বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৩, ২০২৬

আমতলী পৌরসভা  প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা পেলেও সেবার মান নিয়ে নাগরিকদের নানা অভিযোগ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবি

আবু জিহাদ আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি:
বরগুনার আমতলী পৌরসভা ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর ধাপে ধাপে প্রথম শ্রেণীর পৌরসভার মর্যাদা অর্জন করেছে।
 স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এই মর্যাদা উন্নত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা তৈরি করলেও, সাম্প্রতিক সময়ে পৌরসভার বিভিন্ন সেবা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় জনমত এবং সচেতন নাগরিকদের বিভিন্ন অভিযোগে পৌরসভার নাগরিক সেবার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের অংশগ্রহণ, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং জবাবদিহিতার ভিত্তিতে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। সেই সাংবিধানিক নির্দেশনার আলোকে প্রণীত স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এ পৌরসভার দায়িত্ব, কর্তব্য ও নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।
আইনের ৫০ ধারা অনুযায়ী পৌরসভার অন্যতম দায়িত্ব হলো জনস্বাস্থ্য রক্ষা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, পরিকল্পিত ও নিরাপদ সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত সড়কবাতির ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নাগরিক নিরাপত্তা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের অভাব, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা ও অপ্রশস্ত সড়ক, প্রয়োজনীয় সড়কবাতির ঘাটতি এবং সরকারি খাল ও জমি দখলের মতো সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে। এসব কারণে সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন নানাভাবে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন অনেক বাসিন্দা।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক এলাকায় পানি জমে যায়। কোথাও কোথাও ড্রেন থাকলেও সেগুলোর যথাযথ সংযোগ বা আউটলেট না থাকায় পানি দ্রুত অপসারণ সম্ভব হয় না। এতে সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কাও তৈরি হয়।
এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত, একটি প্রথম শ্রেণীর পৌরসভায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা এমনভাবে নির্মিত হওয়া উচিত, যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হয়। একই সঙ্গে সড়ক এমন প্রশস্ত ও নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন, যাতে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস কিংবা অন্যান্য জরুরি সেবার যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে।
 অন্যথায় নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি বরাদ্দ এবং অর্থ ব্যয়ের বিষয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সচেতন নাগরিকদের মতে, জনগণের করের অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন কার্যক্রমে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হলে জনমনে আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কও কমে আসবে।
স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর ৫৩ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি পৌরসভায় নাগরিক সনদ দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ওই নাগরিক সনদে কোন সেবা কত দিনের মধ্যে, কী প্রক্রিয়ায় এবং কত ফি দিয়ে পাওয়া যাবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার কথা।
তবে স্থানীয় অনেকের অভিযোগ, এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রচার ও দৃশ্যমান তথ্যের অভাবে অনেক নাগরিকই নিজেদের অধিকার ও প্রাপ্য সেবা সম্পর্কে অবগত নন।
এ ছাড়া আইনের ১১২ ধারা এবং তথ্য অধিকার আইনের আলোকে উন্নয়ন প্রকল্প, বাজেট, বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখার বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ ও সহজলভ্য করা হলে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, ভুল বোঝাবুঝি কমবে এবং জনগণের অংশগ্রহণও বাড়বে।
পৌরসভা আইনের ১১৫ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ সদস্যবিশিষ্ট একটি নাগরিক কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। এই কমিটির মাধ্যমে নাগরিকদের মতামত, অভিযোগ ও পরামর্শ সরাসরি পৌর প্রশাসনের কাছে উপস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এই কমিটি কার্যকরভাবে সক্রিয় থাকলে নাগরিক সমস্যা দ্রুত শনাক্ত ও সমাধানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া সরকারি খাল ও জমি দখল, নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ এবং অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতাও পৌরসভার রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
আইনের ১১৮ ধারা অনুযায়ী পৌরসভা বা মেয়রের কোনো সিদ্ধান্তে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। ফলে নাগরিকদের আইনগত প্রতিকার পাওয়ার পথও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
সুশাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম শ্রেণীর পৌরসভার বাসিন্দারা নিয়মিত হারে পৌরকর ও অন্যান্য কর পরিশোধ করেন। তাই উন্নত ও টেকসই সড়ক, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত সড়কবাতি, নিরাপদ নগর ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন পাওয়া তাদের আইনসম্মত ও ন্যায্য প্রত্যাশা।
সচেতন নাগরিকদের অভিমত, আমতলী পৌরসভার নাগরিক সেবা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার সমাধান বিরোধ বা পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে নয়; বরং স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর যথাযথ বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, কার্যকর জবাবদিহিতা, তথ্যপ্রকাশ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই সম্ভব।

আরো পড়ুন

বরিশালে নাগরিক টেলিভিশনের দায়িত্ত্বে সাংবাদিক শাহীন হাসান, বিভিন্ন মহলের শুভেচ্ছা 

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশালের পেশাদার সাংবাদিক শাহীন হাসান বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন নাগরিক টিভির বরিশাল প্রতিনিধি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *