বুধবার, জুলাই ১, ২০২৬

বাজেটে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন বরাদ্দ না থাকায় ক্ষোভ

ফাহিম ফিরোজ : জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দক্ষিণাঞ্চলের বহুল প্রত্যাশিত ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর জন্য দৃশ্যমান কোনো নতুন বরাদ্দ বা বিশেষ উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বরিশাল বিভাগের সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন পেশাজীবীরা।

তাদের অভিযোগ, স্বাধীনতার পর থেকে দক্ষিণাঞ্চল ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব থাকা সত্ত্বেও এবারও বাজেটে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবিগুলোর প্রতিফলন ঘটেনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ, বরিশালের সঙ্গে দেশের রেল যোগাযোগ স্থাপন, বরিশাল-ভোলা সেতু নির্মাণ, পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার আন্তর্জাতিক মানের আধুনিকায়ন, পায়রা সমুদ্রবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ কার্যকর বন্দরে উন্নীত করা, উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন এবং উচ্চশিক্ষা ও আবাসন খাতে নতুন প্রকল্প গ্রহণ।

কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে এসব বিষয়ে নতুন কোনো বড় ঘোষণা না থাকায় হতাশা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান জাতীয় সংসদে দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের মধ্যে ১৯টি আসনে বিএনপি বিজয়ী হয়েছে। এছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনে দক্ষিণাঞ্চল থেকে আরও তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সব মিলিয়ে ২৪ জন সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদে এ অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। শুধু সংসদ সদস্যই নয়, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করছেন।

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন স্বপন। নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান এবং গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ভান্ডারিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহমেদ সোহেল মঞ্জু।

এছাড়া কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন এমপি, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী মর্যাদা) ড. এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার সহ দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক প্রভাবশালী নেতা জাতীয় সংসস ও সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

এত রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিনিধিত্ব থাকা সত্ত্বেও বাজেটে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য দৃশ্যমান কোনো নতুন উদ্যোগ না থাকায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক ভূইয়া বলেন, “দক্ষিণাঞ্চল সব সময়ই সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চল। কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও সমুদ্র অর্থনীতির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে এখানে। কিন্তু অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এ অঞ্চলের মানুষ এখনো কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। রাজনৈতিকভাবে আমাদের প্রতিনিধিত্ব অনেক বেড়েছে। তাই মানুষ আশা করেছিল এবারের বাজেটে দক্ষিণাঞ্চলের জন্য বিশেষ বরাদ্দ থাকবে। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায়নি। এটি এ অঞ্চলের মানুষের জন্য হতাশাজনক।”

বরিশাল সদর উপজেলার বাসিন্দা মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। এখন প্রয়োজন ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা। এতে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়ন ব্যাপকভাবে এগিয়ে যাবে। একই সঙ্গে বরিশালে রেল সংযোগ স্থাপন করা হলে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। কিন্তু এসব প্রকল্পের বিষয়ে বাজেটে স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় আমরা হতাশ।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর বরিশাল মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, “দক্ষিণাঞ্চল দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পায়রা বন্দর, কুয়াকাটা, সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকা, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে এ অঞ্চল বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতাদের উচিত ছিল বাজেটে দক্ষিণাঞ্চলের জন্য বিশেষ উন্নয়ন প্যাকেজ নিশ্চিত করা। আমরা আশা করি সংসদে বাজেট আলোচনার সময় এ বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।”

ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ, নদীভাঙন রোধে দক্ষিণাঞ্চলের সব জেলায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ভোলার অব্যবহৃত গ্যাস দিয়ে ভোলা-বরিশাল-পটুয়াখালী অঞ্চলে শিল্পকারখানা গড়ে তোলা, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা, কুয়াকাটায় বিমানবন্দর ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন এবং ভাঙ্গা-কুয়াকাটা রেললাইন নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনদাবিগুলো বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি এই অঞ্চলের মানুষদের।

স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীরা মনে করেন, দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তারা আগামীতে বাজেট সংশোধন কিংবা সম্পূরক উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, যোগাযোগ অবকাঠামো, বন্দর উন্নয়ন, পর্যটন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে দক্ষিণাঞ্চল দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেই লক্ষ্যে প্রয়োজন কার্যকর রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং বাজেটে বাস্তবসম্মত বরাদ্দ। বর্তমানে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, জাতীয় সংসদে তাদের শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব উন্নয়ন বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে এ অঞ্চলকে নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে।

আরো পড়ুন

পরীক্ষা দিতে গিয়ে জীবন দিল শিক্ষার্থী; লাশ কাঁধে নিয়ে সহপাঠীদের বিক্ষোভ

চরফ্যাশন প্রতিনিধি: ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার শশীভূষণ থানার চেয়ারম্যান-শশীভূষণ আঞ্চলিক সড়কে বালুভর্তি ট্রলির ধাক্কায় লিয়া আক্তার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *