বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৯, ২০২৬

অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারে কমছে কৃষিজমি

বাংলাদেশ বানী ডেস্ক   আমাদের কৃষি ও কৃষকের অবস্থা দিন দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। দেশের বিপুল পরিমাণ জমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। এভাবে চললে একদিন হয়তো চাষাবাদের জন্য জমি ফুরিয়ে যাবে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ এখনো কৃষিনির্ভর। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো নির্ধারিত হয়ে থাকে কৃষির উৎপাদনের হ্রাস-বৃদ্ধির ওপর। কিন্তু দিন দিন দেশের কৃষিজমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। নতুন বসতভিটা, রাস্তাঘাট-অবকাঠামো নির্মাণ, ইটভাটা, কলকারখানা, নগরায়ণে অধিগ্রহণেই ভূমির অবক্ষয় হচ্ছে বেশি। বর্তমান হারে ভূমি অবক্ষয় চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে কোনো কৃষিজমি থাকবে না। ফলে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা আর অস্থিরতার মধ্যেও দেশকে অনেকটা স্বাভাবিক রাখছে ‍কৃষি। সংগত কারণেই কৃষিজমির সুরক্ষা জরুরি। তাই জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতীয় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা ও নীতিমালা জরুরি।

কৃষিজমি অকৃষি কাজে ব্যবহারের প্রবণতা কঠোরভাবে রুখতে হবে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কৃষিজমির সুরক্ষা ব্যর্থ হলে টিকে থাকা কঠিন হবে। দেশে কৃষিজমির পরিমাণ কমছেই। স্বাধীনতার পর থেকে কৃষিজমির পরিমাণ অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে আড়াই গুণেরও বেশি। ৫৪ বছর আগেও বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতির দেশগুলোর একটি। জনসংখ্যা আড়াই গুণ বেড়ে যাওয়ায় বর্ধিত জনসংখ্যার প্রয়োজনে ঘরবাড়ি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ব্যাপকহারে কৃষিজমি। রাস্তাঘাট, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত তৈরিতেও কৃষিজমির ব্যবহার এড়ানো যাচ্ছে না। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্যও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কৃষিজমি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কৃষিশুমারিতেও নিশ্চিত করা হয়েছে কৃষিজমি কমার তথ্য। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ‘কৃষিশুমারি-২০১৯’ জরিপ প্রকাশ করে বিবিএস। জরিপ অনুযায়ী, ১১ বছরে আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে ৪ লাখ ১৬ হাজার একর। ২০০৮ সালে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৯০ লাখ ৯৭ হাজার একর। ২০১৯ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৮১ হাজার একরে। মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ‘বাংলাদেশের কৃষিজমি বিলুপ্তির প্রবণতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রতি বছর ৬৯ হাজার ৭৬০ হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণকাজের কারণে প্রতি বছর ৩ হাজার হেক্টর জমি হারিয়ে যাচ্ছে।

জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি-২০১০ এবং কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন-২০১০ অনুসারে, কৃষিজমি কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু বিকল্প জমি না থাকায় কৃষিজমি ভরাট করে বাড়িঘর, শিল্পকারখানা, ইটভাটা বা অন্য কোনো অকৃষি স্থাপনা হচ্ছে। বেঁচে থাকার জন্য বিশেষত খাদ্য উৎপাদনে কৃষিজমি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ একসময় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল কৃষকের ঘামে। অথচ সেই আবাদি জমি এখন দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। প্রতিদিন গ্রামাঞ্চলের উর্বর জমি বিক্রি হচ্ছে আবাসন কোম্পানির কাছে, সড়ক নির্মাণে ভরাট হচ্ছে মাঠ, চলে যাচ্ছে শিল্প প্রকল্পে।

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিদিনই হারাচ্ছি প্রায় ২১৯ হেক্টর জমি। এভাবে চলতে থাকলে আগামী প্রজন্মের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে আবাদি জমি ছিল প্রায় ২ কোটি ১৭ লাখ হেক্টর। জনসংখ্যা তখন ছিল মাত্র ৭ কোটি ৯০ লাখ। ২০০০ সালে জমির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৮০ লাখ ১৮ হাজার হেক্টর আর জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ কোটিতে। ২০১৭-১৮ সালে কৃষিজমি নেমে আসে ৮০ লাখ হাজার হেক্টরে। ২০২৩-২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে আবাদযোগ্য জমি রয়েছে প্রায় ৭৯ লাখ ৪৬ হাজার হেক্টর, জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কৃষিজমি কমেছে প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ হেক্টরের বেশি।

আবাদযোগ্য জমি কমার কারণ হিসেবে কৃষি বিভাগ বলছে, কৃষি জমিতে পুকুর খনন, বাড়িঘর নির্মাণ, নতুন নতুন এলাকায় রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ করায় দিন দিন আমাদের জমি হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ২ কোটি ১ লাখ ৫৭ হাজার একর বা ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ১৮ কোটি হিসেবে, মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৪৪ হেক্টরে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মাণসহ নানা কারণে প্রতি বছর দেশের প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। দেশে সুনির্দিষ্ট জরিপ না হওয়ায় আবাদি জমির পরিমাণে গরমিল দেখা যায়।

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছরই এ দেশ থেকে প্রায় ১ শতাংশ হারে কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন কমছে প্রায় ২১৯ হেক্টর আবাদি জমি। পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং কৃষি বিভাগের হিসাবমতে, প্রতি বছর দেশের কৃষিজমির পরিমাণ কমছে ৬৮ হাজার ৭০০ হেক্টর। অর্থাৎ প্রতি বছর শতকরা প্রায় ১ শতাংশ হিসাবে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমেছে। সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কৃষিজমি বিলুপ্তির প্রবণতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০০ সাল-পরবর্তী ১২ বছরে দেশে প্রতি বছর ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণকাজের কারণে ৩ হাজার হেক্টর জমি বিলীন হচ্ছে। ‘জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০১০’ এবং ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন ২০১০’ অনুসারে কৃষিজমি কৃষিকাজ ব্যতীত অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো কৃষিজমি ভরাট করে বাড়িঘর, শিল্প-কারখানা, ইটভাটা বা অন্য কোনো অকৃষি স্থাপনা কোনোভাবেই নির্মাণ করা যাবে না উল্লেখ করে একটি নামমাত্র আইন আছে।

আরো পড়ুন

মানিকগঞ্জে পেঁয়াজের চারা রোপণ শুরু, লক্ষ্যমাত্রা ৭০ হাজার টন

বাংলাদেশ বানী ডেস্ক রবি মৌসুম শুরু হওয়ায় মানিকগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় পেঁয়াজের চারা রোপণে ব্যস্ত সময় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *