বুধবার, আগস্ট ১৯, ২০২৬

সাংবাদিকতায় নতুন চোখ: প্রশিক্ষণে অর্জিত ডায়েরি

‎ফরিদ আহমেদ, নেছারাবাদ: ‎​সংবাদের পেছনের গল্প খোঁজার কৌতূহল এবং সমাজের অসংগতি তুলে ধরার তাড়না থেকেই সাংবাদিকতায় আসা। তবে শুধু ইচ্ছা বা আবেগ যে পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য যথেষ্ট নয়, তা হাড়েনাতে টের পেয়েছি সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে। বরিশাল মিডিয়া করপোরেশন (BMC) পরিচালিত সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কোর্সটি আমার জন্য কেবল সংবাদের ব্যাকরণ শেখার পথ নয়; বরং তা সংবাদের দৃষ্টিভঙ্গি (News Sense) অর্জনের এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা।
‎বিএমসি পরিচালিত সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কোর্সের ২৪টির মধ্যে গত ১০ টি ক্লাসের প্রশিক্ষণ শেষে পেশাগত ময়দানে পা দিয়ে বুঝেছি, তত্ত্ব (Theory) আর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার (Practical Field) ব্যবধান কতটা বিশাল। শ্রেণিকক্ষে আমরা শিখেছি কীভাবে ‘৫W ও ১H’ (কে, কী, কখন, কোথায়, কেন ও কীভাবে) এর ওপর ভিত্তি করে লিড রাইটিং করতে হয় বা উল্টো পিরামিড কাঠামোতে সংবাদ সাজাতে হয়। কিন্তু মাঠের সাংবাদিকতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মুহূর্তের মধ্যে তথ্য নির্বাচন এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিড় থেকে খাঁটি সত্যটি খুঁজে বের করা।
​আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটালের যুগে যেখানে ভুয়া খবর (Fake News) ও গুজবের আধিপত্য বেশি, সেখানে প্রশিক্ষণে শেখা তথ্য যাচাই বা ফ্যাক্ট-চেকিং (Fact-Checking) এবং উৎস অনুসন্ধানের (Sourcing) দক্ষতা আমার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো চটকদার তথ্যের পিছে না ছুটে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার যে গুরুত্ব প্রশিক্ষণে শেখানো হয়েছে, তা পেশাগত জীবনে আমাকে প্রতিদিন প্রতিটি রিপোর্ট তৈরির সময় গাইড করে।
‎প্রশিক্ষণ কোর্সের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল তাত্বিক আলোচনার সাথে হাতে-কলমে অনুশীলনের সমন্বয়। ​সংবাদ মূল্য (News Value) নির্ধারণ, ঘটনা আর সংবাদের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য চিহ্নিত করা ও কোনটি সাধারণ ঘটনা আর কোনটি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ‘খবর’—তা বাছাই করার নৈপুণ্য অর্জন করা আমার মাঠপর্যায়ের কাজে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
‎​মাঠের অভিজ্ঞতায় আরও একটি বড় শেখা ছিল ইন-ডেপথ বা অনুসন্ধানী মানসিকতা। যেকোনো ঘটনার উপরিভাগের খবর বা প্রেস রিলিজ হুবহু তুলে না ধরে তার পেছনে ‘কেন’ এবং ‘ভবিষ্যৎ প্রভাব কী’ তা বিশ্লেষণ, আরটিআই (RTI) বা তথ্য অধিকার আইনের সঠিক ব্যবহার করার ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। একই সাথে, একজন সাংবাদিক হিসেবে সংবেদনশীল বিষয়ে রিপোর্ট করার সময় সাংবাদিকতার নৈতিকতা (Journalism Ethics) অক্ষুণ্ন রাখা—যেমন ভুক্তভোগীর পরিচয় বা সূত্রের  ( Sources) সুরক্ষায় দায়িত্বশীলতা ও নিরপেক্ষতা মেনে চলা—আমার অন্যতম প্রধান অর্জন।
‎​প্রশিক্ষণ কোর্সে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে তা হলো—”সবার আগে বস্তুনিষ্ঠতা, স্পিড নয়।” এছাড়া মানহানি আইন, সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনি দিক এবং কপিরাইট আইন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে। নারী, শিশু বা ভিকটিমের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা এবং অপরাধমূলক খবরের ভাষা নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বিষয়গুলো ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
‎​ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে আজকাল সংবাদ পরিবেশনার ধারা বদলে গেছে। শুধু ভালো লেখা নয়, মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টিং, মোজো সাংবাদিকতা,  ছবি বা ভিডিওর সঠিক ফ্রেম নির্বাচন, ভিডিও বা ছবি তোলার ক্ষেত্রে ‘শট’ (Shot) এবং শিরোনামের সঠিক শব্দের ব্যবহার এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ডিজিটাল সংবাদ পরিবেশনার এই বৈচিত্র্যময় দিকগুলোর সাথে পরিচিত হতে পেরে আমার পেশাগত আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে গেছে।
‎​প্রশিক্ষণ একজন তরুণ সাংবাদিকের ভিত্তিমূল তৈরি করে দেয়, তবে প্রকৃত শেখার প্রক্রিয়াটি শুরু হয় পেশাগত জীবন শুরুর পর থেকেই। প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন খবর কভার করা, নতুন মানুষের মুখোমুখি হওয়া এবং গঠনমূলক সমালোচনার মধ্য দিয়েই একজন সাংবাদিক সত্যিকারের দক্ষতা অর্জন করেন। বিএমসি পরিচালিত ২৪ টি ক্লাসের মধ্যে প্রথম ১০টি ক্লাসে অর্জিত প্রশিক্ষণ ও সাম্প্রতিক কাজের অভিজ্ঞতা আমাকে একজন দায়িত্বশীল, বস্তুনিষ্ঠ এবং সময়ের উপযোগী সাংবাদিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধান নিয়ামক ভূমিকা পালন করছে। এবং সম্পূর্ণ কোর্সটি সম্পন্ন করতে পারলে সাংবাদিকতা পেশায় নিজেকে আরও গতিশীল করতে পারবো বলে আমি বিশ্বাস করি।

আরো পড়ুন

বানারীপাড়ায় প্রবাসির স্ত্রী প্রেমিকার সাথে ঘুরতে গিয়ে জনতার হাতে আটক

বানারীপাড়া প্রতিনিধি : বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ফেরিঘাটের চায়ের দোকানদার ও ধারালিয়া গ্রামের মোঃ শহিদুল ইসলামের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *