শহীদদের রক্তে বদলেছে দেশ, থামেনি স্বজনদের কান্না
মুঃ মাকসুদুর রহমান ভোলা প্রতিনিধি
ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের অপেক্ষায় শহীদ পরিবারগুলো
একটি ছবি। বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছেন এক মা। ছবির মানুষটি আর কোনোদিন ফিরবেন না—তবুও মায়ের চোখ যেন সেই ফেরার পথেই তাকিয়ে আছে।
চরফ্যাশন উপজেলার নুরাবাদ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চর তোফাজ্জল গ্রামের ইয়ানুর বেগমের জীবন এখন এমনই এক অপেক্ষা আর কান্নার গল্প। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো ১৬ বছরের কিশোর ওমর ফারুকের মা তিনি।
তিন সন্তানের মধ্যে ওমর ফারুক ছিলেন দ্বিতীয়। পরিবারের অভাব ঘোচাতে প্রায় পাঁচ বছর আগে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। নিজের ভবিষ্যৎ আর পরিবারের স্বপ্ন পূরণের জন্যই ছিল তার সেই সংগ্রাম।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সবকিছু বদলে যায়।
আন্দোলনের উত্তাল সময়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাজপথে অংশ নিয়েছিলেন কিশোর ওমর ফারুক। মোহাম্মদপুরের ওভারব্রিজ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান তিনি।
সন্তান হারানোর সেই ক্ষত আজও শুকায়নি ইয়ানুর বেগমের। ছেলের ছবি বুকে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সময় পেরিয়েছে, কিন্তু মায়ের কাছে যেন থেমে আছে সেই দিনটি।
ইয়ানুর বেগমের কণ্ঠে—
সন্তান হারানোর কষ্ট, ছেলের স্মৃতি আর তাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি।
শুধু ইয়ানুর বেগম নন—চরফ্যাশনের আরও বহু শহীদ পরিবারের গল্প যেন একই সুতোয় বাঁধা।
জাহানপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সেলিম মাঝির পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন মো. রাব্বি। মাত্র ২০ বছর বয়সে চার মাস আগে ধুমধাম করে তার বিয়ে হয়েছিল। নতুন সংসার, নতুন স্বপ্ন—সবকিছুই তখন সবে শুরু।
বিয়ের দুই মাস পর বড় ভাইয়ের সঙ্গে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় রাজমিস্ত্রির কাজে যোগ দেন রাব্বি।
নতুন বউকে কথা দিয়েছিলেন—ফিরে এসে তার জন্য নতুন শাড়ি নিয়ে আসবেন।
কিন্তু সেই ফেরা আর হয়নি।
গুলিতে প্রাণ হারান রাব্বি। স্বামী হারিয়ে শোকে কাতর তার স্ত্রী। আর সন্তান হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়েছেন মা জয়তুন বেগম।
জয়তুন বেগমের কণ্ঠে—
সন্তান হারানোর বেদনা আর রাব্বির স্মৃতির কথা।এভাবেই চরফ্যাশনের শহীদ পরিবারগুলোর ঘরে আজও বয়ে চলছে শোকের স্রোত।
কেউ হারিয়েছেন সন্তান, কেউ স্বামী, কেউ ভাই। কারও ঘরে পড়ে আছে প্রিয়জনের ব্যবহৃত পোশাক, কারও কাছে স্মৃতি হয়ে আছে একটি ছবি, আবার কারও জীবনে থেমে গেছে ভবিষ্যতের সব পরিকল্পনা।
শুধু প্রিয়জন হারানোর শোক নয়, শহীদ পরিবারের স্বজনদের মধ্যে রয়েছে আরেকটি আক্ষেপ—যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে তাদের স্বজনরা জীবন দিয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ কি সত্যিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?
শহীদ সিয়ামের ভাইয়ের ভাষায়, শহীদদের আত্মত্যাগের মূল আকাঙ্ক্ষা এখনো পূরণ হয়নি।
শহীদ সিয়ামের ভাই বলেন—
“শহীদরা তাদের রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিল, তা এখনো হয়নি। আমাদের প্রত্যাশা—শহীদদের হত্যার সুষ্ঠু বিচার।”
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা আফরোজ জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভোলার মধ্যে চরফ্যাশন উপজেলার ১২ জন শহীদ হয়েছেন।
তিনি বলেন, স্বজন হারানো পরিবারগুলোর ক্ষতি কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। তারপরও সরকারের পক্ষ থেকে শহীদ পরিবারগুলোর পাশে থাকার চেষ্টা করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি।
তবে সহায়তা দিয়ে কি আর পূরণ হয় একজন মায়ের বুকের শূন্যতা?
ফিরে আসে না সেই সন্তান।
ফিরে আসে না সেই স্বামী।
ফিরে আসে না সেই ভাই।
সময় এগিয়ে যায়। শহর বদলায়, মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু শহীদ পরিবারের ঘরে কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।