ফাহিম ফিরোজ : মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবনই ধ্বংস করে না, এটি একটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্যও ভয়াবহ হুমকি। মাদকের ছোবলে বিপথগামী হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম, বাড়ছে অপরাধ, পারিবারিক কলহ, চুরি, ছিনতাই, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও সামাজিক অবক্ষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের ভয়াবহ বিস্তার একটি জাতির মানবসম্পদকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বরিশালে মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত দেড় বছরে বরিশাল অঞ্চলে মোট ২ হাজার ৫৮৯টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৮২১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৮২১ মামলায় মোট ৯১৭ জনেরও বেশি মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য, নগদ অর্থ ও বিভিন্ন যানবাহন জব্দ করা হয়েছে।
২০২৫ সালে ১ হাজার ৯০৭টি অভিযানে ৬৪১টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে নিয়মিত মামলা ১৭৬টি এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ৪৬৫টি মামলা পরিচালিত হয়। এসব মামলায় ৭০৪ জনকে আসামি করা হয়। একই সময়ে উদ্ধার করা হয় ৭১ কেজি ৭২৩ গ্রাম গাঁজা, ১৫ হাজার ৪৬৫ পিস ইয়াবা, ৯৮ বোতল ফেন্সিডিল, ৮২৫ অ্যাম্পুল মরফিন ইনজেকশন, ৩৩০ অ্যাম্পুল ইজিয়াম ইনজেকশন, ৩০২ অ্যাম্পুল ফেনারেক্স ইনজেকশন, ২ অ্যাম্পুল ন্যালবান ইনজেকশন, ২ ক্যান বিয়ার এবং ২ বোতল বিদেশি মদ। এছাড়া মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭১২ টাকা, একটি অটোরিকশা, একটি মোটরসাইকেল ও দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাসেই ৬৮২টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময়ে ১৮০টি মামলায় ২১৩ জনকে আসামি করা হয়। উদ্ধার করা হয় ৩৩ কেজি ৭৪০ গ্রাম গাঁজা, ৩ হাজার ৬১ পিস ইয়াবা, ৭ গ্রাম ইয়াবার গুঁড়া, ২১৬ অ্যাম্পুল মরফিন ইনজেকশন, ৪০ বোতল ফেন্সিডিল, ১৫৫ অ্যাম্পুল ইজিয়াম ইনজেকশন, ১০৫ অ্যাম্পুল সিডিল ইনজেকশন, ২৪০ অ্যাম্পুল ফেনারেক্স ইনজেকশন, ৩ ক্যান বিয়ার এবং ১ বোতল বিদেশি মদ। এছাড়া ১৯ লাখ ৪২ হাজার ৯৫২ টাকা, চারটি মোবাইল ফোন এবং একটি প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে ইয়াবা, গাঁজা ও বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় ইনজেকশনের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরদের একটি অংশ সহজে অর্থ উপার্জনের আশায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। আবার অনেকেই কৌতূহল, বন্ধুদের প্ররোচনা কিংবা হতাশা থেকে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে।
একবার আসক্ত হলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, মাদকাসক্তি মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে ধ্বংস করে দেয়। দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণের ফলে স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, লিভারের ক্ষতি এবং আত্মবিধ্বংসী আচরণের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।একই সঙ্গে পরিবারে অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বরিশালের উপ-পরিচালক মো. তানভীর হোসেন খান বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদক কারবারিদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং মাদক পাচার ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং ধর্মীয় নেতাদেরও সচেতনতা বৃদ্ধিতে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হলে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও আরও জোরদার করা হবে।”
সচেতন মহলের অভিমত, মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যেমন প্রয়োজন, তেমনি পরিবার ও সমাজের নজরদারিও জরুরি। তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ইতিবাচক সামাজিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে পারলে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে তাদের অনেকাংশে দূরে রাখা সম্ভব হবে।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।