মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬

বরিশালে ভেকু-পল্টন নিলামে অনিয়মের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশালের বানারীপাড়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে জব্দ করা একটি ভেকু ও পল্টন নিলামে বিক্রির ঘটনায় অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভেকু ও পল্টনের মালিক মো. হানিফ হাওলাদার ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা ও নিলাম কার্যক্রমের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেছেন। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২টায় বরিশাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন মো. হানিফ হাওলাদার। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মিজানুর রহমান ও মো. আনিচুর রহমান। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে হানিফ হাওলাদার ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে এর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন। তিনি বলেন, রিট পিটিশন নম্বর ১১১৮৯/২০২৬। গত ২০ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রেজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।

রুলে ২৪ জুলাইয়ের ভ্রাম্যমাণ আদালতের দেওয়া আদেশ কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনগত কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করা হবে না এবং নিলামে বিক্রির বিষয়ে দেওয়া আদেশ কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

রিটকারী মো. হানিফ হাওলাদার পটুয়াখালী সদর উপজেলার চরপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় ব্যবসায়ী। তার দাবি, বেকু ও পল্টনের মাধ্যমে পণ্য খালাসের কাজ করেন তিনি। সেই সুবাদে বানারীপাড়া উপজেলার ব্যবসায়ী মো. জগলুল মৃধার বালু খালাসের কাজে ব্যবহারের জন্য গত ২৩ জুলাই একটি পল্টনের মাধ্যমে ভেকু নিয়ে বানারীপাড়ার জুম্বাদি বালুর গোলায় যান। পরদিন ২৪ জুলাই ভেকুটি পল্টনের ওপর নোঙ্গর করে রাখা ছিল। তার দাবি, ওই সময় ভেকুটি কোনো বালু বা মাটি কাটছিল না।

হানিফ হাওলাদারের অভিযোগ, ২৪ জুলাই সাংবাদিক পরিচয়দানকারী বানারীপাড়া পৌর বিএনপির প্রচার সম্পাদক শেখ ইলিয়াস ঘটনাস্থলে গিয়ে ভেকু ও পল্টনের মালিকের খোঁজ করেন। এ সময় জগলুল মৃধার বালু-পাথর বহনের কাজের সরদার মো. আনিচুর রহমান ঘটনাস্থলে এলে তাকে অবৈধভাবে মাটি কাটার অভিযোগে ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজিদুর রহমানকে ফোন করে ঘটনাস্থলে নিয়ে আসা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার অভিযোগ, এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে বানারীপাড়া উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. সাইদুল ইসলাম, বানারীপাড়া পৌর বিএনপির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক সাগর ফকির, বানারীপাড়া পৌর যুবদলের সদস্য মামুনুর রহমান, সলিয়াবাকপুর ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মো. জাকির হোসেন, বানারীপাড়া পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রিয়াজ ফকির, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ও যুবদলকর্মী মাইদুল ইসলাম শফিক এবং বানারীপাড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ মৃধার ভাতিজা শুভ মোঘল ঘটনাস্থলে আসেন।

হানিফ হাওলাদার বলেন, প্রথমে আনিচুর রহমানকে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে এক লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা হয়। পরে জরিমানার পরিমাণ কমিয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়। এরপর মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের পল্টন এবং ৪০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের ভেকু নিলামে তোলা হয়।

রিটকারীর দাবি, নিলামে ভেকুটির ভিত্তিমূল্য ধরা হয় ১০ লাখ টাকা এবং পল্টনের ভিত্তিমূল্য ৫ লাখ টাকা। পল্টনে থাকা কর্মচারীদের বেতনের নগদ দেড় লাখ টাকা, তেল কেনার অর্থ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সরঞ্জামও নিলামের আওতায় আনা হয়।

নিলামে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আসা কয়েকজন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী অংশ নেন বলেও অভিযোগ করেন হানিফ হাওলাদার। তার দাবি অনুযায়ী, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. সাইদুল ইসলাম ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা, পৌর যুবদলের সদস্য মামুনুর রহমান ১২ লাখ, সলিয়াবাকপুর ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মো. জাকির হোসেন ১২ লাখ ৫০ হাজার, পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রিয়াজ ফকির ১৪ লাখ, শেখ ইলিয়াস ১১ লাখ এবং পৌর বিএনপির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক সাগর ফকির ২০ লাখ টাকা ডাক দেন। শেষ পর্যন্ত ২০ লাখ টাকায় পল্টন ও ভেকু সাগর ফকির কিনেছেন বলে দাবি করেন হানিফ হাওলাদার। নিলামের সাক্ষী হিসেবে মাইদুল ইসলাম শফিক ও শুভ মোঘলকে রাখা হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

হানিফ হাওলাদার আরও বলেন, নিলামের পূর্বে ভেকুর প্রকৃত নাম ৩২০ ডিএল এবং এমভি বার্জ ইনসাফ (রেজি. নং এম-১৪১২৩), দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও পল্টনে থাকা মালামালের সূচিপত্র উল্লেখ করা হয়নি। নোঙ্গর করা অবস্থায় ভেকুর মালিক সন্দেহ করে মো. আনিচুর রহমানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ৪০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের ভেকুর ভিত্তিমূল্য ১০ লাখ এবং প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের পল্টনের ভিত্তিমূল্য মাত্র ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এ ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ভেকু জব্দ করে পল্টনসহ নিলামে বিক্রির আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন হানিফ হাওলাদার। তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি স্থানীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানালেও কোনো প্রতিকার পাইনি। এমনকি বরিশাল এডিএম আদালতে মামলা করতে গেলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আদেশের বৈধতার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি।” তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন। পাশাপাশি দলীয় পদে থাকা অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বানারীপাড়া উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “সরকারি নিয়ম অনুযায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে নিলাম ডেকেছেন। চাঁদা দাবি বা পরিকল্পিত কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরং নিলাম অনুযায়ী সাগর ফকির ডাক পেয়েছেন।”

বানারীপাড়া পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রিয়াজ ফকিরের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলেও তিনি কোনো বক্তব্য দেননি। বানারীপাড়া পৌর বিএনপির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক সাগর ফকিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজিদুর রহমানকে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে বরিশালের জেলা প্রশাসক মো: মামুন খন্দকার বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমার জানা নেই। বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার ভালো বলতে পারবেন।

 

 

আরো পড়ুন

পিরোজপুরের ৩১ ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : পিরোজপুরের মেয়াদোত্তীর্ণ ৩১টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজ সামলাতে নতুন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *