শনিবার, নভেম্বর ৭, ২০২৬

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস

এ্যাড. নাজিমউদ্দিন আহমেদ পান্না।।

ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনামলে মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে সিপাহী বিদ্রোহ হয়েছিল। সে বিদ্রোহে জনগণের অংশগ্রহণ ছিলনা। তবে ১৯৭৫ সালের ৭ ই নভেম্বর ঘটেছিল সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানে মূল চালিকা শক্তি ছিল সিপাহী জনতা। এই অভ্যুত্থানের পিছনে অনেকগুলো প্রেরণা কাজ করেছিল । ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রাম। স্বাধীনতাত্তোর সম্প্রসারণবাদ ও আধিপত্যবাদ নিয়ন্ত্রিত এদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের আপাময় জনগনের মধ্যে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের মতো আবেগপূর্ণ বিস্ফোরন ঘটে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং ৭ নভেম্বর পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত সত্য প্রকাশিত হবে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের দুঃখজনক ঘটনাটি ছিল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধের ফল। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে দুটি লবি কাজ করতো। একদিকে তাজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সোভিয়েত-ভারত লবি এবং অন্যদিকে খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে মার্কিন লবি। তাই দেখা যায় শেখ মুজিব হত্যার পর গঠিত মোশতাক সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সকল সদস্যই কোন না কোন সময় শেখ মুজিবের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধকালে অস্থায়ী স্বাধীন বাংলা সরকারের সাথে ভারত সরকার কিছু চুক্তিপত্রে আবদ্ধ হয়। বাংলাদেশে এই চুক্তি ‘দাসত্বমূলক চুক্তি’ হিসেবে পরিচিত। এই চুক্তি বাস্তবায়নে ভারত ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আওয়ামী নেতৃত্বের আয়েশী জীবন ভারতকে আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ দেয়। তাই ভারত দ্বিতীয় ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করে, নাম রাখে জাসদ। ভারতের ধীরে চলো নীতির ফলে খোন্দকার মোশতাকের লবি বিজয়ী হয়। শেখ মুজিবের হত্যা, জেল হত্যা সকলই সুসম্পন্ন করে। এর অর্থ এই নয় যে, ভারত হাত গুটিয়ে বসেছিল। ভারতের আকাক্সক্ষা ছিল সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের। তাই অজুহাত প্রয়োজন। অজুহাত সৃষ্টির দায়িত্ব পেয়েছিল জাসদ। ঢাকাস্থ ভারতীয় রাষ্ট্রদূত সমর সেনকে অপহরণ নাটক মঞ্চস্থ করলো জাসদের গণবাহিনী। অভিনেতারা নবাগত বিধায় তাল গোল পাকিয়ে ফেলে। এই অপহরণ নাটকে অংশগ্রহণ করে কর্নেল (অবঃ) আবু তাহেরের দুই সহোদর ভাই। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে ঘটে গেল জেল হত্যা। ৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগের একটি মিছিল ঢাকার রাজপথে নামে। ওই মিছিলে নেতৃত্ব প্রদান করেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফের মা এবং ছোটভাই কৃষক লীগ নেতা রাশেদ মোশারফ। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীরমধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তারা উপলব্ধি করলো ক্যু-পাল্টা ক্যু-এর মাধ্যমে রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে আসীন খালেদ মোশারফ ভারতের এজেন্ট।
সাধারণ সৈনিকগণ ৪ ও ৫ নভেম্বর ঢাকা অভিমুখী হয়। ৬ নভেম্বর মধ্য রাতে কর্নেল ফারুক-রশিদ গং ব্যাংককের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন । ফারুক রশিদ গং ঢাকা ত্যাগ করায় খন্দকার মোশতাক হন, ঢাল তলোয়ার বিহীন নিধিরাম সর্দার। ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় খালেদ মোশারফের চাপে খন্দকার মোশতাক পদত্যাগে বাধ্য হন এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিচারপতি সায়েম ।

