক্রম। জেটির সামনে নদীর নাব্যতা কম থাকায় শুরু করা যায়নি নৌপথে চাল পরিবহন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনবল সংকট, পরিচালন ব্যয়ের ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত চাল মজুত না থাকার বিষয়টি। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামোর পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বরিশাল নগরের ত্রিশ গোডাউন এলাকায় প্রায় সাত একর জমির ওপর নির্মিত সাইলোটিতে চাল সংরক্ষণের জন্য রয়েছে ১৬টি বিন। ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট এটি উদ্বোধন করা হয়। সড়কপথের পাশাপাশি নদীপথে চাল পরিবহন এবং ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগে দ্রুত খাদ্য সরবরাহের পরিকল্পনা থেকেই নির্মাণ করা হয় স্থাপনাটি। তবে উদ্বোধনের পরও নৌপথে চাল পরিবহন শুরু না হওয়ায় এর অন্যতম উদ্দেশ্য এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
এ পরিস্থিতিতে সাইলো জেটির সামনের প্রায় ৩০০ মিটার এলাকায় নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) খননকাজ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, খনন শেষ হলে নৌপথে খাদ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রকৌশলী তরিকুল ইসলাম বলেন, ১৭০ মিটার দীর্ঘ জেটির সামনে খনন শেষ হলে কীর্তনখোলা নদীর মূল চ্যানেলে খননকাজ শুরু হবে।
সাইলো পরিচালনায় প্রয়োজন ৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। গত সেপ্টেম্বরে ৩১টি পদের অনুমোদন পাওয়া গেলেও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সাইলো থেকে প্রেষণে আনা ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও রয়েছে জনবল সংকট। ১৫ জন আনসার চাওয়া হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ১২ জন নিয়োগের অনুমোদন পাওয়া গেছে।
সাইলোর ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক রাকেশ বিশ্বাস জানান, জনবল সংকটের কারণে দিনের দায়িত্ব পালনের পর কর্মীদের রাতেও পাহারা দিতে হচ্ছে। এলাকায় একাধিকবার চুরির ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় পরিচালন বরাদ্দ না থাকায় বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে মোংলা সাইলোর বরাদ্দের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। চাল ওঠানো-নামানোর শ্রমিকদের বিলসহ দৈনন্দিন ব্যয়ের কিছু বিলও বকেয়া রয়েছে। অর্থনৈতিক কোড চালুর মাধ্যমে নিয়মিত বরাদ্দ পাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ৪৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার সাইলোটিতে বর্তমানে চাল মজুত রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৫৭ টন। বরিশালের আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তা নকীব সাদ সাইফুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন। সাইলোর ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক রাকেশ বিশ্বাস জানান, চলতি মাসে দুটি বিনে ৬ হাজার টন চাল সংরক্ষণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তা নকীব সাদ সাইফুল ইসলাম জানান, বিভাগের বিভিন্ন খাদ্যগুদামে বর্তমানে ১ লাখ ৯ হাজার টন চাল মজুত রয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৭৪ শতাংশ। তবে বরিশালের সাইলোর জন্য আলাদা সংরক্ষণ লক্ষ্যমাত্রা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে সেখানে নিয়মিত চাল মজুতের কার্যক্রমও গতি পায়নি।
খাদ্য ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা চাল সংরক্ষণের প্রস্তুতি নিলেই সাইলোর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত হবে না। নিয়মিত কতটা চাল মজুত রাখা হবে, কখন মজুত বাড়ানো হবে এবং দুর্যোগের সময় কীভাবে দ্রুত খাদ্য বিতরণ করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় নদীপথ যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হওয়ায় দুর্যোগে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে এই সাইলো বিকল্প খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রান্তজন ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক মো. তৌহিদুল ইসলাম শাহজাদা বলেন, বিশ্ব খাদ্য দিবসে বরিশালের এই খাদ্যভাণ্ডার দক্ষিণাঞ্চলের জন্য একটি সম্ভাবনা। নদীপথ সচল হলে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে দুর্যোগের সময় খাদ্য সরবরাহের বিকল্প পথ খুলতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, পরিচালন ব্যয়ের বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং সুনির্দিষ্ট খাদ্য মজুত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমে ফিরবে বরিশালের এই সাইলো। তা না হলে দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত বিপুল ব্যয়ের এই অবকাঠামোর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।