মাহতাব হাওলাদার, মহিপুর প্রতিনিধি: সৈকতে সূর্যোদয় দেখতে ভিড় করছেন পর্যটকেরা। কেউ ঢেউয়ে পা ভেজাচ্ছেন, কেউ ছবি তুলছেন। সৈকতসংলগ্ন চায়ের দোকান, খাবারের স্টল, অটোরিকশা ও ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলেও বাড়ছে ব্যস্ততা। পর্যটকের চোখে এটাই কুয়াকাটা—সমুদ্র, বালুচর আর অবকাশের আনন্দ।
তবে এই দৃশ্যের আড়ালে রয়েছে ভিন্ন এক কুয়াকাটা। এখানে সমুদ্র শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, হাজারো মানুষের জীবিকার অবলম্বন। জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হোটেল-রেস্তোরাঁকর্মী, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলচালক, সৈকতের ফটোগ্রাফারসহ নানা পেশার মানুষের আয়-রোজগার অনেকটাই নির্ভর করে পর্যটকের উপস্থিতির ওপর।
পর্যটক কমলে কমে আয়
কুয়াকাটার অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দিন শুরু হয় পর্যটকের আগমনের অপেক্ষায়। ছুটির দিন ও উৎসবের সময় ব্যবসা জমজমাট হলেও পর্যটক কমে গেলে দোকানপাটে নেমে আসে স্থবিরতা। অতীতের বিভিন্ন সময়ে পর্যটক সংকটে কুয়াকাটার হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির খবর এসেছে।
স্থানীয় চা বিক্রেতা আয়নাল বলেন, ‘পর্যটক বেশি এলে আয় বাড়ে। পর্যটক কম থাকলে দোকানে বসে থাকা ছাড়া তেমন কাজ থাকে না।’
এ বাস্তবতা শুধু একজন আয়নালের নয়; পর্যটননির্ভর বহু পরিবারের।
সমুদ্রই জীবিকা, আবার শঙ্কারও কারণ
কুয়াকাটার উপকূলীয় মানুষের একটি বড় অংশের জীবন মৎস্য আহরণের সঙ্গে যুক্ত। জেলেদের কাছে সমুদ্র মানে রোজগার, আবার ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনিশ্চয়তাও।
মাছের প্রাপ্যতা, আবহাওয়া ও সাগরের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে তাঁদের প্রতিদিনের আয়। ফলে সমুদ্র শান্ত থাকলে যেমন স্বস্তি, উত্তাল হলে তেমনি বাড়ে দুশ্চিন্তা।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সৈকতভাঙনের নতুন চাপ। ২০২৬ সালেও কুয়াকাটা সৈকতের বিভিন্ন অংশে ভাঙন তীব্র হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জিরো পয়েন্টের পর্যটন অবকাঠামোও ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকার কথা উঠে এসেছে।
পর্যটন বদলে দিয়েছে জীবিকার ধরন
কুয়াকাটায় পর্যটনের বিস্তারের সঙ্গে স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থানের ধরনও বদলেছে। অনেকে অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চালিয়ে পর্যটকদের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কাজ করছেন হোটেল-রেস্তোরাঁয়, কেউ বিক্রি করছেন খাবার, চা, শামুক-ঝিনুক ও স্থানীয় পণ্য।
২০২৪ সালের এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একটি গবেষণায়ও দেখা গেছে, কুয়াকাটার পর্যটন স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে স্থানীয়দের ক্ষমতায়ন ও পর্যটন পরিকল্পনায় তাঁদের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত।
স্থানীয় তরুণ আক্কাস বলেন, ‘আগে কাজের জন্য বাইরে যেতে হতো। এখন পর্যটক এলে এখানেই কাজ পাওয়া যায়। তবে পর্যটক না থাকলে আয়ও কমে যায়।’
ঐতিহ্যের অংশ রাখাইন সম্প্রদায়
কুয়াকাটার পর্যটন শুধু সমুদ্রকেন্দ্রিক নয়। রাখাইন সম্প্রদায়ের ইতিহাস, তাঁতশিল্প, পোশাক, খাবার ও সংস্কৃতিও এ অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু ভূমি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি তাঁদের ঐতিহ্য ধরে রাখার বিষয়টিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কুয়াকাটার রাখাইন সম্প্রদায়ের ভূমি ও অস্তিত্ব সংকটের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
পর্যটনের সঙ্গে বাড়ছে পরিবেশের চাপ
পর্যটন বাড়ার সঙ্গে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও নানা বাণিজ্যিক স্থাপনা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বর্জ্য, যানবাহনের চাপ ও সৈকত ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যা। স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা ছাড়া পর্যটনের বিকাশ শেষ পর্যন্ত কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকেই হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৈকতভাঙনের পাশাপাশি অপরিচ্ছন্নতা ও অব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগের কথা প্রকাশিত হয়েছে।
পর্যটকের কুয়াকাটা, স্থানীয়ের ঘর
ছুটির দিনে পর্যটকের ভিড়ে কুয়াকাটা যখন মুখর হয়ে ওঠে, তখন স্থানীয় মানুষের আয়ও বাড়ে। আবার পর্যটকেরা ফিরে গেলে সৈকত নীরব হয়, ব্যবসায়ীরা হিসাব মেলান, জেলেরা প্রস্তুতি নেন সমুদ্রে যাওয়ার।
এই দুই বাস্তবতার মাঝেই দাঁড়িয়ে কুয়াকাটা।
পর্যটকের কাছে কুয়াকাটা কয়েক দিনের আনন্দভ্রমণের জায়গা। কিন্তু স্থানীয় মানুষের কাছে এটি শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়—এটি তাঁদের ঘর, জীবিকা, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ।
তাই কুয়াকাটার পর্যটন উন্নয়ন মানে শুধু নতুন হোটেল, সড়ক কিংবা অবকাঠামো নির্মাণ নয়। স্থানীয় মানুষকে পর্যটন অর্থনীতির প্রকৃত অংশীদার করা, তাঁদের জীবিকা সুরক্ষিত রাখা, রাখাইন সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং সৈকত ও পরিবেশ রক্ষা করাও সমান জরুরি। তাহলেই পর্যটনের সুফল পৌঁছাবে কুয়াকাটার মানুষের ঘরে ঘরে।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।