এই পরিস্থিতিতে জাসদ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে সৈনিক সংস্থা গৃহবন্দি জিয়ার ইমেজ ব্যবহার করার চেষ্টা চালায়। অন্যদিকে ফারুক রশিদ গং ঢাকা ত্যাগ করায় তাদের সহযোগী বেঙ্গল ল্যান্সার ও ২ ফিল্ড আর্টিলারী বাহিনী হয় নেতৃত্ব শূন্য। এই নেতৃত্বশূণ্য সৈন্যরা নিজেদের প্রয়োজনে শহীদ জিয়াকে বন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করে। সামরিক অফিসারগণ স্বস্তীর নিঃশ্বাস ফেলে। সামরিক অফিসারগণের একটি আস্থা ছিল জিয়ার প্রতি। সকল গ্রুপই মনে করতো অন্তত জিয়া অহেতুক রক্তপাত ঘটাবে না। ভারতীয় দূত সমর সেনকে অপহরন নাটকের কুশিলবগণ আনেকেই আজ বেঁচে নেই। বেঁচে নেই সেই ভয়াবহ দিনগুলোর উত্থান- পতনের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই। শহীদ জিয়া, কর্নেল তাহের, জাসদ সভাপতি মেজর জলিল, খন্দকার মোশতাক, খালেদ মোশারফ, অপহরণ নাটকের আহতগণকে উদ্ধারকারী মেজর এম এ মঞ্জুর (৮১ সালে চট্টগ্রামে নিহত) সকলেই মরহুম। এ সকল ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট শরীফ নুরুল আম্বিয়া বেঁচে আছেন এবং জাসদ রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট আছেন।

এদিকে ফারুক-রশিদের ত্যাগ করা বাহিনী গোলাগুলি শুরু করলে, জিয়াকে বন্দি রাখার দায়িত্ব পালনকারী সৈন্যরা পলিয়ে যায়। শহীদ জিয়া গৃহবন্দি থেকে মুক্ত হন। অন্যদিকে জাসদের সৈনিক সংস্থা ক্ষমতার লোভে এবং সাধারণ সৈন্যগণ দেশপ্রেমের কারণে খালেদ মোশারফকে হত্যার উদ্দেশ্যে খুঁজতে থাকে। খালেদ মোশারফের অনুসারী কর্নেল শাফায়েত জামিল বিক্ষুব্ধ সিপাহী জনতার তাড়া খেয়ে বঙ্গভবন থেকে পালিয়ে জীবন রক্ষা করেন। পালাতে গিয়ে একটি পা ভেঙ্গে যায়। জাসদ তথা সৈনিক সংস্থা ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে জিয়াকে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সিদ্ধান্তটি গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়।
এমনকি জাসদ তার সহযোগী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেও সিদ্ধান্ত জানায়নি। এ প্রসঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক তাত্ত্বিক নেতা হায়দার আকবর খান রনো বলেন “৭ নভেম্বর বিপ্লব শুরুর পূর্বে সৈনিক সংস্থার সভায় জিয়াকে বিপ্লবী সংস্থার হেড কোয়ার্টারে এনে বন্দি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। জিয়াকে যদি সত্যি সত্যিই সেনানিবাসের বাইরে আনতে পারতো তবে তার ভাগ্যে কি ঘটতো জাসদ নেতাগণই জানেন।”
এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি তার বই লিগ্যাসি অব ব্লাড- এ লিখেছেন “৭ নভেম্বর ভোর ৫.৩০ মিঃ। ইতিমধ্যে অনেক সিনিয়র আর্মি জেনারেল জিয়ার সাথে দেখা করে বিদায় নিয়েছেন। এরই মাঝে চলে আসেন কর্নেল আবু তাহের। জিয়া তাকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং অন্যদের মতো তার সাথে কোলাকুলি করেন। কিছু কথাবার্তার পর তাহের তাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যেতে চাইলে অন্য অফিসারগণ নিরাপত্তার কারণে যেতে বারণ করেন। এতে কর্নেল তাহের রেগে আগুন হয়ে ওঠেন। জিয়াকে রেডিও স্টেশনে না পাঠিয়ে সামরিক অফিসারগণ একটি রেকর্ডিং ইউনিটকে জিয়ার বাসায় নিয়ে আসেন। এভাবে ঐ শুক্রবার সকালে জিয়ার রেকর্ডকৃত অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। প্রতিবেশী দেশের ইন্ধনে জাসদ তখন পরিকল্পনা গ্রহণ করে সকল সামরিক অফিসারগণকে সিপাহী দ্বারা হত্যা করার। শহীদ জিয়ার বুদ্ধিমত্তার কারনে তা হতে পারেনি। সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সেনা প্রধান লেঃ জেনারেল নুরউদ্দিন খান ২০০২ সালের ৫ নভেম্বর সাপ্তাহিক ঊষা পত্রিকার সাথে সাক্ষাৎকালে বলেন, “একটি উগ্রপন্থী গোষ্ঠী সেনাবাহিনীর ক্ষতি করার চেষ্টা করে। দেশপ্রেমিক সেনা সদস্যগণ ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেয়। সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড স্থাপিত হয়। এতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকাই ছিল প্রধান।

