সোমবার, মার্চ ২৩, ২০২৬

কুয়াকাটার মিনি সুইজারল্যান্ড, ঘুরতে আসা পর্যটকদের আকর্ষণের শীর্ষে

মোঃ মাহতাব হাওলাদার, মহিপুর প্রতিনিধি।।

দক্ষিণের অপরূপ সমুদ্র সৈকতখ্যাত কুয়াকাটা এখন শুধু সূর্যোদয়–সূর্যাস্তের জন্যই নয়, নতুন নতুন পর্যটন আকর্ষণের কারণেও আলোচনায়। এরই মধ্যে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিত এক মনোরম প্রাকৃতিক স্পট। পাশাপাশি এর কাছেই অবস্থিত ‘লাল কাঁকড়ার দ্বীপ’ এলাকাও পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াচ্ছে। আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এই দুই স্পট ঘিরে পর্যটকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।

কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ সবুজ বনভূমি, খোলা তৃণভূমি, লেক ও সমুদ্রের ঢেউয়ের অপূর্ব মিলনে গড়ে ওঠা এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জায়গা। বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর, ছোট ছোট টিলা, নীল আকাশ ও নির্মল বাতাসের কারণে অনেক পর্যটকের কাছে এটি যেন প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে থাকা একটুকরো শান্ত স্বর্গ।

এই স্পটে এসে পর্যটকরা সবুজ প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো, ছবি তোলা, পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘোরাঘুরি এবং নিরিবিলি পরিবেশ উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছেন। অনেক ভ্রমণপিপাসু এখানে তাঁবু টাঙিয়ে রাত কাটান। এখানকার অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ হলো—একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করার বিরল অভিজ্ঞতা।

ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক নুরসাত ও সোহান দম্পতি বলেন, ‘আমরা অনেক জায়গায় ঘুরেছি, কিন্তু এক জায়গা থেকে সূর্য ওঠা ও ডোবা দুটোই দেখা যায়—এমন দৃশ্য সত্যিই বিরল। এখানকার পরিবেশ খুবই শান্ত ও মনোরম।’

আরেক পর্যটক রায়হান সাব্বির বলেন, ’মিনি সুইজারল্যান্ডে এসে মনে হচ্ছে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছি। এখানকার নীরবতা আর নির্মল বাতাস আলাদা এক শান্তি দেয়।’

স্থানীয় ট্যুর গাইড আবুছালেহ জানান, শুরুতে স্থানীয় কয়েকজন মিলে জায়গাটিকে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে ডাকতেন। পরে ভ্রমণব্লগার মি. লাক্সছু মোটরসাইকেলে করে কুয়াকাটার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ভিডিও ধারণ করেন। কাউয়ারচর ও গঙ্গামতির লেকসহ আশপাশের দৃশ্য তার ভিডিওতে উঠে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই জায়গাটি দেশজুড়ে পরিচিতি পেতে শুরু করে।

মি. লাক্সছু বলেন, ‘প্রথম যখন এখানে আসি, জায়গাটি তেমন পরিচিত ছিল না। চারদিকে সবুজ গাছ, নীল আকাশ আর সাগরের শান্ত ঢেউ দেখে মনে হয়েছিল—এ যেন বাংলাদেশের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক টুকরো সুইজারল্যান্ড। সেই ভাবনা থেকেই ব্লগে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামটি ব্যবহার করি।’

কুয়াকাটার আরেক আকর্ষণ ‘লাল কাঁকড়ার দ্বীপ’। সৈকতের বালুচরে হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার দৌড়ে বেড়ানোর দৃশ্য পর্যটকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। আশপাশের সবুজ বনভূমি ও শান্ত পরিবেশ মিলিয়ে এলাকাটি ধীরে ধীরে ইকো-ট্যুরিজমের সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ ও লাল কাঁকড়ার দ্বীপকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে কুয়াকাটায় পর্যটনের নতুন মাত্রা যোগ হবে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আমরা কুয়াকাটাবাসী’র সভাপতি ও মহিপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান আকাশ বলেন, ‘সঠিক পরিকল্পনা ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই এলাকাকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ইকো-ট্যুরিজম স্পটে পরিণত করা সম্ভব। তবে পরিবেশ সংরক্ষণে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক)-এর প্রেসিডেন্ট রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ‘এখানে পরিকল্পিতভাবে ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় অর্থনীতি যেমন চাঙা হবে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের গাইড, নৌ-ট্যুর অপারেটর ও পর্যটনভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে এলাকার অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।’

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু অসচেতন পর্যটকের কারণে এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সাউন্ড বক্স বাজানো, প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা এবং ময়লা-আবর্জনায় দূষিত হচ্ছে এই নিরিবিলি প্রকৃতি।

কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসীন সাদেক বলেন, ‘এই এলাকাকে ঘিরে পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সড়ক যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার হামিদ বলেন, ‘মিনি সুইজারল্যান্ড ও আশপাশের এলাকাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য পর্যটন প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।’

সবুজ প্রকৃতি, নির্মল পরিবেশ ও সমুদ্রের মায়ায় মোড়া কুয়াকাটার ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ এবং লাল কাঁকড়ার দ্বীপ এখন পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঠিক পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে এসব স্থান কুয়াকাটাকে বহুমাত্রিক পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করতে পারে।

আর তাই এবারের ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি কিছুটা সময় কাটাতে চাইলে কুয়াকাটার এই নতুন পর্যটন স্পট হতে পারে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য দারুণ এক গন্তব্য।

আরো পড়ুন

তজুমদ্দিনে বিদায়ী শিক্ষকদের সংবর্ধনা, ‘উদারতার দেয়াল’ আত্মপ্রকাশ

বিশেষ প্রতিবেদক।। ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার গোলকপুর রাজকুমার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে এক ব্যতিক্রমী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *