পটুয়াখালী প্রতিনিধি : শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় মানুষ গড়ার কারখানা। আর সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সুবিদখালী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ, জমি হাতিয়ে নেওয়া, এমপিও জালিয়াতি, অনিয়মিত নিয়োগসহ নানা অভিযোগে থানায় একাধিক অভিযোগ এবং আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ উপজেলার দক্ষিণ আমড়াগাছিয়া গ্রামের হুমায়ুন কবীর মোল্লা অধ্যক্ষ আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে মির্জাগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। মামলার নম্বর ১৭৬/২৬।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৮ সালের ২১ নভেম্বর কলেজে অফিস সহকারী পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে হুমায়ুন কবীরের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা নেওয়ার চুক্তি করেন অধ্যক্ষ আবদুর রহমান। পরে একাধিক সাক্ষীর উপস্থিতিতে তিনি ৫ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও চাকরি না দিয়ে টাকা ফেরত চাইলে ভুক্তভোগীকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে চলতি বছরের ২ মার্চ পটুয়াখালীর বাসিন্দা মো. বেলাল উদ্দিন মির্জাগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, চাকরি দেওয়ার নামে পর্যায়ক্রমে তার কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু চাকরি দেওয়া হয়নি। অভিযোগটির নম্বর সিএল-১৫০, তারিখ ০২-০৩-২০২৬।
এরপর ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে উপজেলার তারাবুনিয়া গ্রামের মজিবুল হক শানু নামে আরেক ব্যক্তি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, চাকরি দেওয়ার আশ্বাসে তার কাছ থেকে ২ শতাংশ জমি, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ২০ লাখ টাকা, আত্মসাৎ করা হয়েছে।
শুধু চাকরি বাণিজ্যের অভিযোগই নয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসন সূত্র বলছে, অধ্যক্ষ আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন, রেজুলেশন বই সরবরাহ না করা, বরখাস্ত ও পদত্যাগকারী শিক্ষকদের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর নেওয়া, নিয়মবহির্ভূত শিক্ষক নিয়োগসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) তার এমপিও বাতিল কেন করা হবে না—এ মর্মে দুই দফা কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে।
নোটিশগুলো যথাক্রমে—
স্মারক নং: ৭জি-৪৬২(ক-৩)/২০০৬(৭-১)/১৭৮০/৫
তারিখ: ২৭ এপ্রিল ২০২৩
এবং
স্মারক নং: ৭জি-৪৬২(ক-৩)/০৬(অংশ-১)/৪১৯৩/৫
তারিখ: ১৩ আগস্ট ২০২৩।
অভিযোগ রয়েছে, কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক আব্দুস সালাম মোল্লা ২০০৫ সালে মারা যাওয়ার পরও তার নাম এমপিও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে ২০০৫ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭ বছর তার নামে বেতন-ভাতা উত্তোলন করা হয়। এতে প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা বন্ধ থাকার পরও অধ্যক্ষের বিপুল সম্পদ অর্জন নিয়েও এলাকায় নানা প্রশ্ন উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, তারা তাদের অর্থ ও জমি ফেরতসহ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং কঠোর শাস্তি চান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মো. আবদুর রহমান বলেন,
“একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমাকে হয়রানি করার জন্য থানায় ও আদালতে অভিযোগ দিচ্ছে। এখানে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সকল জমি আমার এবং জমিদাতাদের। কারও জমি দখল করা হয়নি। যদি মাপজোখের পর কেউ জমি পেয়ে থাকে, তাহলে আমি সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দেব।”
বেতন-ভাতা বন্ধ ও অন্যান্য অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন,
“সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমার একটি মামলা চলমান রয়েছে। বিষয়টি বিচারাধীন।”
মির্জাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম বলেন,
“আদালতের মামলা এবং থানায় দেওয়া অভিযোগগুলো তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
একাধিক গুরুতর অভিযোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের নাম জড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।