মোঃ ফরিদ আহমেদ, নেছারাবাদ (পিরোজপুর) প্রতিনিধি :
তীব্র গরম আর লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণার মাঝেই পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার লাখো গ্রাহকের ওপর যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি’র ২০২৬ সালের জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল। সাধারণ সময়ে যে গ্রাহকের বিল আসত ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, চলতি মাসে তা লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৫৯ থেকে ১ হাজার ৭৭৭ টাকায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিল তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। আকস্মিক ও অস্বাভাবিক এই ভুতুড়ে বিলে পুরো নেছারাবাদ উপজেলা জুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং গ্রাহকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মে-জুন মাসের এই বিলের কাগজে কোনো বাস্তবতার মিল নেই। গ্রাহকদের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুতের মিটার রিডাররা সরেজমিনে না এসে অফিসে বসেই কাল্পনিক ও মনগড়া ইউনিট বসিয়ে এই ভুতুড়ে বিল তৈরি করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরূপকাঠি সদর ইউনিয়নের একজন গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার সাধারণত প্রতিমাসে বিল আসে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে। কিন্তু এই জুন মাসে বিল এসেছে ১ হাজার ৬৫৯ টাকা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, গত মে- জুনের বিলে আমার মিটারে ব্যবহৃত ইউনিট ধরা হয়েছে ১৯৫ অথচ গত ০৭ জুন ‘২৬ থেকে ৩০ জুন’২৬ পর্যন্ত ২৩ দিনে তার মিটারে ব্যবহৃত ইউনিট দেখা যায় ৩৯। একই অভিযোগ মোঃ আলমগীর নামে একজন গ্রাহকের। তার জুন মাসের বিলে ব্যবহৃত ইউনিট ধরা হয়েছে ১০০, অথচ ৭ জুন’২৬ থেকে ৩০ জুন’২৬ পর্যন্ত ব্যবহৃত ইউনিট দেখা যায় মাত্র ৭। একই দশা উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রাম অঞ্চলের সাধারণ মানুষেরও। ভুক্তভোগীদের দাবি, এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে, তার ওপর বিদ্যুৎ অফিসের এই স্বেচ্ছাচারিতা ও ভুতুড়ে বিলের বোঝা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
অনুসন্ধানে ও গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে এই অস্বাভাবিক বিলের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ সামনে এসেছে। মিটার রিডাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রকৃত রিডিং না দেখে পূর্ববর্তী মাসের আনুমানিক বিলের ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত ইউনিট যোগ করে দিয়েছেন। পল্লী বিদ্যুতের নিয়ম অনুযায়ী লাইফলাইন বা কম ইউনিট ব্যবহারের জন্য প্রতি ইউনিটের দাম কম। কিন্তু একবারে অতিরিক্ত ইউনিট দেখানোর কারণে গ্রাহকের বিল উচ্চ মূল্যের ধাপে চলে গেছে, যার ফলে বিলের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বিগত কয়েকদিন ধরে স্বরূপকাঠি ও জগন্নাথকাঠী সাব- জোনাল অফিসে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দূর-দূরান্ত থেকে সাধারণ মানুষ রোদ-গরম উপেক্ষা করে বিল সংশোধনের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, বিল সংশোধনের জন্য গেলে আশানুরূপ সহযোগিতা মিলছে না। উল্টো গড়পড়তা যুক্তি দিয়ে পুরো বিলই পরিশোধ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। লাইন কেটে দেওয়ার ভয়ে অনেকেই ধার-দেনা করে বিল পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এ বিষয়ে পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি’র জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মোঃ আলতাপ হোসেন ভুতুড়ে বিলের বিষয়টি সরাসরি স্বীকার না করলেও বলেন, গত মাসে ঈদুল আযহা উদযাপন করায় বাড়তি বিদ্যুৎ খরচের পাশাপাশি গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বিল কিছুটা বেশি আসতে পারে। তবে কোনো গ্রাহকের বিলে যদি সুনির্দিষ্ট কোনো অসঙ্গতি বা মিটার রিডিংয়ের সাথে অমিল পাওয়া যায়, তবে তারা যেন সংশ্লিষ্ট জোনাল অফিসে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগ খতিয়ে দেখে তা দ্রুত সংশোধন করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
ডিজিটাল বাংলাদেশে যেখানে স্মার্ট ও স্বচ্ছ পরিষেবার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে এনালগ বা মনগড়া পদ্ধতিতে বিল তৈরি করে গ্রাহক হয়রানি অত্যন্ত দুঃখজনক। অবিলম্বে এই ভুতুড়ে বিল বাতিল করে প্রকৃত রিডিং অনুযায়ী বিল পুনঃনির্ধারণ করার জোর দাবি জানিয়েছেন নেছারাবাদ উপজেলার দিশেহারা ভুক্তভোগী জনগণ।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।