বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৯, ২০২৬

বরগুনার শুঁটকি পল্লিতে শ্রম, শৈশব ও টিকে থাকার লড়াই

মইনুর আবেদন খান সুমন, বরগুনা //
 বরগুনার তালতলীর  উপজেলার নিদ্রা ও আশার চর শীত এলেই বদলে যায়- এটি আর শুধু একটি চর থাকে না, হয়ে ওঠে হাজারো মানুষের জীবিকার কর্মভূমি। এখানে শীত মানে উৎসব নয়, শীত মানে টিকে থাকার লড়াই।
শুঁটকি আঙিনার এক পাশে দাঁড়িয়ে নয় বছরের সুজন ছোট হাতে মাছ পরিষ্কার করছে। বয়স তার স্কুলব্যাগ কাঁধে নেওয়ার, মাঠে খেলাধুলার। কিন্তু বাস্তবতা তাকে শুঁটকির আঙিনায় টেনে এনেছে। বছরে কয়েক মাস স্কুলে গেলেও শীতের পাঁচ মাস পরিবারের সঙ্গে কাজে নামতে হয়। সুজন একা নয়-এমন অসংখ্য শিশু এখানেই বড় হচ্ছে দায়িত্বের ভার কাঁধে নিয়ে।
নিদ্রা ও আশার চরকে দেশের অন্যতম বৃহৎ শুঁটকি উৎপাদনকেন্দ্র বলা হয়। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি- এই পাঁচ মাসে চরজুড়ে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাছ কাটা, ধোয়া, রোদে শুকানো। রূপচাঁদা, ছুরি, কোরাল, রামসুস, সুরমা, লইট্টা, পোপা, চিংড়ি, ভোলা, মেদসহ অন্তত ২৫টির বেশি সামুদ্রিক মাছ প্রাকৃতিক উপায়ে রূপ নেয় শুঁটকিতে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম জানান, এখানকার শুঁটকি তৈরিতে কোনো কীটনাশক বা অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার করা হয় না। রোদ, বাতাস আর সময়ই তাদের একমাত্র প্রযুক্তি। এই কারণেই বরগুনার শুঁটকির চাহিদা বেশি। খুলনা, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর, জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়মিত সরবরাহ হয় এখানকার উৎপাদিত শুঁটকি।
একটি মাঝারি আকারের শুঁটকি আঙিনায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ১৫০ জন শ্রমিক কাজ করেন। দৈনিক আয় ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা। শ্রমিকদের প্রায় ৬০ শতাংশ নারী। মৌসুমি এই আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলে অনেক পরিবারের পুরো বছরের সংসার। শুঁটকি শ্রমিক শাহনাজ বলেন, মৌসুমের পাঁচ মাস কোনোমতে ভালো থাকা যায়, বাকি সময় জীবন চলে টানাটানিতে। মৌসুম ছাড়া সময়ে কাজ নেই বললেই চলে।
নিদ্রা ও আশার চর মিলিয়ে বছরে প্রায় ৪০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হয়। যার বাজারমূল্য আনুমানিক ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। ব্যবসায়ীরা জানান, ছুরি মাছের শুঁটকি বিক্রি হয় কেজি প্রতি ৮০০-৯০০ টাকা, রূপচাঁদা ১,০০০-১,৫০০, লইট্টা ৬০০-৭০০, চিংড়ি ৮০০-৯০০ টাকায়। তবে সরকারি রাজস্ব দিলেও আধুনিক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব দীর্ঘদিনের অভিযোগ।
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেন, শুঁটকির বাজার চাহিদা বর্তমানে অত্যন্ত বেশি এবং দেশ-বিদেশে এর গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়ছে। শুঁটকি উৎপাদনের বিস্তার ঘটাতে জেলা মৎস্য বিভাগ নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতা ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। তিনি জানান, আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি চালু করা গেলে শুঁটকি উৎপাদন একটি লাভজনক শিল্পে পরিণত হতে পারে।
এতে উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত জেলে ও উদ্যোক্তারা স্বাবলম্বী হবেন এবং তাদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। উন্নত সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং নিশ্চিত করা গেলে শুঁটকি রপ্তানির নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। বরগুনার উপকূলীয় অঞ্চলে এই শিল্পের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শুঁটকি খাত থেকে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার অর্থনীতি গড়ে তোলা যেতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও টিকে আছে এই শিল্প। কারণ শুঁটকি এখানে শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়-এটি উপকূলের মানুষের জীবনরেখা। রোদে শুকাতে থাকা মাছের ফাঁকেই লুকিয়ে আছে তাদের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর বেঁচে থাকার ইতিহাস। নিদ্রা ও আশার চর তাই কেবল শুঁটকি পল্লি নয়, সাগরের কোলঘেঁষা মানুষের জীবনযুদ্ধের এক নীরব দলিল।

আরো পড়ুন

’৬৯ এর গণঅভ্যূত্থানে শহীদ বরিশাল একে স্কুলের শিক্ষার্থী আলাউদ্দিনের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক।। ’৬৯ এর গণ অভ্যূত্থানে বরিশাল বিভাগের প্রথম শহীদ মোহাম্মদ আলাউদ্দিনের মৃত্যুবার্ষিকী আজ, ২৮ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *