রবিবার, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬

নেছারাবাদে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছ: সংকটে জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যজীবীরা

ফরিদ আহমেদ, নেছারাবাদ সংবাদদাতা : ‎পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার সন্ধ্যা নদীসহ এলাকার বিভিন্ন খাল-বিল ও জলাশয় থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে সুস্বাদু দেশীয় প্রজাতির মাছ। এক সময়ের প্রাচুর্যময় নদী-নালার এই অঞ্চলে এখন দেশি মাছের দেখা মেলা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। স্থানীয় হাটবাজারগুলোতে চাষের মাছে সয়লাব, আর আকাশচুম্বী দামে বিক্রি হচ্ছে দু-একটি প্রজাতির প্রাকৃতিক মাছ। ফলে ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিকারের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা স্থানীয় বহু মৎস্যজীবী পরিবার জীবিকা হারিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন।
‎‎যে মাছগুলোর দেশি জাত এখন আর তেমন দেখা যায় না—টেংরা, পুঁটি, বাইম, শিং, মাগুর, আইড়,  খলিসা, খরকাটি, গজার, ডারকা, পোয়া, বালিয়া, শাল চোপরা, শৌল, ভেদা/মেনী, বুড়াল, ফলি, চেং গতাসহ আরও কিছু জাত। গ্রামীণ জীবনের কৃষি ও চাষাবাদ ব্যবস্থা পরিবর্তনের সাথে উজাড় হয়ে যাচ্ছে এসব দেশীয় জাতের মাছ।
‎মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশি জাত হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো জলবায়ুর প্রভাব, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কারেন্ট জালের অবৈধ ব্যবহার, ফসলের জমিতে অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহার, জলাশয় দূষণ নদীর নাব্যতা হ্রাস, উজানে বাঁধ নির্মাণ নদীসংশ্লিষ্ট খাল ও বিলের গভীরতা কমে যাওয়া, ডোবা ও জলাশয় ভরাট হওয়া, মা মাছের আবাসস্থলের অভাব, মা মাছের ডিম ছাড়ার আগেই ধরে ফেলা, ডোবা-নালা পুকুর ছেঁকে মাছ ধরা, বিদেশি রাক্ষুসে মাছের চাষ, মাছের প্রজননে ব্যাঘাত ঘটানো এবং খালে-বিলে ও পুকুরে – নদীতে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা।
‎বর্ষায় ধানি জমিতে কইয়া জাল, বড়শি ও চাই পেতে মাছ ধরার ঐতিহ্যও হারিয়ে গেছে। যারা একসময় পুকুর, খাল-বিলে মাছ ধরতেন, তাদের অনেকেই এখন বাজার ছাড়া মাছ দেখতে পান না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন সময় খালে বিলে জলাশয়ে মাছ মরে ভেসে উঠছে। নদী, পুকুর, খালেও মাছ মরছে। মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক সময় ক্ষেতের ধান গাছ পঁচে অ্যামোনিয়া গ্যাস তৈরি হয়েও মাছ মারা যায়।
‎এ বিষয়ে স্বরূপকাঠি ইউনিয়নের বাসিন্দা মহিবুল্লাহ জানান, ১০ বছর আগেও গ্রাামের বাড়ির দুটি পুকুর থেকে সারা বছর মাছ পেতাম। ঝাঁকি জাল ও বড়শি দিয়ে শোল, টাকি, চেলা, পুঁটি পাওয়া যেত। শীত মৌসুমে পুকুরের পানি কমে এলে লোকেরা নেমে পানি ঘোলা করতো। তখন জাল, ডালা, খুচন নিয়ে মাছ ধরতে নামতো সবাই। শোল, গজার, চিংড়ি, বায়লা, চান্দা, তারাবাইম, পুঁটি সবই ধরা পড়তো। এখন পুকুরের গভীরতা কমার সাথে সাথে কমেছে পানি। এত এত মাছও নেই। মাঝে মাঝে কিছু চেলা, পুঁটি, বেলের চেহারা দেখা যায়।
‎সুটিয়াকাঠি ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. জসিম মোল্লা জানান, উপজেলার মিয়ারহাট এলাকার বড় মাছ বাজার। এই বাজারে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নানা প্রজাতির দেশি মাছে ভরা থাকতো। এখন মাছগুলো বাজারে ওঠে না। বাজারের এক কোনায় দেশি প্রজাতির মাছ দেখা যায়। চাষের মাছে সয়লাব। যেদিকে তাকাই, পাঙ্গাস আর তেলাপিয়া।
‎নেছারাবাদ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারিয়া কনক জানান, ধানের জমির সার ও কীটনাশক মিশে নদী ও খালের পানি নষ্ট হচ্ছে। সার ও কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় দেশি মাছ মরছে। যে মাছগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলো নিয়ে গবেষণা চলছে। পাবদা, টেংরা, বোয়াল, আইড় মাছের চাষ হচ্ছে। এর উদ্দেশ্যই হচ্ছে দেশি জাতের মাছ ফিরিয়ে আনা।
‎এই পরিস্থিতি উত্তরণে অবিলম্বে উপজেলার প্রাকৃতিক জলাশয় সংস্কার, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা এবং অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

আরো পড়ুন

পল্লী চিকিৎসকের সন্তান থেকে এমবিবিএস ডাক্তার -শফিউল 

বানারীপাড়া প্রতিনিধি: বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি ইউনিয়নের কৃতি সন্তান মো. শফিউল। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *