নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল বিভাগের ৯টি কলেজে পর্যাপ্ত আসন থাকলেও কোনো শিক্ষার্থীই সেগুলোতে ভর্তির জন্য আবেদন করেনি। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাতে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে অনলাইনে ভর্তির প্রথম ধাপের ফল প্রকাশের পর এমন চিত্র দেখা গেছে। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীন ওই ৯টি কলেজ কোনো ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীর পছন্দের তালিকাতেই ওঠেনি।
কলেজগুলো হলো কদভানু মেমোরিয়াল সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কাঠালিয়া সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পানপট্টি কলেজ, ই জি এস শিখানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পূর্ব জালাবাড়ি আদর্শ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেহাঙ্গল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পাজাখালি কলেজ, বরগুনা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ ও আলিমাবাদ সরকারি কলেজ।
এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা মিলিয়ে আসনসংখ্যা কয়েক শ। ভর্তি প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি কেউ আগ্রহ দেখায়নি। ফলে প্রতিষ্ঠান ৯টির শিক্ষার মান, অবস্থান, শিক্ষকসংখ্যা ও অবকাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এবার একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রথম ধাপে সারাদেশে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৩০ জন শিক্ষার্থী আবেদন করেন। তারা বিভিন্ন কলেজে ৫৬ লাখ ১৫ হাজার ৫২৫টি পছন্দ দিয়েছেন। একজন শিক্ষার্থী সর্বনিম্ন পাঁচটি ও সর্বোচ্চ ১০টি কলেজ পছন্দের সুযোগ পান। প্রথম ধাপে ৯ লাখ ৮০ হাজার ৮১৫ জন শিক্ষার্থী কোনো না কোনো কলেজে আসন পেয়েছেন।
রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতায় গড়া কলেজ:
আলোচিত নয়টি কলেজের একটি আলিমাবাদ সরকারি কলেজ। সাত খুনের মামলার আসামি ও দীর্ঘদিন কারাভোগ করা আনোয়ারুল ইসলাম বাবুল জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।
সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে মেঘনা তীরে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এক চরাঞ্চলে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন আনোয়ারুল ইসলাম; দ্রুত এমপিওভুক্তির আশায় যার নাম দেওয়া হয় ‘দেশরত্ন শেখ হাসিনা মহাবিদ্যালয়’। পাঠদান শুরু হয় দূরের পাতাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভবনে। এক দশক ধরে সেখানেই কলেজের পাঠদান চলছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সঞ্জয় কুমার বড়াল বলেন, স্থানীয়দের সহযোগিতায় স্কুলে কলেজপর্যায়ের পাঠদান শুরু হয়েছিল। শুরুর দিকে ভর্তি ও ফলাফল আশাব্যঞ্জক ছিল। তবে হঠাৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত চার বছর ধরে কলেজপর্যায়ের ভর্তিসহ সব কার্যক্রম বন্ধ।
কলেজটি পরে সরকারীকরণ করা হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন আনোয়ারুল ইসলাম নিজেই। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আত্মগোপনে চলে যান তিনি। পরে গত বছরের ১১ মার্চ তাঁকে অবসরে পাঠানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির অর্ধেক শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী গত আট মাস ধরে লাপাত্তা। তারা সবাই পঙ্কজ নাথের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর কলেজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় আলিমাবাদ সরকারি কলেজ। তিন বিভাগের মধ্যে বিজ্ঞান বাদে বাকি দুটিতে বর্তমানে দ্বাদশ শ্রেণিতে ২৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত; যদিও কলেজটির আসনসংখ্যা ৪৫০।
গ্রামের কলেজগুলোয় সংকট পুরোনো:
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীন কলেজগুলোর শিক্ষার্থী সংকট নতুন কিছু নয়। ২০২২ সালেও বোর্ডের অধীন কলেজগুলোতে প্রায় ২৬ হাজার আসন খালি থাকার তথ্য প্রকাশ হয়েছিল। তখন বোর্ডের ৩২৮টি কলেজে মোট আসন ছিল প্রায় ৮২ হাজার। বিপরীতে ওই বছর এসএসসি পাস করে ৬৬ হাজার ৯৪৯ জন শিক্ষার্থী।
সে বছর বোর্ডের কলেজ শাখা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, যেসব কলেজে ভর্তি সন্তোষজনক নয়, তাদের পাঠদানের অনুমতি বাতিল করা হতে পারে। রাজনৈতিক বিবেচনায় বা শিক্ষক নিয়োগের উদ্দেশ্যে পাঠদানের অনুমতি নেওয়া প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলায় ১৯৫৩ সালের ২ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত পূর্ব জালাবাড়ি আদর্শ হাই স্কুল পর্যায়ক্রমে কলেজে উন্নীত হয়। তবে এবার এই প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তির আগ্রহ দেখায়নি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সঞ্জয় কুমার বড়াল বলেন, স্থানীয়দের সহযোগিতায় স্কুলে কলেজপর্যায়ের পাঠদান শুরু হয়েছিল। শুরুর দিকে ভর্তি ও ফলাফল আশাব্যঞ্জক ছিল। তবে হঠাৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত চার বছর ধরে কলেজপর্যায়ের ভর্তিসহ সব কার্যক্রম বন্ধ। বিষয়টি কলেজ পরিদর্শককে লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল বলে জানান সঞ্জয় কুমার। কলেজটির নাম ভর্তি আবেদনের তালিকায় থাকা উচিত নয় বলেও মনে করেন তিনি।
