খান বাশার।।
হাজারো দিবস যে শিক্ষকদের দিয়ে পালন করানো হয়, আজ সেই শিক্ষকদের জন্যই নেই কোনো বিদ্যালয়ভিত্তিক আয়োজন। নেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো উদ্যোগ। নেই বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক দিবস পালনের প্রজ্ঞাপন, নেই কোনো বরাদ্দ।
তাহলে শিক্ষক দিবসে শিক্ষকের কথাইবা কে বলবে?
আমার ২১ বছরের পদোন্নতিবিহীন শিক্ষকতা জীবন। তারও আগে বাবার শিক্ষকতা জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। শুধু দেখিনি—অনুভব করেছি একজন শিক্ষকের জীবনসংগ্রাম।

ছোটবেলায় যখনই কোনো কিছুর বায়না করতাম, বাবা বলতেন, “বেতন পেলেই কিনে দেব। ”তখন বুঝতাম না। আজ বুঝি, অনেক সময় সেটি কিনে দেওয়ার সামর্থ্যই তাঁর ছিল না।
আজ আমিও একজন বাবা, একজন শিক্ষক। আমিও কখনো কখনো সন্তানদের একই কথা বলে সান্ত্বনা দিই। অথচ যে শিক্ষক শিশুদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখতে শেখাবেন, সেই শিক্ষককেই মাসের মাঝামাঝি সময় পেরোলেই ভাবতে হয়—বাকি দিনগুলো কীভাবে কাটবে?

নিজের কিংবা মা-বাবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারেন না। সন্তানের সব প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন না। অনেক সময় স্ত্রী-সন্তানের কাছেও নীরবে মাথা নিচু করে থাকতে হয়।
বক্তৃতায়, সভা-সেমিনারে, কাগজে-কলমে বহুবার শুনেছি—“শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর।” “শিক্ষকের মর্যাদা সর্বোচ্চ।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কোথায় বদলেছে শিক্ষকের জীবনমান? কোথায় বেড়েছে শিক্ষকের বাস্তব মর্যাদা? তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষকরা আজও নানা বৈষম্যের মুখোমুখি।
আজ শিক্ষক দিবস। অথচ নিরীহ শিক্ষকরা অন্যান্য দিনের মতোই শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পাঠদান করছেন। দিবসটি নিয়ে তাঁদের মধ্যে নেই তেমন কোনো আয়োজন, নেই বিশেষ কোনো অনুভূতির প্রকাশ। হয়তো পত্রিকার শিরোনাম হবে—“আজ মহান শিক্ষক দিবস।”
সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠান হবে, বক্তৃতা হবে, ফুল দেওয়া হবে, ছবি তোলা হবে। তারপর আবার সবকিছু আগের মতোই চলবে। কিন্তু শিক্ষক দিবস সেদিনই সত্যিকার অর্থে সফল হবে, যেদিন এ দেশের প্রতিটি শিক্ষক মাথা উঁচু করে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারবেন—
“আমি শিক্ষক। আমি রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী। আমার পেশার মর্যাদা আছে, আমার জীবনেরও মর্যাদা আছে।”
যেদিন শিক্ষককে তাঁর ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হবে না, সেদিনই শিক্ষক দিবসের প্রকৃত সার্থকতা আসবে।

আশার কথা, বর্তমান সরকার শিক্ষকদের নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলছেন, সভা-সেমিনার করছেন। আমরা আশাবাদী। তবে ভয়ও হয়—আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ফাইলের স্তূপে আমাদের স্বপ্নগুলো আবার হারিয়ে যাবে না তো?
কত না-পাওয়ার গল্প, কত আশ্বাস, কত প্রতিশ্রুতি—শিক্ষকদের বঞ্চনার ইতিহাসও কম দীর্ঘ নয়।
কত র্যালি করেছি, কত দিবসের আয়োজন দেখেছি, কত স্লোগান দিয়েছি। অথচ আজও লাখ লাখ শিক্ষক তথাকথিত রুটিন অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পাঠদান করে যাচ্ছেন—বুকে ধারণ করে নিজেদের অসংখ্য না-পাওয়ার গল্প।

বুদ্ধিজীবী সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার—আপনারা যদি শিক্ষকদের সম্মান করেন, সাধারণ মানুষও শিক্ষকদের সম্মান করবে।
আমরা কোনো করুণা চাই না। আমরা চাই ন্যায্য অধিকার, পেশাগত মর্যাদা এবং বৈষম্যহীন জীবন।
সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম—
যেদিন প্রতিটি শিক্ষক গর্ব করে বলতে পারবেন—
“আমিই শিক্ষক—এটাই আমার অহংকার।”ভালো থাকুন আমার মহান শিক্ষকগণ।
শুভ শিক্ষক দিবস।
সহকারী শিক্ষক
১২৯নং বড় পুইয়াউটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
বাকেরগঞ্জ, বরিশাল
শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক—বরিশাল বিভাগ, ২০২৬
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।