বুধবার, জুলাই ২৯, ২০২৬

গলাচিপায় ৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে প্রশ্ন: কাগজে কাজ, বাস্তবে মিলছে না

মনজুর মোর্শেদ তুহিন, পটুয়াখালী : পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা পরিষদের ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের উন্নয়ন ও রাজস্ব খাতের মোট ৩ কোটি ৮৩ লাখ ২৭ হাজার ৩৭২ টাকা ব্যয়ের একাধিক প্রকল্প নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। সভার গৃহীত সিদ্ধান্তের সরকারি নথিতে প্রকল্পগুলো শতভাগ বাস্তবায়ন ও অর্থ উত্তোলনের তথ্য থাকলেও সরেজমিনে গিয়ে কয়েকটি প্রকল্পের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং তদারকি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সভার সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান স্বাক্ষরিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন সহায়তা (এডিপি) থেকে ১ কোটি ৭ লাখ ২৪ হাজার টাকা, রাজস্ব খাতের পাঁচটি প্রকল্পে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৩ হাজার ৩৭২ টাকা এবং উপজেলা কমপ্লেক্সের বিভিন্ন মেরামত ও উন্নয়ন কাজে ৫০ লাখ টাকা (অন্য একটি নথিতে ৪০ লাখ টাকা উল্লেখ রয়েছে) বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যয়ের পরিমাণ ৩ কোটি ৮৩ লাখ ২৭ হাজার ৩৭২ টাকা বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে এবং ৩০ জুনের মধ্যে সব কাজ সম্পন্ন করে অর্থ উত্তোলনের তথ্য দেওয়া হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, এসব প্রকল্প উপজেলা পরিষদের সভায় অনুমোদিত হয়। সভার সভাপতি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সদস্য সচিব ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী।

কিন্তু তথ্য হাতে পাওয়ার পর অনুমোদিত প্রকল্পের তালিকা নিয়ে বিভিন্ন স্থানে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, নথিতে উল্লেখিত কয়েকটি কাজের অবস্থান ও বাস্তব চিত্রের মধ্যে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নথিতে যেসব স্থানে কাজ দেখানো হয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট কাজের অস্তিত্ব নেই। আবার প্রকল্প অন্য কোথাও স্থানান্তর করা হয়েছে এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা রেজুলেশনের তথ্যও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদ পুকুর থেকে পৌরসভার ড্রেন পর্যন্ত পাইপ ড্রেন নির্মাণে ৯৬ হাজার ৫৮২ টাকা ব্যয়ের তথ্য থাকলেও সেখানে ওই কাজের কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

এছাড়া কৃষি অফিস থেকে উপজেলা পরিষদের বাউন্ডারি ওয়াল পর্যন্ত ভি-ড্রেন নির্মাণ নামে একই ধরনের দুটি প্রকল্পে যথাক্রমে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৭ টাকা এবং ২ লাখ ৯৭ হাজার ৪৮২ টাকা ব্যয়ের তথ্য রয়েছে। একইভাবে উপজেলা পরিষদ ভবন থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত এপ্রোচ সড়ক নির্মাণের প্রথম ও দ্বিতীয় অংশে ১ লাখ ২৬ হাজার ১৫৮ টাকা এবং ২ লাখ ৯৪ হাজার ২১৯ টাকা ব্যয়ের তথ্য থাকলেও সরেজমিনে এসব প্রকল্পের অস্তিত্ব শনাক্ত করা যায়নি।

আরও দেখা যায়, পুরাতন গেজেটেড কোয়ার্টারের পেছন থেকে মৎস্য অফিস পর্যন্ত বাউন্ডারি ওয়াল মেরামত, কাঁটাতারের বেষ্টনী ও একটি গেট নির্মাণে ৬ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য রয়েছে। কিন্তু সেখানে দীর্ঘদিনের পুরোনো দেয়াল, কাঁটাতার ও একটি জরাজীর্ণ গেট ছাড়া নতুন কোনো কাজের স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা ডা. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বছরখানেক আগে যেখানে কাঁটাতার ছিল না, সেখানে সামান্য কাঁটাতার লাগানো হয়েছে। একটি ভাঙা অংশ মেরামত করা হয়েছে। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ চোখে পড়েনি। এতে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকার মতো ব্যয় হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, উপজেলা পরিষদে কিছু উন্নয়ন কাজ চোখে পড়ে। কিন্তু কোন কাজে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে এবং কী পরিমাণ কাজ হয়েছে, তা সাধারণ মানুষ জানে না। সরকারি টাকায় সরকারি জায়গায় কাজ হলেও জনগণের কাছে কার্যত কোনো জবাবদিহিতা নেই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি অর্থবছরে উপজেলা পরিষদের উন্নয়নের নামে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও সব কাজ শেষ হওয়ার আগেই কাগজে শতভাগ বাস্তবায়ন দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়। পরে পরবর্তী অর্থবছরে নতুন বরাদ্দ এনে আগের কাজ আবারও করা হয়। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুকুজ্জামান বলেন, কমপ্লেক্সের ভেতরে যে ইউ-ড্রেনটি আছে, সেটাই এলজিইডি করেছে। অন্য কাজ সম্পর্কে আমার জানা নেই, এ বিষয়ে এলজিইডির সঙ্গে কথা বলুন।

বর্তমান উপজেলা প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আমি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি। আমার জানামতে গত অর্থবছরের শতভাগ কাজের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এডিপি ও রাজস্ব খাতের সিপিসি এবং টেন্ডারের কোনো কাজ বা অর্থ উত্তোলন বাকি নেই। প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আর্থিক বিষয়ে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বিস্তারিত বলতে পারবেন।

তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের সব কাজ শতভাগ সঠিকভাবে হয়েছে। কোনো কাজ বাকি নেই। আপনি ভালোভাবে দেখলে সব কাজই পাবেন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে জানলে সবচেয়ে ভালো হবে।

বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. এজাজুল হক বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। নথিপত্র যাচাই করে সঠিকভাবে তদন্তের পরই এ বিষয়ে বলা সম্ভব হবে।

স্থানীয় সরকার উপসচিব (ডিডিএলজি) মোঃ জুয়েল রানা বলেন, অনুমদিত রেজুলেশন কপি পরিবর্তন করে টেন্ডার করা যায়। প্রকৃত ব্যাপারটি জানতে হলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসকের নিকট জানতে হবে।

এদিকে হাতে পাওয়া নথি, সরেজমিন পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয়দের অভিযোগের আলোকে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন, ব্যয় এবং প্রকৃত কাজের সঙ্গে নথির সামঞ্জস্য রয়েছে কি না তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

আরো পড়ুন

দিনে কর্মচাঞ্চল্য, রাতে আলোর শহর-খাপড়াভাঙ্গা নদী এখন নতুন পর্যটন আকর্ষণ

মাহতাব হাওলাদার, মহিপুর : দিনের বেলায় দেশের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক মৎস্যবন্দর। আর রাত নামলেই যেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *