জাকির ফরাজীঃ পিরোজপুরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। জেলার ৯৮৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৬৫টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে এসব বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়েই চলছে প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম। দীর্ঘদিন ধরে পদগুলো শূন্য থাকায় একদিকে যেমন স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকরা।
পিরোজপুর পৌরসভার মধ্য পিরোজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, একজন শিক্ষক টানা চতুর্থ ক্লাস নিচ্ছেন। বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় তাকে অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। এর মধ্যে আবার একজন সহকারী শিক্ষক চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকায় তার ক্লাসও নিতে হচ্ছে তাকে।
ফলে একদিকে নিয়মিত পাঠদান, অন্যদিকে সহকর্মীর অতিরিক্ত ক্লাস এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব—সব মিলিয়ে বাড়ছে কাজের চাপ।
একজন শিক্ষক বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে শুধু শিক্ষকরাই সমস্যায় পড়ছেন না, শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিকের ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি তাকে অন্য শ্রেণির ক্লাসও নিতে হচ্ছে। ফলে দুই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের যথাযথ সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
অপর এক শিক্ষক জানান, বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য রয়েছে। একই সময়ে একই শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় যেমন সমস্যা হচ্ছে, তেমনি শিক্ষকদেরও পাঠদান পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আরেক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে না থাকায় একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাকে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজও করতে হয়। বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে তাকে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকতে হলে তার নির্ধারিত ক্লাসও অন্য শিক্ষকদের নিতে হচ্ছে। দ্রুত প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণের দাবি জানান তিনি।
একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, প্রতিদিন তাকে ছয়টি ক্লাস নিতে হয়। এসব ক্লাস সামলানোর পাশাপাশি দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজ করাটা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের গুণগত মানোন্নয়নে তিনি যতটা সময় ও মনোযোগ দিতে চান, তা সবসময় সম্ভব হয় না। শূন্য পদগুলো পূরণ হলে পাঠদানের মান আরও উন্নত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে মোট ৯৮৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদও ৯৮৯টি। এর মধ্যে ৫৬৫টি পদ বর্তমানে শূন্য। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, ২৫৮টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক থেকে চলতি দায়িত্বে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এদিকে জেলায় সহকারী শিক্ষকেরও ৫৬২টি পদ শূন্য রয়েছে। ফলে প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি সহকারী শিক্ষক সংকটও বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রমে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
পিরোজপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোল্লা বখতিয়ার রহমান বলেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং ২৪৫ জন শিক্ষক সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। বর্তমানে তাদের পুলিশ ভেরিফিকেশন ও এনএসআই রিপোর্টের কার্যক্রম চলছে। এসব রিপোর্ট পাওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, শূন্য পদ থাকার কারণে পাঠদান কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে কর্মরত শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে।
শিক্ষক সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে শিক্ষকদের। এতে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদানেও তৈরি হচ্ছে চাপ। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও শিক্ষক-স্বল্প বিদ্যালয়গুলোতে এ সংকটের প্রভাব বেশি পড়ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করতে বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করা জরুরি। দ্রুত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ করা না হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুর্বল শিক্ষার্থীরা। এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষার সামগ্রিক মানের ওপর।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।