মঙ্গলবার, মার্চ ৩, ২০২৬

দোল উৎসবের ইতিহাস ও ধর্মীয় চেতনা

বিজন বেপারী

আজ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শুভ দোল উৎসব বা দোল পূর্ণিমা। গতকাল সন্ধ্যায় শুরু হয়ে আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে এই দোল পূর্ণিমার তিথি। বসন্ত এসেছে দুয়ারে আর তারই হাত ধরে এসেছে পলাশ শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলের আভা।অৰ্থাৎ রঙ-বেরঙের সমাহার চারিদিকেই। প্রকৃতির এমন রঙিন সাজের মধ্যেই রঙের উৎসব দোল পূর্ণিমা বা হোলি গুটিগুটি পায়ে ধরাতে উপস্থিত হয়।  এই রঙের উৎসবে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে নামে দিনভর হাসি খুশির বন্যা। কোথাও এই উৎসব দোল পূর্ণিমা আবার কোথাও তা হোলি খেলা নামে পরিচিত।  এবার জানি কীভাবে দোল উৎসব হিন্দু ধর্মের মূল ধারায় ধর্মীয় উৎসব হিসেবে মিশে গেল। দোল উৎসবের ইতিহাসের সাথে একাধিক পৌরাণিক কাহিনী জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ভক্ত প্রহ্লাদ ও হিরণ্যকশিপুর উপাখ্যান। অসুররাজ হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা অগ্নিদেবতার বরে অপরাজেয় ছিলেন। প্রহ্লাদকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টায় হোলিকা তাকে নিয়ে চিতায় বসেন, কিন্তু ভগবানের কৃপায় বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদ অক্ষত থাকেন এবং পাপিষ্ঠ হোলিকা ভস্মীভূত হন। এই ঘটনাই অশুভের ওপর শুভর জয়ের প্রতীক হিসেবে দোল বা হোলি উৎসবের সূচনা করে। অন্যদিকে, বৈষ্ণব দর্শনে দোল উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম। এই দিনে শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে শ্রীরাধিকা ও গোপীদের নিয়ে আবির খেলায় মেতে উঠেছিলেন। আবার এই ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতেই গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব ঘটেছিল, যা বাঙালি হিন্দুদের কাছে দিনটিকে ‘গৌর পূর্ণিমা’ হিসেবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। দোল উৎসবের তাৎপর্য ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই বলতে পারি, দোল উৎসব মূলত সাম্যের বাণী প্রচার করে। আবিরের রঙে সবার মুখ যখন রঙিন হয়ে ওঠে, তখন জাত-পাত বা ভেদাভেদের আর কোনো স্থান থাকে না। এটি বসন্তের আগমনি বার্তা এবং জীবনের নবযৌবনের প্রতীক। আধ্যাত্মিকভাবে, এই উৎসব ভক্তের হৃদয়ে ভগবানের প্রতি প্রীতি ও ভক্তির বহিঃপ্রকাশ মাত্র। দোল উৎসবের মূল সুত্রটি হলো আত্মসমর্পণ এবং পবিত্রতা। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এর ভাবগাম্ভীর্যের কয়েকটি বিশেষ দিক রয়েছে: উপাসনা ও পরিক্রমা: এই দিন সকালে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ সুসজ্জিত দোলায় স্থাপন করে আবির অর্পণ করা হয় এবং নগর কীর্তনের মাধ্যমে ভক্তরা ভগবানের নাম জপ করেন। অশুচি বিনাশ: ‘চাঁচড়’ বা ‘ন্যাড়াপোড়া’র মাধ্যমে নিজের মনের কাম, ক্রোধ ও লোভের মতো আসুরিক প্রবৃত্তিগুলোকে দহন করার সংকল্প নেওয়া হয় এই দোল উৎসবে। ভক্তিযোগ: বৈষ্ণবদের কাছে এটি নিছক রঙের উৎসব নয়, বরং শ্রীকৃষ্ণের চরণে নিজেকে সঁপে দেওয়ার এক পবিত্র ক্ষণ। দোল উৎসব আমাদের শেখায় যে, অন্ধকার যতই ঘনীভূত হোক, শেষ পর্যন্ত সত্য ও প্রেমেরই জয় হয়। এই উৎসবের রঙ যেন আমাদের মনের কলুষতা ধুয়ে দিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। তাই এই শুভ দিনে ভগবানের কাছে প্রত্যাশা, ধর্মে-বর্ণে, দেশে-দেশে কিংবা জাতিতে-জাতিতে যে হানাহানি, মারামারি ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ চলছে বিশ্বব্যাপী তা নিবারণ হোক তোমার আশীর্বাদে। বাসন্তী রঙের ছোঁয়ায় সবাই সবাইকে আপন করে নিক জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে। লেখক: কবি,ছড়াকার ও প্রাবন্ধিক। সহকারী শিক্ষক, বাজিতপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঝালকাঠি সদর।

আরো পড়ুন

বরিশাল বারের সভাপতি লিংকনসহ ১১ আইনজীবীর জামিন, একজনের নামঞ্জুর

নিজস্ব প্রতিবেদক বিচারকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *