ফাহিম ফিরোজ : এক সময় বাড়ির আঙিনায় সীমিত পরিসরে চাষ হতো পেঁপে। এখন সেই পেঁপেই বদলে দিচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকদের অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বরিশাল বিভাগের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষ করে অনেক কৃষক হয়ে উঠেছেন সফল উদ্যোক্তা। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হচ্ছে বরিশালের পেঁপে। কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, বিভাগের ছয় জেলায় বছরে উৎপাদিত হচ্ছে ৩৫ হাজার ৪০৫ মেট্রিক টন পেঁপে।
বিশেষ করে বরিশালের বাবুগঞ্জ ও সদর উপজেলায় পেঁপে চাষ এখন কৃষকদের কাছে লাভজনক কৃষি উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। রেডলেডি, শাহী, কাশ্মিরি ও টপলেডি জাতের পেঁপে চাষ করে অনেক কৃষক অল্প সময়েই পেয়েছেন আর্থিক সাফল্য। সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের ইছাগুড়া ও পূর্ব ইছাগুড়া গ্রামের মির্জা আনোয়ার হোসেন ফনু, ইব্রাহিম আকন, মকরম প্রতাপ গ্রামের আবুল মহরী, সায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামের মো. আরিফুর রহমান, চরকাউয়া ইউনিয়নের নয়ানী গ্রামের বাচ্চু সিকদার, চাঁদপুরা ইউনিয়নের হিজলতলা গ্রামের মো. জাহাঙ্গীর হাওলাদার এবং বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের বায়লাখালী গ্রামের আবু বকর সিদ্দিক সুমন এ অঞ্চলে পেঁপে চাষের সফল মুখ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
পেঁপে চাষে সফলতার গল্প :
বাবুগঞ্জ উপজেলার বায়লাখালী গ্রামের প্রবাসী আবু বকর সিদ্দিক সুমনের গল্প এখন স্থানীয় কৃষকদের অনুপ্রেরণার নাম। পাঁচ বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা পেঁপে চাষ আজ তাকে এনে দিয়েছে আর্থিক স্বচ্ছলতা, পরিচিতি এবং সম্মাননা।
গত পাঁচ বছরে কাঁচা ও পাকা মিলিয়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন তিনি। শুধু ফল বিক্রি নয়, গত দুই বছর ধরে পেঁপের চারা উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমেও নতুন আয়ের পথ তৈরি করেছেন।
সুমন জানান, একটি পেঁপে গাছে সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। কোনো কোনো পেঁপের ওজন পাঁচ কেজি পর্যন্ত হলেও অধিকাংশের ওজন দুই থেকে তিন কেজির মধ্যে। বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী তিনি ১৭ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে পেঁপে বিক্রি করেন।
তার ভাষায়, “২০২৩ সাল ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সফল বছর। ওই বছর শুধু পেঁপে চাষ থেকেই প্রায় ২০ লাখ টাকা লাভ করেছি। এখন ফল বিক্রির পাশাপাশি চারাও বিক্রি করছেন। এত চাহিদা যে কৃষকদের সিরিয়াল দিয়ে চারা নিতে হয়।”
চারা বিক্রির ক্ষেত্রেও তিনি অনুসরণ করেন ব্যতিক্রমী পদ্ধতি। তিন থেকে চারটি চারা একসঙ্গে একটি পলিব্যাগে দিয়ে মাত্র ৪০ টাকায় বিক্রি করেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “রোপণের পর কোনো চারা নষ্ট হয়ে গেলেও যেন অন্তত একটি গাছ বেঁচে থাকে, সেই চিন্তা থেকেই একাধিক চারা দিই। কৃষক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটাই আমার মূল লক্ষ্য। অনেক সময় যাদের চারা দিতে পারি না, তাদের বিনামূল্যে বীজও দিয়ে থাকি।”
সাফল্যের ছোঁয়ায় বাড়ছে নতুন উদ্যোক্তা:
সুমনের খামার এখন যেন কৃষকদের শেখার এক উন্মুক্ত বিদ্যালয়। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা তার বাগান দেখতে আসেন। অনেকেই তার কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করে বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষ শুরু করেছেন।
চাঁদপাশা ইউনিয়নের অর্জুন মাঝি গ্রামের প্রফেসর মোহাম্মদ মোস্তফা কামালও পেঁপে চাষে সাফল্য পেয়েছেন। তিনি বলেন, “অল্প খরচে দ্রুত ফলন পাওয়ার কারণে পেঁপে চাষ অত্যন্ত লাভজনক। সঠিক পরিচর্যা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এটি কৃষকের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস হতে পারে।”
উৎপাদনে এগিয়ে ভোলা, সম্ভাবনায় উজ্জ্বল পুরো বিভাগ:
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের ১ হাজার ৩৮৮ হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে ভোলা জেলায়। জেলাভিত্তিক উৎপাদনের চিত্র—বরিশাল জেলায় ১১২ হেক্টর জমিতে ২ হাজার ৮২৩ মেট্রিক টন পেপে উৎপাদন হয়েছে। পিরোজপুর জেলায় ২৯৩ হেক্টর জমিতে ৫ হাজার ৮১ মেট্রিক টন পেপে উৎপাদন হয়েছে। ঝালকাঠি জেলায় ১১৪ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ৫৯৫ মেট্রিক টন পেপে উৎপাদন হয়েছে।
পটুয়াখালী জেলায় ৩১০ হেক্টর জমিতে ৮ হাজার ২৩৫ মেট্রিক টন পেপে উৎপাদন হয়েছে। বরগুনা জেলায় ১০৯ হেক্টর জমিতে ৩ হাজার ২৭১ মেট্রিক টন পেপে উৎপাদন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পেপে উৎপাদন হয়েছে ভোলা জেলায়। এই জেলায় ৪৫০ হেক্টর জমিতে ১৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন পেপে উৎপাদন হয়েছে। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষিণাঞ্চলের জলবায়ু ও মাটির গুণাগুণ পেঁপে চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় প্রতিবছর উৎপাদন বাড়ছে। একই সঙ্গে কৃষকদের মধ্যে বাণিজ্যিক ফল চাষের আগ্রহও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের আশাবাদ:
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম শিকদার বলেন, “পেঁপে একটি উচ্চ ফলনশীল, পুষ্টিকর এবং লাভজনক ফল। বরিশাল অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া এ ফল চাষের জন্য খুবই উপযোগী। কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত জাতের চারা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে পেঁপে চাষের আওতা ও উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।” তিনি আরও বলেন, “পেঁপে শুধু কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে না, বরং দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বরিশাল পেঁপে উৎপাদনের অন্যতম প্রধান অঞ্চল হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।”
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।