নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল নগরীতে সরকারি খাসজমিতে থাকা প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের একটি পুকুর বালু ফেলে ভরাট করে প্লট আকারে বিক্রির প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ৬৯ শতাংশের পুকুরটির মালিকানা নিজেদের দাবি করে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি গত প্রায় ২০ দিন ধরে ভরাটের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে পুকুরটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভরাট হয়ে গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি এই জলাশয় দখলের পেছনে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতারও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। এদিকে পুকুরটি নিজেদের সম্পত্তি দাবি করে ভরাটকারীরা বলছেন, ওয়ারিশ সূত্রে জমিটির মালিকানা পাওয়া গেছে।
নগরীর মুন্সীবাড়ি এলাকায় বীণাপাণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে উত্তরমুখী সড়কের পাশে অবস্থিত পুকুরটি বরিশাল বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতালের একেবারে পাশে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, পুকুরসহ আশপাশের জমি সরকারের মালিকানাধীন। পুকুরটি দখল ও ভরাট বন্ধে কাউনিয়া থানাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, শহরের বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম লিয়ন, ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব বাবুল তালুকদার, স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলমগীর ও রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পুকুরটি ভরাট করা হচ্ছে। তাঁদের পেছনে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে রাকিবুল ইসলাম লিয়ন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ওয়ারিশ সূত্রে ওই জমির মালিক হেলাল আকন ও তাঁর বোন। আমরা চারজন পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে ওই জায়গা বালু ফেলে ভরাট করছি। পরে প্লট আকারে বিক্রির পরিকল্পনা আছে।’ জমির মালিকানা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগও তিনি সঠিক নয় বলে দাবি করেন। পুকুর ভরাটের ঠিকাদার মো. জুয়েল বলেন, সাত লাখ টাকার চুক্তিতে তিনি জায়গাটি বালু দিয়ে ভরাট করছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুন্সীবাড়ির সামনের এই পুকুরটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর কাছে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পুকুর হিসেবেই পরিচিত। মুন্সীবাড়ির প্রবীণ বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘৫০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা জানি, পুকুরটি বক্ষব্যাধি হাসপাতালের। কয়েক দিন আগে শুনেছি, কারা নাকি এটি কিনেছেন।’
হাসপাতালের অফিস সহকারীর দায়িত্বে থাকা ফার্মাসিস্ট আনোয়ারা বেগম বলেন, হাসপাতালের মোট সাত একর ৪১ শতাংশ জমির পর্চা রয়েছে। এর মধ্যে দাগ নম্বর ১০৬৯ ভিটা এবং ১০৭০ ও ১০৭১ পুকুর হিসেবে উল্লেখ আছে। পর্চায় এসব জমির মালিক হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কালেক্টরের নাম রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা কাউনিয়া থানায়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে ঘুরেছি। কিন্তু জমিটি বেহাত হওয়া ঠেকাতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। পুকুরটি ভরাটও বন্ধ করা হচ্ছে না।’
হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা মাসুমা আক্তার বলেন, পুরোনো কর্মচারীরা সবাই জানেন, এটি সরকারি জমি। জলাশয়টি রাতের আঁধারে ভরাট করা হচ্ছে। গত ১৯ জুলাই কাউনিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সিভিল সার্জন, এসিল্যান্ড ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কেও জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এসিল্যান্ড জানিয়েছিলেন, তাঁরা ওই জমির চারপাশে বেড়া দিয়ে দেবেন। কিন্তু সোমবার রাতে গাছপালা কেটে দখলদাররাই সেখানে বেড়া দিয়েছেন। পুলিশের একজন কর্মকর্তা ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে গেলেও কোনো ব্যবস্থা নেননি।’
হাসপাতালসংলগ্ন ৬৯ শতাংশের এই পুকুরটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ভবনের পেছনে হওয়ায় মূল সড়ক থেকে পুকুরটির বড় অংশ দেখা যায় না। এই সুযোগেই দীর্ঘদিন ধরে ভরাটের কাজ চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এদিকে পুকুরটি দখলের সঙ্গে বিএনপির নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়ে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক বলেন, ‘এ ঘটনায় বিএনপির কোনো নেতা জড়িত নন। আর কাগজপত্র জাল-জালিয়াতি হয়েছে কিনা, তা ভূমি অফিস দেখবে।’
সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজহারুল ইসলাম বলেন, বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পাশের পুকুরটি খাস খতিয়ানের জমি। প্রায় ১৫ বছর আগে জরিপে বিএস রেকর্ডে এটি ব্যক্তি মালিকানার হিসেবে দেখানো হয়। তাঁর ধারণা, এ ঘটনায় বড় অঙ্কের লেনদেন হয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘একটি চক্র পুকুরটি দখলে নিয়েছে। খাসজমি কীভাবে তাদের কাছে গেল, তা চ্যালেঞ্জ করতে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করব।’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের উদাসীনতা রয়েছে। মামলা করে জমি উদ্ধার করতে দীর্ঘ বছর লাগবে। সরকারি সম্পত্তি বেহাত ঠেকাতে আমার যা যা করার দরকার, আমি করব।’
জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার বৃহস্পতিবার বিকেলে বলেন, তিনি বিষয়টি জানেন না। তবে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
সরকারি খাসজমির ওপর থাকা জলাশয়টি ভরাটের কাজ দ্রুত বন্ধ করে জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ এবং জালিয়াতির অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে সরকারি সম্পত্তি দখলের সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতার সম্পৃক্ততা থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।