উপরের আলোচনায় দেখা যায় কর্নেল তাহের চেয়েছিলেন সেনাবাহিনী ধ্বংস করতে। জিয়া রক্ষা করে। জিয়াকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে সৈনিক-জনতা। এর অন্তরালের কারণ ছিল সৈনিক জনতা জানতো জিয়া দেশ প্রেমিক। শহীদ জিয়া সামরিক শাসন জারী করেননি। তিনি সামরিক শাসন পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে।

আজ সিপাহী জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবসে বুক ভরা বেদনা নিয়ে লিখতে হয় রক্ত পিপাসু ছলনাময়ী মনহরনী ডাইনী পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের সীমাহীন অযোগ্যতা ও ব্যর্থতার কাহিনী। ভোটার বিহীন নির্বাচনে নির্বাচিত সরকার সুপরিকল্পিতভাবে একটি স্বাধীন জাতিকে আত্মবিধ্বংসী পথে ঠেলে দিয়েছিল। এ জাতির স্বপ্নিল ভবিষ্যতকে করে তুলেছিল অনিশ্চিত ও অন্ধকার।

শেখ হাসিনা সরকারের অযোগ্যতা ও ব্যর্থতার ইতিহাস ১৮ কোটি মানুষের এবং এ জাতির অনাগত ভবিষ্যতের ইতিহাস হতে পারে না। বিপুল সম্ভাবনায় এ জাতির ললাটে এক তরফা নির্বাচনের স্থায়ী কলংকের ছাপ লেপন করে দেয়ার অধিকার কারো নেই এবং এমন অধিকার কাউকে দেয়াও যায় না। তাইতো ঘটে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থান। স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকার আমলে ব্যাংকের টাকা গায়েব করাকে মনে করা হয় “মৃদু অপরাধ”। যে জাতি ৭ নভেম্বর সৃষ্টি করতে শিখেছে, সে জাতি আবার ৫ আগস্ট সৃষ্টি করেছে, সে জাতি তার মুক্তির সঠিক পথ খুজে নেবেই।

##
এ্যাড. নাজিম উদ্দিন আহমেদ পান্না
সাবেক সম্পাদক, বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতি
আহ্বায়ক, জাতীয়তাবাদী আইনজীবি ফোরাম, বরিশাল ইউনিট
মহানগর দায়রা জজ আদালতের পি.পি, বরিশাল
মোবাইল: ০১৭১১০০৬৪০৩

আরো পড়ুন

জিয়ানগরে বালিপাড়া ইউপি নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী আব্দুল জলিল শেখ, গণসংযোগে সরব

জাকির ফরাজী, নিজস্ব প্রতিবেদক: পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার ৩ নম্বর বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে আগাম …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *