আহমেদ বায়েজীদ আরো একটি অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানের ওপর। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর হুমকি-ধামকির পর শুরু হয়েছে সর্বাত্মক হামলা। আক্রান্ত হয়ে পাল্টা হামলা করছে ইরানও। শুধু ইসরাইল নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সেনা ও সামরিক স্থাপনায় মিসাইল হামলা চালাচ্ছে ইরানি বাহিনী। যে কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়ে ওঠার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। হামলার প্রথম ধাপেই ইরান তার সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাসহ শীর্ষ প্রায় পঞ্চাশজন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হারিয়েছে। যে কারণে ইরানের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থা। তবুও তারা লড়ে যাচ্ছে প্রাণপণ।
কেন এই যুদ্ধ
ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করেই বলেছেন, তার লক্ষ্য ইরান যাতে পারমাণবিক বোমা বানাতে না পারে সেটি নিশ্চিত করা। একই সাথে ইরানের মিসাইল ও মিসাইল কারখানাগুলো ধ্বংস করা। বেশ কয়েক বছর ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় চলছে। আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পর্যায়ে পৌছেছে। এটাকে মারণাস্ত্রের পর্যায়ে নিয়ে যেতে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত করতে হবে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দুই তিন সপ্তাহে ইরান এটি করে ফেলতে পারবে।
যদিও ইরান বারবারই বলছে, তাদের পারমাণবিক বোমা তৈরির উদ্দেশ্য নেই, শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহৃত হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাতে বিশ্বাস করতে চায় না। এছাড়া ইরানের মিসাইল ও ড্রোন কর্মসূচিও ইসরাইলের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। যে কারণে ইসরাইলের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানকে থামাতে।
মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর সাথেও ইরানের বৈরী সম্পর্ক চলছে। তারাও ইরানে হামলার বিরোধীতা করছে না। উল্টো যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করছে এমন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমান ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্ররোচিত করেছেন।
ইরানের শক্তি, ইরানের দুর্বলতা
যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরান হারিয়েছে তার সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীকে। এছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফসহ শীর্ষস্থানীয় প্রায় ৫০ জন নিহত হয়েছেন। শুরুতেই এত সংখ্যক শীর্ষ নেতাকে হারিয়ে ফেলাটা ইরানকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। একই সাথে এটি ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হিসেবেও ধরা পড়ছে।
বিষয়টি এমন নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল হঠাৎ করেই হামলা করেছে। অনেক দিনের হুমকিÑধামকি ও প্রস্তুতির পর হামলা শুরু হয়েছে। এর থেকে বোঝা যায়, ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোন তথ্য আর সিআইএ-মোসাদের কাছে গোপন নয়। এটি যে কোন রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকি।
ইরানি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এমন দুর্বলতা আমরা আগেও দেখেছি। বিপ্লবী গার্ডের বৈদেশিক শাখা কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাশেম সোলাইমানি ২০২০ সালের জানুয়ারিতে গোপনে ইরাক সফরে গেলে বাগদাদে মার্কিন বাহিনীর ড্রোন হামলায় নিহত হন। পারমাণবিক কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী মাহসিন ফাখরেজাদেহকে একই বছর রাজধানী তেহরানের কাছে প্রকাশ্যে দিবালোকে হত্যা করে মোসাদ। ২০২৪ সালের জুলাইতে ইরানি প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যাওয়া হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর আবাসিক কমপ্লেক্সে হত্যা করে মোসাদ।
এমন ভিভিআইপি লোকদেরও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে ইরান। এ থেকে তাদের প্রতিরক্ষা দুর্বলতা সম্পর্কে আমরা ধারণা পাই। সর্বশেষ গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধে আমরা দেখেছি, ইরানের মাটিতে ড্রোন কারাখানা তৈরি করে সেখান থেকে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। অথচ ইরানি গোয়েন্দারা এসবের কিছুই টের পায়নি। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা থেকেও একাধিকবার তথ্য চুরি হয়েছে। এ সব কিছুই ইরানি গোয়েন্দা দুর্বলতার প্রমাণ। যার মাশুল দিতে হচ্ছে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের লাশের বিনিময়ে। এছাড়া শত্রুর বিমান হামলা ঠেকানোর জন্য শক্তিশালী এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম নেই ইরানের। নেই উন্নত ফাইটার জেটের বহরও।
বিপরীতে ইরানের শক্তির জায়গা হচ্ছে মিসাইল ও ড্রোন ইউনিট। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্য মতে, ইরানের কাছে এক ডজনের বেশি ভিন্ন ভিন্ন ধরণের মিসাইল আছে। দেশটির মোট মিসাইলের সংখ্যা কয়েক হাজার হবে। ২০২০ সালে কাশেম সোলাইমােিনক হত্যার জবাবে ইরাকের মার্কিন ঘঁটিতে হামলার জন্য ফাতেহ ও কিয়াম ব্যালেস্টিক মিসাইল ব্যবহার করেছিলো ইরান। এছাড়া সাহাব-৩ ব্যালেস্টিক মিসাইলের কয়েকটি সংস্করণ রয়েছে। যার পাল্লা ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। খোররাম-শার ও সেজ্জিল ব্যালেস্টিক মিসাইল ২ হাজার কিলোমিটার দূরে আঘাত হানতে পারে।
ইরানের কামিকাজে বা আত্মঘাতি ড্রোনও সারা বিশ্বে পরিচিত। ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীও এই ড্রোন ব্যবহার করেছে। শাহেদ সিরিজের এই ড্রোনগুলো বিস্ফোরক বোঝাই করে টার্গেটের ওপর আছড়ে পরে।
এই যুদ্ধের শেষ কোথায়
এই যুদ্ধ কবে থামবে তা কেউ জানে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার ইরানের নতুন নেতৃত্বের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন, যদিও ইরান তা প্রত্যাখান করেছে। ট্রাম্পের আত্মসমর্পনের প্রস্তাবও তারা উড়িয়ে দিয়েছে। হয়তো ইরান এত বড় ক্ষতির পর এই যুদ্ধের পরিণতি দেখে নিতে চায়। পরাশক্তির বিরুদ্ধে অসম এই লড়াইয়ে তারা এখন পর্যন্ত প্রচণ্ড সাহস আর দৃঢ়তা দেখিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বৃদ্ধির জন্য তেহরান বেশি সংখ্যক দেশের ওপর হামলা করছে। এই কৌশলের অংশ হিসেবে প্রতিবেশী আরব দেশগুলো ছাড়াও সাইপ্রাসে হামলা করেছে। হামলা করেছে একটি ফরাসি সেনা ঘাঁটিতেও। এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এখন এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিতে পারে যুদ্ধ থামাতে। সেটি হলে দ্রুত থামতে পারে রক্তপাত।
অন্যথায় যুদ্ধ অনেকদিন চলবে। কারণ শুধু আকাশ পথে হামলা চালিয়ে ইরানকে পরাজিত করা সম্ভব হবে না। আপাতত ইরানে স্থল বাহিনী পাঠানোর কোন পরিকল্পনা ট্রাম্পের নেই বলে বলে শোনা যাচ্ছে। তাই ইরান হয়তো এই লড়াইয়ে টিকে যাবে। তবে তাদের যে ক্ষতি ইতোমধ্যে হয়েছে, তা এক কথায় অপূরণীয়। অন্যদিকে যুদ্ধ চললে, ইসরাইলও ধ্বংসলীলা দেখবে। টানা কয়েকদিন মিসাইল হামলা চললে, ইসরাইলিরা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হতে পারে। আরব দেশগুলোও ইরানি আক্রমণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
একাই লড়ছে ইরান
এই যুদ্ধে একাই লড়তে হচ্ছে ইরানকে। তাদের প্রধান মিত্র হিসেবে পরিচিত চীন ও রাশিয়া যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। এছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে আর কোন দেশ ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত নয়। লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা ইসরাইলের সাথে দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। সিরিয়ার বাশার আল আসাদের পতন হয়েছে বিদ্রোহীদের কাছে। বাশারের সরকার থাকলে তারা নিশ্চিতভাবেই ইরানের পাশে দাঁড়াতো। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে ইরান বাইরে থেকে কোন সহযোগিতা পাচ্ছে না। লড়তে হচ্ছে একাই।
লেখক : সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।