আযাদ আলাউদ্দীন
আমি ছোটবেলায় যে ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়তাম, সেটি এখন বিলীন হয়ে মেঘনা নদীর মাঝে চলে গেছে। বলছি নব্বই দশকের কথা। আমরা এক গ্রামের সব মানুষ একটি ঈদগাহেই নামাজ আদায় করতাম। গ্রামটির নাম ছিলো- ‘মোহাম্মদ ভেলা’। একটু ভিন্ন রকম নামই বটে! এটির অবস্থান ছিলো ভোলা জেলার তজুমদ্দিন উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নে। ঈদগাহের দুই প্রান্তে ছিলো বিশালাকৃতির দুটি দিঘি, মাঝে উঁচু টিলার মতো বিশাল মাঠ। এটিই ছিলো আমাদের ছোটবেলার ‘ঈদগাহ’। রমজান মাস জুড়ে পুরো গ্রামের মুসল্লিরা নিজ নিজ বাড়ির কাছের জামে মসজিদে তারাবিসহ নিয়মিত সব নামাজ আদায় করতেন। ইফতারির যাবতীয় আয়োজন হতো নিজ নিজ এলাকার মসজিদকে ঘিরে, প্রায় প্রত্যেক ঘর থেকে কম বেশি ইফতার যেতো মসজিদগুলোতে। সব ঘরের ইফতার একত্র করে সবাই লাইন ধরে মসজিদের চত্বরে বসে একত্রে ইফতার করতেন। ধনী-গরীব কোন ভেদাভেদ ছিলো না সেইসব ইফতারে, সে এক অন্যরকম দৃশ্য! এভাবে পুরো রমজান কাটানোর পর সবার মাঝে আসে প্রত্যাশিত সেই ঈদুল ফিতর।
ঈদের দিন সকালে সবাই নতুন পোশাক পরে সুরমা- আতর লাগিয়ে, জায়নামাজ হাতে নিয়ে চলে আসতেন ‘মোহাম্মদ ভেলা’ গ্রামের সেই কেন্দ্রীয় ঈদগাহে। গ্রামের সব মানুষের স্রোত বহমান ছিলো এই একটি মাত্র ঈদগাহকে কেন্দ্র করে। বিশাল দিঘির এক পাড় দিয়ে ঈদের মাঠে যাওয়া এবং অন্য পাড় দিয়ে ফেরাও ছিলো একটি রেওয়াজ।
ঈদের নামাজ শেষে ‘মোহাম্মদ ভেলা’ বাজারে জমে উঠতো বাহারি সব খেলনা ও মুখরোচক নানা খাবারের পসরা। অভিভাবকরা শিশুদের কিনে দিতেন এসব খেলনা ও খাদ্য সামগ্রী। ছেলে-বুড়ো সবাই ছোট ছোট জটলায় মেতে উঠতেন মার্বেল ও পয়সা খেলায়। কুরবানি ঈদে অর্থাৎ ঈদুল আযহায় এই গ্রামের কুরবানিদাতাদের সব গরু একত্রে জবাই হতো একই স্থানে।
আমার নানা বাড়ি ছিলো এই ঈদগাহের খুব কাছেই। তাই ঈদের নামাজ আদায় করে নিজের এবং খালাতো ভাই-বোনদের সাথে নিয়ে ‘মোহাম্মদ ভেলা’ বাজারে ঘোরাঘুরি ও মুখরোচক নানা খাবার খেয়ে সবাই সদলবলে নানা বাড়িতে উপস্থিত হতাম ‘সেলামি’ পাওয়ার আশায়। আমাদের সে আশা কখনোই বিফলে যেতনা। বড়রা সবাই আমাদেরকে এক টাকা, দু’টাকা, পাঁচটাকা কিংবা দশ টাকার ‘নতুন নোট’ দিয়ে উৎসাহিত করতেন। সেই টাকার একটি অংশ দিয়ে ‘মোহাম্মদ ভেলা বাজার’ ও ‘আনন্দ বাজার’ থেকে ছোট ছোট বাই সাইকেল ‘ঘন্টা’ হিসেবে ভাড়া নিয়ে এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়াতাম আমরা।
আমার নানা আলহাজ মমতাজ উদ্দিন মুন্সী ছিলেন এলাকার স্বজ্জন ও দানশীল ব্যক্তি। তাঁর কাছে হাত পেতে কেউ কখনো খালি হাতে ফিরতেন না। তাঁর মৃত্যুর পর পুরো গ্রামের কয়েক হাজার মানুষকে অর্ধশতাধিক গরু জবাই করে যে ‘ঐতিহাসিক মেজবান’ খাওয়ানো হয়েছিলো তা ছিলো অবিস্মরণীয়। সেই ‘মেজবান’ যারা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তারা এখনো সেই কথা স্মরণ করে বাস্তব গল্পের ঢালি মেলে ধরেন সবার মাঝে।
