নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে বরিশাল নগরীর সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ সংলগ্ন চৌমাথায় পুলিশের ৫৬ টি স্প্রিন্টার বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হন রাইয়ান আহমেদ রায়হান। তার জুলাইযোদ্ধা স্বাস্থ্য কার্ড কেস আইডি: ৩৪২৫০। সেদিনের ঘটনা মনে পরলে এখনো আঁতকে ওঠেন তিনি।
৪ আগস্ট সকাল ১১ টায় বরিশাল বিএম কলেজ থেকে মিছিল নিয়ে নথুল্লাবাদ
কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান নেন রায়হান, হাজার হাজার ছাত্র জনতার আন্দোলনে
উত্তাল ছিলো পুরো এলাকা। দুপুর একটা পর্যন্ত তারা সেখানেই অবস্থান করেন এবং
স্লোগান দিতে থাকেন। পরবর্তীতে দুপুর দেড়টার দিকে সাবেক পানি সম্পদ
প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের বাসার সামনে থেকে শুরু করে পুলিশ বরিশালের
চৌমাথা পর্যন্ত গুলি ছুড়তে থাকে।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে রাইয়ান আহমেদ রায়হান বলেন, সেদিন পুলিশ এবং
ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসী বাহিনীর সাথে আমাদের ৩-৪ ঘন্টা টানা ধাওয়া
পাল্টা ধাওয়া হয়। তারা টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করতে থাকে। এসময় তিন
থেকে চারবার টিয়ার গ্যাস আমার নাকে মুখে চোখে ঢুকে যায়, প্রত্যেকবারই
আগুন এর কাছে গিয়ে তাপ নিয়ে ঠিক হয়ে যেতাম। কিন্তু একবার এমন অবস্থা
হলো- দেখলাম যে আর নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নিতে পারছিনা। ভাবছিলাম হয়তো এটাই
শেষ, হয়তো আর বাঁচতে পারব না।
তিনি বলেন, আন্দোলন চলাকালে পুলিশের সাথেই ছিলো অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ,
যুবলীগ ও শ্রমিকলীগের সন্ত্রাসীরা। তুমুল সংঘর্ষের এক পর্যায়ে অনেক ছাত্র
পিছু হটলেও আমরা ৩০০ থেকে ৪০০ জন সামনাসামনি থেকে যাই। পুলিশ ও
আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা যৌথভাবে আমাদেরকে বরিশাল সরকারি সৈয়দ হাতেম
আলী কলেজ গেট থেকে ধাওয়া দিয়ে চৌমাথায় নিয়ে আসে। আমরা তিনদিকে
বিভক্ত হয়ে যাই। এই দূর্বলতা পেয়ে তারা আবার গুলি বর্ষণ শুরু করে। আমরাও ইট
পাটকেল দিয়ে প্রতিহত করছিলাম। এমন একটা মুহূর্তে আমি নিচ থেকে ইট
উঠিয়ে মারতে যাবো- তখনই কতগুলো বুলেট এসে আমার মাথা থেকে বুক পর্যন্ত
ভেদ করে। ঝাঝড়া হয়ে যাই আমি, সবাই যে যার মতো ছোটাছুটি করে পালাতে
থাকে। আমি আমার মুখে হাত দিয়ে দেখি দুই হাত রক্তে ভরে গেছে। আমার শরীরের
৫৬ টা স্প্রিনটার বুলেট লাগে। যার ৩৩ টাই আমার মুখমণ্ডলে লাগে। একটা গুলি
এসে আমার বাম চোখে ঢুকে যায়। পানি দিয়ে মুখের রক্ত ধুয়ে পরিস্কার করতে
পারলেও পেট এবং বুকের রক্ত বন্ধ করতে পারিনি তখন। এরপর পাশেই কারিগরি প্রশিক্ষণ
কেন্দ্রের জামে মসজিদ চত্বরে ঢুকে পরি। তখন আসর নামাজের জামাত চলছিলো।
