ফাহিম ফিরোজ : প্রচণ্ড গরম, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে বরিশালে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালগুলোতে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগীকে হাসপাতালের ফ্লোর ও বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। আবার অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না পেয়ে বাসা কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বরিশাল সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে হাসপাতালটিতে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ২ হাজার ১৩৪ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ১ জুন থেকে ৯ জুন পর্যন্ত ৯ দিনে ভর্তি হয়েছেন ১৫২ জন রোগী। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন ডায়রিয়া রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা থাকলেও রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় অনেককে মেঝেতে অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শিশু, নারী ও বয়স্ক রোগীদের সংখ্যাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসা নিতে আসা রোগী আশিকুর রহমান বলেন, “হঠাৎ করেই পাতলা পায়খানা ও বমি শুরু হয়। শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়লে হাসপাতালে আসি। এখানে এসে দেখি অনেক রোগী ভর্তি রয়েছে। জায়গার সংকট থাকলেও চিকিৎসকরা আন্তরিকভাবে সেবা দিচ্ছেন।” গৃহবধূ তাসলিমা বেগম বলেন, “আমার শ্বশুর ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে ওয়ার্ডে জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। গরমের কারণে আশপাশের অনেক মানুষও অসুস্থ হচ্ছে।”
হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ডায়রিয়া ওয়ার্ডের প্রতিটি শয্যায় রোগী ভর্তি। অতিরিক্ত রোগীদের কেউ বারান্দায়, কেউ মেঝেতে স্যালাইন নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগীদের স্বজনদের মাঝেও উৎকণ্ঠা দেখা গেছে। জানা গেছে, বরিশাল সদর হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীদের জন্য বেডের সংখ্যা মাত্র চারটি। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেখানে দশটি বেড স্থাপন করেছে। সেই ১০ টি বেডে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে।
বরিশাল সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল বলেন, “তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণে অসচেতনতার কারণে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী আসছেন। আমরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। রোগীদের বেশি করে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে এবং বাইরের খোলা ও অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিহার করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। পর্যাপ্ত স্যালাইন গ্রহণ এবং পানিশূন্যতা রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।” জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রীষ্ম মৌসুমে খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং দূষিত পানির মাধ্যমে রোগজীবাণু সহজে ছড়িয়ে পড়ে। তাই ফুটানো বা বিশুদ্ধ পানি পান, খাবার ঢেকে রাখা, হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং রাস্তার পাশের খোলা খাবার এড়িয়ে চললে ডায়রিয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বরিশালে ডায়রিয়া রোগীর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান আবহাওয়ায় সতর্ক না হলে আগামী দিনগুলোতে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।