পটুয়াখালীর পানপট্টি কলেজ ও স্বরূপকাঠীর সেহাঙ্গল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তাদের পুরোনো একাডেমিক কার্যক্রমের নথিও রয়েছে। ২০১৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় সেহাঙ্গল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৫৩ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করার কথা সে সময়ের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে এবার কোনো শিক্ষার্থী কেন পছন্দের তালিকায় রাখল না—জানতে চাইলে এর প্রধান মনিরুজ্জামান মুঠোফোনে বলেন, শিক্ষার্থী ও আর্থিক সংকটে কলেজের কার্যক্রম চার বছর ধরে বন্ধ। তারপরও প্রতিষ্ঠানের নাম কেন ভর্তির সম্ভাব্য তালিকায় উঠে এল, তা বোর্ড কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে। তিনি বলেন, সেহাঙ্গল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে রাজবাড়ী এলাকায় একটি কলেজ রয়েছে। তবে সেখানে যেতে শিক্ষার্থীদের সন্ধ্যা নদী পার হতে হয়। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য প্রতিদিন নদী পার হয়ে কলেজে যাওয়া কষ্টকর। তাই অনেকে স্বরূপকাঠি শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হচ্ছে।
বরগুনা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের পরিচালক শরীফ খায়রুল আহসান বলেন, কলেজটি এতদিন পার্টনারশিপে পরিচালিত হয়ে আসছিল। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে গত দুই বছর ধরে এর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ। এ বছর কার্যক্রম আবার চালুর লক্ষ্যে কলেজটিকে ভর্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও কোনো শিক্ষার্থী আবেদন করেনি।
কী বলছে শিক্ষার্থীরা:
পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার সমুদয়কাঠি ইউনিয়নের সেহাঙ্গল গ্রামে একই মাঠে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে সেহাঙ্গল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ এবং সেহাঙ্গল মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়। এবার সেহাঙ্গল মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করে। তাদের কেউই স্কুলের পাশের কলেজটিতে ভর্তির জন্য পছন্দ দেয়নি। তারা দূরের এক কলেজে ভর্তির ব্যাপারে আগ্রহী। যেমন, ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হালিমা আক্তার ভর্তি হয়েছে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে স্বরূপকাঠি শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজে। বাড়ির কাছের কলেজে ভর্তি না হয়ে এত দূরে কেন—এ প্রশ্নের জবাবে হালিমা বলে, ‘কলেজের কার্যক্রম তো কয়েক বছর ধরে বন্ধ। চালু থাকলে এত কষ্ট করে দূরের কলেজে যেতে হতো না।’
এ বিষয়ে সেহাঙ্গল মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মানিক লাল সরকার বলেন, দুটি প্রতিষ্ঠান একই কম্পাউন্ডে অবস্থিত। আগে মেয়েরা স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে পাশের কলেজে ভর্তি হতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে কলেজটির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের দূরের কলেজে যেতে হচ্ছে। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শাহ শাজেদা বলেন, শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় কোনো কলেজের নাম না থাকা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রতিষ্ঠানটির প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থার গুরুত্বপূর্ণ সংকেতও। এখন সেই সংকেতের কারণ খুঁজে বের করার দায়িত্ব শিক্ষা প্রশাসনের।
তিনি বলেন, সেহাঙ্গল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে রাজবাড়ী এলাকায় একটি কলেজ রয়েছে। তবে সেখানে যেতে শিক্ষার্থীদের সন্ধ্যা নদী পার হতে হয়। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য প্রতিদিন নদী পার হয়ে কলেজে যাওয়া কষ্টকর। তাই অনেকে স্বরূপকাঠি শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হচ্ছে।
বোর্ড ও শিক্ষাবিদের প্রতিক্রিয়া:
প্রথম ধাপে পছন্দ না পড়ার অর্থ এই নয় যে, এসব কলেজে এ বছর কোনো শিক্ষার্থীই ভর্তি হবে না। পরবর্তী ধাপে শিক্ষার্থীরা নতুন করে আবেদন ও পছন্দক্রম দিতে পারবে। শেষ পর্যন্ত কতজন ভর্তি হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মো. জসিম উদ্দিন বলেন, শহরের কলেজগুলোতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। গ্রামের কলেজগুলোর চিত্র তেমন নয়।
তালিকায় থাকা আলিমাবাদ সরকারি কলেজ প্রসঙ্গে এই অধ্যাপক বলেন, ভর্তির কারিগরি বিষয়গুলো দেখভাল করে বুয়েট (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়)। তারাই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবে। বছরের পর বছর কার্যক্রম বন্ধ থাকা একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে তালিকায় এলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু তাহের মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান থেকে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব, জনসংখ্যার অনুপাত এবং অবকাঠামো বিবেচনায় নিয়ে পাঠদানের অনুমতি দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু অতীতে এসব বিষয় যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা না করে অনেক প্রতিষ্ঠানকে পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার্থী না পেয়ে কার্যক্রম প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে কোনো না কোনোভাবে সেগুলো একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য কলেজের তালিকায় চলে আসে।
বোর্ডের পক্ষ থেকে এগুলো ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও সবসময় তা সম্ভব হয় না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের লিখিত নির্দেশ অনুযায়ী অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হয়। বিধি অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত সংখ্যক শিক্ষার্থী না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার কথা নয়। এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শাহ শাজেদা বলেন, শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় কোনো কলেজের নাম না থাকা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রতিষ্ঠানটির প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থার গুরুত্বপূর্ণ সংকেতও। এখন সেই সংকেতের কারণ খুঁজে বের করার দায়িত্ব শিক্ষা প্রশাসনের।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।