আমি সেখানে শুয়ে পড়ি, কিছুক্ষণ পর নামাজ শেষে মুসল্লিরা বের হয়ে আমাকে
ওখানে আহত অবস্থায় দেখেন। তারা আমার রক্ত পড়া বন্ধ করার জন্য অনেক ধরনের চেষ্টা
করতে থাকেন। আমার পকেটে টিস্যু ছিল সে টিস্যু বের করে তারা রক্ত মুছতে
থাকেন কিন্তু টিস্যুগুলো রক্তে ভেসে যায়। পরে তারা অনেক কষ্টে একটি রিকশা
ডাকেন। কারণ বাহিরে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অপেক্ষা করছিলো। এরপর আমার এক
বন্ধুকে ফোন দেয়া হয়। ওরা সেই রিক্সায় করে আমাকে চৌমাথায় টেক্সটাইল
ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অবস্থানরত সেনাবাহিনীর সামনে নিয়ে যায়। তারা আমাকে
দেখে বলেন যে, এভাবেতো পুলিশের গুলি করার কথা না। আমার বাবা একজন জেল
পুলিশ। সেটা দেখে একজন স্ট্যাটাস দিয়ে দেন ‘পুলিশের ছেলেকে পুলিশের গুলি’ ।
আহত অবস্থায় চিকিৎসা নেয়া প্রসঙ্গে রায়হান বলেন, তখন আহত রোগীতে ভরপুর
ছিলো বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কেউ একজন ডাক্তার এসে
আমার মুখের গুলিগুলো বের করার চেষ্টা করেন। এখানেও একটা ভয় থেকে যায়
হাসপাতালে সন্ত্রাসীরা হামলা করবে কিনা। রাতে হাসপাতালে গেট বন্ধ করে রাখা
হয়। এভাবে একটা নির্ঘুম রাত পার করি অসহ্য যন্ত্রণায়, নিজের কাছে মনে
হচ্ছিলো যে, এরচেয়ে মরে যাওয়াও মনে হয় ভালো ছিল।
পরের দিন আমাকে হাসপাতালের চক্ষু বিভাগ থেকে নাক কান গলা বিভাগে স্থানান্তর
করা হয়। টানা দুইদিন নাক দিয়ে রক্ত পড়ে। এর আগে ৫ই আগস্ট হাসপাতালে থেকে
আমি শুনতে পাই যে শেখ হাসিনার পতন হয়েছে এবং সে পালিয়ে গেছে। তখন
আমার যে কি খুশি লাগছিলো, শুনে মন চাইছিলো বিজয় মিছিলে নামবো কিন্তু
ওই অবস্থায় তো আসলে সম্ভব তা কখনোই সম্ভব ছিল না।
এরপরে আমি ৮ আগস্ট হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরি। অবস্থার অবনতি হওয়ার
কিছুদিন পর আমি ঢাকায় সেনানিবাসে সিএমএইচে ভর্তি হই। সেখানে
চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ বোধ করি। কিন্তু চোখের এবং মুখের
প্যারালাইজড সমস্যাটা থেকেই যায়। যেটা এখন পর্যন্ত রয়ে গেছে, সমস্যাটার
সমাধান হয়নি। তবুও আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ তায়ালা বাঁচিয়ে রেখেছেন।
রায়হান বলেন, আমি এর আগে আন্দোলনে গেলেও কখনো বাসায় বলে
যাইনি। কিন্তু অসহযোগ আন্দোলনের দিন ৪ঠা আগস্ট আমি বাসায় বলে যাই।
আম্মু এবং আব্বুর কাছ থেকে দোয়া নিয়ে যাই। কারণ আমি বুঝতে
পেরেছিলাম এদিন হয়তো কিছু একটা হবে, হয় বাঁচবো- না হয় মরবো।
এখনো সেই ক্ষত, ব্যাথা নিয়ে, বেঁচে তো আছি। কিছু বুলেট এখনো মাথায়,
বুকে ও পেটে রয়ে গেছে। নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ পাওয়ার অর্জনে আমারও যে
কিছু অবদান আছে, বিষয়টি ভাবতেই ভালো লাগে।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।