সোলায়মান তুহিন, গৌরনদী (বরিশাল):
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু পাঠদানের কেন্দ্র নয়; এটি একটি জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি। বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বার্থী ইউনিয়নের বার্থী তাঁরা মাধ্যমিক বিদ্যালয় তেমনই একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান, যা প্রতিষ্ঠার ১২০ বছর অতিক্রম করলেও এখনও জাতীয়করণের অপেক্ষায় রয়েছে।
১৯০৫ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে, যখন দক্ষিণাঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত, তখন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবীদের উদ্যোগে বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। একটি ছোট টিনশেড ঘর থেকে শুরু হওয়া সেই পথচলা আজ এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘ এই সময়ে বিদ্যালয়টি শুধু পাঠদানই করেনি, বরং হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের সোপান হিসেবে কাজ করেছে। এখানকার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা আজ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা, ব্যাংকার, আইনজীবী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী এবং সফল উদ্যোক্তা হিসেবে দেশ-বিদেশে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
নারী শিক্ষার প্রসারেও বিদ্যালয়টির অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একসময় যে অঞ্চলে মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর প্রবণতা ছিল সীমিত, সেখানে এই প্রতিষ্ঠান শিক্ষার আলো ছড়িয়ে নারী শিক্ষা বিস্তার, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৫৫ শতাংশই ছাত্রী, যা এ প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থারই প্রতিফলন।
সীমিত অবকাঠামো, শিক্ষক সংকট এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম থেমে নেই। বরং শিক্ষার মান ধরে রেখে ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফল অর্জন করছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি শতভাগ পাসের গৌরব অর্জন করে এবং ১৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ লাভ করে, যা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার গুণগত মানের শক্তিশালী প্রমাণ।
তবে এই সাফল্যের বিপরীতে বাস্তব চিত্র খুব একটা সুখকর নয়। বিদ্যালয়ের কয়েকটি ভবন জরাজীর্ণ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের অভাব রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার ল্যাব থাকলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট থাকায় অনেক ক্ষেত্রে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের দিয়ে পাঠদান চালিয়ে নিতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক, শিক্ষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সুধীজনদের অভিমত, সরকার প্রতিটি উপজেলায় একটি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের যে নীতি গ্রহণ করেছে, সেই নীতির অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডই বার্থী তাঁরা মাধ্যমিক বিদ্যালয় পূরণ করেছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের ঐতিহ্য, ধারাবাহিক শিক্ষাগত সাফল্য, সামাজিক অবদান এবং জনসম্পৃক্ততার পরও জাতীয়করণের বাইরে থাকা এলাকাবাসীর কাছে অত্যন্ত হতাশার বিষয়।
বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, শিক্ষা বিস্তারে অনন্য অবদান রাখা এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিকে দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনা হোক।
তাদের মতে, বার্থী তাঁরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জাতীয়করণ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন নয়; বরং পুরো অঞ্চলের শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যে প্রতিষ্ঠান অসংখ্য আলোকিত মানুষ গড়ে তুলেছে, সেই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের এই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নেবে—এমন আশাই এখন এলাকাবাসীর।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।