সোমবার, জুলাই ২০, ২০২৬

বন্যায় ক্ষয়-ক্ষতি হ্রাসে প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা

মোঃ হাসনাইন : বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব-দ্বীপ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনাসহ অসংখ্য নদ-নদী এ দেশের বুক চিরে প্রবাহিত হয়েছে। নদীকেন্দ্রিক এই ভূ-প্রকৃতি যেমন দেশের কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য আশীর্বাদ, তেমনি বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও অন্যতম কারণ। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যাকবলিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। প্রাকৃতিক কারণে বন্যা পুরোপুরি রোধ করা না গেলেও দক্ষ, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর ক্ষয়-ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

একটি নদীমাতৃক ও বদ্বীপ অঞ্চল হওয়ায় দেশের ইতিহাসে ১৯৭৪, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪, ২০২২ ও ২০২৪ সালে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮৮ সালের বন্যায় দেশের প্রায় ৬০% এলাকা এবং ১৯৯৮ সালের বন্যায় দেশের দুই-তৃতীয়াংস এলাকা তলিয়ে গিয়েছিল। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে এখন চলমান অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় এ পর্যন্ত ৫৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ১০ লাখ ২২ হাজারেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জসহ ৭টি জেলার ৫৯ টি ঊপজেলা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া মাছ ও গবাদিপশুতে ২৭৭ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।

আমাদের দেশে এই বন্যা হওয়ার পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ রয়েছে। বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, নদীর নাব্যতা হ্রাস, নদীভাঙন এবং জোয়ারের প্রভাব বন্যা সৃষ্টির প্রধান প্রাকৃ্তকি কারণ। অন্যদিকে খাল-বিল ও জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবৈধ দখল, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ বন্যার তীব্রতা বাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে অন্যতম মানবসৃষ্ট কারণ। তবে সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও চরম আবহাওয়া বন্যার ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে।

বন্যার প্রভাব শুধু সাময়িক নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদেও সমাজ ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মানুষের প্রাণহানিসহ গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির মৃত্যু ঘটে।অনেক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, রাস্তা, সেতু, কালভার্ট ও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয় ফলে বন্যা পরবর্তী ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ে।এছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, জেলে, কৃষক ও দিনমজুরদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। এসব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে বন্যা অনেক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বন্যা মোকাবিলায় দক্ষ ব্যবস্থাপনা বলতে দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি, দুর্যোগ চলাকালে কার্যকর ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন—এই তিনটি ধাপকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করাকে বোঝায়।
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বন্যার পূর্বাভাস প্রদান করা গেলে মানুষ আগেই নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারে। মোবাইল ফোনে বার্তা, টেলিভিশন, রেডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দিলে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। নদীর তীর সংরক্ষণ, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নিয়মিত সংস্কার, নদী ও খাল খনন এবং উন্নত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা বন্যার ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শহর ও গ্রামে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে।

বন্যার সময় দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নৌযান, স্পিডবোট, লাইফ জ্যাকেট, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং চিকিৎসাসেবা দ্রুত পৌঁছে দিতে পারলে মানুষের দুর্ভোগ অনেক কমে যায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, রেড ক্রিসেন্ট এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বন্যার পরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকদের বীজ, সার ও কৃষিঋণ প্রদান, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্র্নিমাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দ্রুত চালু করা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পুনর্বাসনের কার্যক্রম যত দ্রুত ও সুশৃঙ্খল হবে, মানুষ তত দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জনগণের সচেতনতা সবচেয়ে বড় শক্তি। আগাম সতর্কবার্তা গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করা, প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধ মজুত রাখা, বিদ্যুৎ সংযোগ নিরাপদ রাখা, শিশু, নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের আগে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং গুজবে কান না দেওয়া—এসব বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে হবে। বিদ্যালয়, কলেজ, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে নিয়মিত দুর্যোগবিষয়ক প্রশিক্ষণ ও মহড়ার আয়োজন করতে হবে।

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, ড্রোন, জিআইএস এবং রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বন্যার ঝুঁকি নির্ণয় ও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ক্ষয়-ক্ষতির সঠিক হিসাব এবং কার্যকর উদ্ধার পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব। বাংলাদেশেও এসব প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।

সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নদী খনন, জলাভূমি সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার, বন্যা-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। নদী ও খাল দখল বা দূষণ না করা, পরিবেশ সংরক্ষণ, গাছ লাগানো, সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা এবং দুর্যোগের সময় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা—এসব উদ্যোগ বন্যা মোকাবিলাকে আরও কার্যকর করে তোলে।

ক্ষয়-ক্ষতি লাঘবে দক্ষতার সাথে বন্যা মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরামের’ নির্দেশনা অনুসরণ করা যেতে পারে-

বন্যা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি:
১। বাড়ির ভিটা স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে বেশি উঁচু করে নির্মাণ করতে হবে, যাতে বন্যার পানি ঘরে না উঠে।
২। টিউবওয়েল উঁচু স্থানে স্থাপন করতে হবে, যাতে বন্যার পানিতে ডুবে না যায।
৩। নতুন জেগে উঠা চরে বসতবাড়ি নির্মাণ না করা ভালো, কেননা সেখানে বন্যা হলে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়।
৪। বাড়ির আশেপাশে কোথায় আশ্রয়কেন্দ্র আছে এবং কোথায় মালমাল রাখবেন তা আগে থেকে চিহ্নিত করে রাখতে হবে, যাতে বন্যার পানি বেড়ে গেলে মালামাল সহজে স্থানান্তর করা যায়।
৫। গবাদিপশুসহ মূল্যবান সম্পদ রক্ষায় আগে থেকে উঁচু জায়গা কিংবা দুরবর্তী শুকনো জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৬। বন্যার মাস শুরুর আগে শুকনো খাবার, ফসলের বীজসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মজুদ রাখতে হবে।
৭। সাপের কামড় থেকে বাঁচতে নিয়মিত বাড়িঘর এবং আঙ্গিনা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও শুষ্ক রাখার পাশাপাশি কার্বলিক এসিড রাখা যেতে পারে যা সাপের উপদ্রব কমায়। কাছাকাছি কোন হাসপাতালে এন্টিভেনম আছে তা আগেই জেনে রাখতে হবে।
৮। ছোট শিশুদের সাতাঁর শেখাতে হবে এবং বাড়ির চারপাশে বেড়া দিয়ে শিশুদের সুরক্ষা ঢাল তৈরি করা যেতে পারে।
৯। এলাকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি বা স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে এবং তাদের পরামর্শ গ্রহন করতে হবে।
১০। বাড়ির আশেপাশে ঢোল কলমি, কলাগাছসহ বেশি করে অন্যান্য ফলজ গাছ লাগান, যাতে বন্যার পানির তোড়ে বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
বন্যাকালীন করণীয়:
১। নিজ বাড়িতে অবস্থান সম্ভব না হলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিন।
২। নিরাপত্তার জন্য শিশু আর কিশোরীদের দূরে আত্মীয়দের বাসায় না পাঠানো উত্তম।
৩। বন্যার সময় নিরাপদ পানির জন্য পানিতে বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বা ফিটকিরি ব্যবহার করতে হবে।
৪। ঘরে কার্বলিক এসিডের বোতলের ছিপি খুলে রাখতে হবে, এতে সাপ ঘরে ঢুকবে না।
বন্যা পরবর্তী করণীয়:
৫। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে নিজ বাসস্থানে ফিরে যেতে হবে, ঘরবাড়ি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বসবাসের উপযোগী করে তুলতে হবে। বাড়ির চারপাশ দ্রুত পরিষ্কার করে কৃষি কর্মীদের সাথে আলেচনা করে গাছ ও সবজি চাষ শুরু করা যেতে পারে।
৬। বন্যার পরপরই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় , তাই নিয়মিত উপজেলা, জেলা ও নিকতস্থ স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রেখে তাদের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
৭। বীজ, চারা ও ফসলের চাষ শুরুর জন্য কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
৮। ঘরবাড়ি পুননির্মাণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করুন।
বন্যা বাংলাদেশের একটি বাস্তবতা। তবে দক্ষ পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই দুর্যোগের ক্ষয়-ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একটি দুর্যোগ-সহনশীল, নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। তাহলেই মানুষের জীবন, সম্পদ ও অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রেখে দেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, বরিশাল।

আরো পড়ুন

এই বাংলাদেশ দেখার জন্য বুলেটের সামনে দাঁড়াইনি-শায়খে চরমোনাই

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশালে ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশ-এর ১০ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সমাবেশ উদযাপিত। ২০ জুলাই সোমবার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *