মইনুল আবেদিন খান, বরগুনা জেলা প্রতিনিধি:
বরগুনার তালতলীর টেংরাগিরী কুমির প্রজনন কেন্দ্রে নীরবে প্রতীক্ষার গল্প বয়ে চলেছে ‘টেংরা’ ও ‘ছখিনা’ নামের এক কুমির জুটি। ১৩ বছর ধরে তারা আশার ডিম পাড়ে, জীবনের স্পন্দনে শাবকের জন্ম দেয়। কিন্তু সেই নতুন প্রাণের আলো যেন বারবারই নিভে যায় অদৃশ্য কোনো অন্ধকারে। জন্মের আনন্দ ছাপিয়ে এ কুমির জুটির প্রাণে প্রতিবছরই জন্ম নেয় বেঁচে না থাকার বেদনা। প্রতিবারই শুরু হওয়া এক গল্প, যা শেষ হয় অপূর্ণতায়।
তালতলীর এই প্রজনন কেন্দ্রের আশেপাশে বসবাসরত স্থানীয়দের কণ্ঠে এখন ফুটে উঠেছে ক্ষোভ আর অসহায়তার দীর্ঘশ্বাস। তাদের অভিযোগ,বন বিভাগের অবহেলা, দক্ষ জনবলের অভাব আর চরম দায়িত্বহীনতার বলি হচ্ছে একের পর এক নিষ্পাপ কুমির শাবকের প্রাণ। জন্মের পরও বাঁচার ন্যূনতম নিশ্চয়তা পাচ্ছে না শাবকগুলো, যেন অবহেলার অন্ধকারেই তাদের ভবিষ্যৎ গ্রাস করে নিচ্ছে। এই নির্মম বাস্তবতা শুধু প্রাণহানির গল্প নয়, বরং গোটা এলাকার মানুষের মনে ছড়িয়ে দিচ্ছে গভীর উদ্বেগ আর হতাশা। সরকারের কুমির সংরক্ষণের স্বপ্ন আজ যেন ভেঙে পড়ার মুখে।
জানা গেছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে তালতলীর ট্যাংরাগিরি ইকোপার্কে বন বিভাগের উদ্যোগে মিঠাপানির কুমির সংরক্ষণ ও বংশবিস্তার লক্ষ্যে একটি প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এ কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু হয় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ কুমির ‘টেংরা’ ও স্ত্রী কুমির ‘ছখিনা’কে নিয়ে।
প্রজনন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, স্ত্রী কুমিরটি প্রতিবছর গড়ে ৮ থেকে ১০টি ডিম দেয়। সেই হিসেবে গত ১৩ বছরে প্রায় ১২০ থেকে ১৩০টি ডিম দিয়েছে এই কুমির জুটি। ডিম থেকে শাবক ফুটে বের হলেও দুঃখজনকভাবে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত একটি শাবককেও দীর্ঘমেয়াদে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে প্রজনন কেন্দ্রের কার্যকারিতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রজনন কেন্দ্রের নীতিমালা অনুযায়ী, ডিম থেকে শাবক ফুটে বের হওয়ার পরপরই তাদের প্রাপ্তবয়স্ক কুমির থেকে আলাদা করে নিরাপদ পরিবেশে রাখতে হয়। পরবর্তীতে নিয়মিত পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট আকারে বড় হওয়ার পরই তাদের আবার বড় কুমিরের সঙ্গে রাখা যায়। অন্যথায় বড় কুমির ছোট শাবকদের আক্রমণ করে খেয়ে ফেলতে পারে,যা প্রজনন ব্যবস্থাপনায় একটি স্বীকৃত ঝুঁকি।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। প্রয়োজনীয় পৃথকীকরণ ও পরিচর্যার অভাবে একের পর এক কুমির ছানার মৃত্যু ঘটছে। তাদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাবকগুলো টেংরা ও ছখিনার আক্রমণের শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে, যা প্রজনন কেন্দ্রের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবকে ইঙ্গিত দেয়।
সম্প্রতি টেংরাগিরি কুমির প্রজনন কেন্দ্রে গিয়ে দেখাগেছে, টেংরা আর ছখিনার একটি বাচ্চা ফুটেছে, বাচ্চাটি তার পিতা মাতা থেকে খানিকটা দূড়ে বেশ আতঙ্ক নিয়ে পানি সাতরে একস্থান থেকে অন্য স্থানে যাচ্ছে। হয়তো এই শাবকটিও তার সহদরদের মতোন আজ নয়তো কাল প্রানের স্পন্দন হারিয়ে ফেলবে এমন শঙ্কা স্থানীয়দের।
প্রতিবছর কুমির শাবকের মৃত্যুতে এলাকাবাসীর ক্ষোভ এখন তীব্র থেকে তীব্রতর। তাদের ভাষ্য এ যেন অবহেলার এক নির্মম উদাহরণ, যেখানে দায়িত্বহীনতার কাছে হার মানছে জীবনের সম্ভাবনা। যথাযথ তদারকি, আন্তরিকতা আর জবাবদিহিতা থাকলে এই প্রজনন কেন্দ্র আজ সফলতার গল্প হতে পারত। কিন্তু বারবার ব্যর্থতার এই ধারাবাহিকতা মানুষের মনে প্রশ্ন তোলে—কেন রক্ষা পায় না এই নিষ্পাপ প্রাণগুলো? কাদের অবহেলায় বারবার ঝরে যাচ্ছে সম্ভাবনার অঙ্কুর? এমন বাস্তবতায় ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে পুরো এলাকা, আর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ে যাচ্ছে একটি সম্ভাবনাময় সংরক্ষণ উদ্যোগের প্রতি মানুষের আস্থা।
স্থানীয়দের মতে, এই প্রজনন কেন্দ্রটি সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এখান থেকেই কুমির উৎপাদনের মাধ্যমে দেশে এ প্রজাতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। পরবর্তীতে এসব কুমির সুন্দরবন-এ অবমুক্ত করা গেলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কুমির রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হলে রাষ্ট্রীয় আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাও উন্মোচিত হবে।
স্থানীয় যুবক কে এম রাজু বলেন, প্রতিবছর এই কুমির ডিম পাড়ে এবং সেই ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হয়। তবে সেই বাচ্চাগুলোকে বাঁচাতে পারছে না বন বিভাগের লোকজন। তাই যে দুটি কুমির নিয়ে এই প্রজনন কেন্দ্রটি যাত্রা শুরু করেছিল, সেই দুটি কুমিরই এখানে আছে, আর বাড়েনি। তার দাবি, বন বিভাগ আন্তরিক হলে কুমিরের বাচ্চাগুলোকে বাঁচানো যাবে।
তালতলীর গণমাধ্যমকর্মী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যক্তি উদ্যোগ এবং সরকারি উদ্যোগে কুমির প্রজনন কেন্দ্র রয়েছে। সেসব জায়গায় কুমিরের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও টেংরাগিরি কুমির প্রজনন কেন্দ্রে এক যুগের বেশি সময় পার হলেও কুমিরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এখানে অবশ্যই এই কুমির প্রজনন কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে।
বরগুনা টুরিস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সোহেল হাফিজ বলেন, বরগুনা জেলার পর্যটন স্পটগুলোর জন্য কুমির প্রজনন কেন্দ্রটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এখানে পর্যাপ্ত লোকবল নেই এই প্রজনন কেন্দ্রটি দেখভাল করার জন্য। এখানে প্রতি বছর বাচ্চা জন্মায়, কিন্তু এই বাচ্চাগুলোকে পরিচর্যা করে বড় করার লোকজন নেই। তাই কুমিরের বাচ্চাগুলো মারা যাচ্ছে। এক কথায়, কুমিরের বাচ্চাগুলো মারা যাওয়ার জন্য দায়ী বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
তিনি আরও বলেন, মংলায় করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক যান শুধু এই কুমিরগুলোকে দেখার জন্য। কিন্তু এখানে কুমিরের সংখ্যা বৃদ্ধি না পাওয়ায় পর্যটকরা আসছে না। এখানে সফলভাবে কুমিরের প্রজনন করা গেলে পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। তাই সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, তারা যেন এই পর্যটন কেন্দ্রটি যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালনা করেন। আর তা না হলে আমরা এই অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করব।
বন বিভাগের সখিনা বিট কর্মকর্তা রাহিমুল ইসলাম জুমেল বলেন, প্রতিবছর কুমির ডিম দেয় এবং সেই ডিম থেকে বাচ্চা জন্ম হয়। কিন্তু দক্ষ জনবলের অভাবে কুমিরছানাগুলোকে বাঁচানো যাচ্ছে না। মূলত কুমিরের বাচ্চাগুলো জন্মানোর পর এগুলোকে বড় কুমির থেকে আলাদা করে রাখতে হয়। আলাদা না করলে বড় কুমির এই ছোট কুমিরের বাচ্চাগুলোকে খেয়ে ফেলে। তাই দক্ষ জনবলের অভাবে কুমিরছানাগুলোকে আলাদা করে রাখা যাচ্ছে না, ফলে বাঁচানো যাচ্ছে না। আমি দক্ষ জনবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। আশা করি তারা এ সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।