শনিবার, জুলাই ৪, ২০২৬

স্বামীকে অঙ্গ দান করে ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন স্ত্রী

শাহিন সুমন, বরিশাল : ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। কেউ ফুল দিয়ে ভালোবাসা জানায়, কেউ উপহার দিয়ে। কিন্তু ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ কি শুধুই কিছু মুহূর্তের আনন্দ? নাকি প্রিয় মানুষকে বাঁচাতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার নামই সত্যিকারের ভালোবাসা? মৃত্যুর দুয়ারে দাড়িয়ে থাকা স্বামীর সংকট মুহূর্তে হাত ছাড়েননি তার জীবনসঙ্গী। নিজের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ দান করে স্বামীকে নতুন জীবন দিয়ে ভালোবাসার প্রমান দিয়েছেন একজন স্ত্রী। ভালোবাসা তো এমনই হওয়া উচিত।

হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন বরিশাল নগরীর বাসিন্দা আবদুর রহমান। তার দুটি কিডনিই অচল হয়ে গেছে। হাসপাতালের করিডোরে তখন অনিশ্চয়তার ভারী বাতাস। ডাক্তাররা জানিয়ে দেন রহমানকে বাঁচাতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন। চিকিৎসার জন্য জীবনের উপার্জিত অর্থ তুলেদেন ভাইয়ের হাতে। কিন্তু সেই ভাই পরিবার রক্তের বাধনকে ছিন্ন করে লোভে পড়েন অর্থের। ভাইকে হাসপাতালে রেখে টাকা-পয়সা নিয়ে সটকে পড়েন।

সে সময় দিশেহারা রহমানের স্ত্রী মেসাম্মাত তানজিলা, অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে নিরুপায়। কি করে বাঁচাবে তার স্বামীকে। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয় নিজের একটি কিডনি দিয়ে তার প্রীয় জীবন সঙ্গীনিকে ফিরিয়ে আনবেন তার ভালোবাসার সংসারে। ছোট ছোট দুটি সন্তান মায়ের কাছে রেখে সুদূর ভারতের ভেলোরে দীর্ঘ ৮মাস একাই জীবন মরণ যুদ্ধে লড়াই করে ভোলাবাসার মানুষকে নিয়ে ফেরেন দেশে। করুন এই ভালোবাসার কথা গুলো যেন স্বরনীয় হয়ে থাকবে চিরকাল। তাই আজও রহমান ও তানজিলা সংসার কাটছে অফুরন্ত ভালোবাসায়।

গৃহিনী তানজিলা বলেন, এই সংসারে যখন বউ হয়ে আসেন তখন থেকেই ছিলেন অবহেলিত। শ্বশুরবাড়ির ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত ছিল সে। স্বামী ছিলেন পরিবারের ভক্তি শ্রদ্ধার পাত্র। স্ত্রীর মর্যাদায়ও ছিল অসংগতি। যখন আব্দুর রহমান অসুস্থ হয় তখন তার পরিবার কিছু সময়ের জন্য তার পাশে থাকলেও এই অসুখ জেনে মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। আমি কখনো ভাবি নি এমনটি হবে। শুধু ভেবেছিলাম ছোট ছোট দুটি সন্তান এতিম হয়ে যাবে। স্বামী যদি অসুস্থ ঘরে পড়েও থাকে তারপরও সে বেঁচে আছে তাকে নিয়ে দু মুঠ ডাল ভাত খেয়ে থাকাটাও একটি ভরসা।

তানজিলা আরো বলেন, আমার রক্তের সাথে স্বামীর রক্তের মিল ছিল না আমার কিডনি দিয়ে যে তাকে বাঁচাতে পারবো সেটাও কখনো ভাবি নি। ডাক্তারের পরামর্শে খবর পাই যে ভারতের চেন্নাইতে এই চিকিৎসা করানো যায়। তখন সিদ্ধান্ত নেই আমার স্বামীকে বাঁচাতে হবে তাকে নিয়ে পাড়ি দেই সেই দূর দেশে। দীর্ঘ আট মাস সেখানে থেকে স্বামীকে সুস্থ করে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসি। এখন আমরা দুজনেই ভালো আছি। আমার স্বামী এখন বুঝতে পেরেছে আমি কতটা তার আপন ছিলাম। আসলে স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসাটা মহান আল্লাহ এমন ভাবে পরীক্ষা নিয়ে বোঝাবে সেটাও কখনো ভাবি নি।

১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এই দিনে অনেকেই ভালোবাসার মানুষকে ফুল, চকলেট কিংবা উপহার দেন। কিন্তু রহমান ও তার স্ত্রীর গল্প মনে করিয়ে দেয় ভালোবাসা শুধু প্রকাশের নয়, ত্যাগেরও নাম। ভালোবাসা মানে শুধু পাশে থাকা নয়, প্রয়োজনে নিজের ভেতরের শক্তিটুকু উজাড় করে দেওয়া।

আবদুর রহমান বলেন, ২০১৯ সালে তার স্ত্রীর দেয়া কিডনি স্থাপন করা হয়। দীর্ঘ ছয় বছর পরও তারা সুস্থ আছেন, করছেন স্বাভাবিক জীবনযাপন। স্ত্রীর প্রতি অবহেলার কথা স্বীকার করে রহমান আরো বলেন, আমি নতুন জীবন পেয়েছি আমার স্ত্রীর কারণে। সে না থাকলে আজ আমি বেঁচে থাকতাম না। আমি তার কাছে সারাজীবন ঋণী।

ফুল শুকিয়ে যায়, উপহার হারিয়ে যায় কিন্তু ভালোবাসার জন্য দেওয়া এক টুকরো জীবন চিরকাল অম্লান হয়ে থাকে। তাই তো ভালোবাসা সবসমই সুন্দর।

আরো পড়ুন

কোতয়ালী উত্তর থানা জামায়াতের উদ্যোগে দিনব্যাপী কর্মী শিক্ষাশিবির অনুষ্ঠিত

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে —এ্যাডভোকেট হেলাল শুক্রবার (৩ জুলাই) নগরীর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *